|


SAM

Published:
2018-10-22 09:24:11 BdST

দুদকে অধরা জনতা ব্যাংকের বৃহৎ ঋণ কেলেংকারির হোতারা


এফটি বাংলা

অধরাই থেকে যাচ্ছেন জনতা ব্যাংকের বৃহৎ ঋণ কেলেংকারির নেপথ্য নায়করা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একের পর এক অনুসন্ধান-তদন্ত চালালেও অদৃশ্য ইশারায় প্রতিবারই বেঁচে যাচ্ছেন তারা। সম্প্রতি উদঘাটিত বৃহৎ কয়েকটি কেলেংকারি সঙ্গে জড়িতরাও একই পথে দায়মুক্তি পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। যদিও দুদক বলছে, কমিশন কাউকে দায়মুক্তি দেয় না।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১২ সালে বিসমিল্লাহ গ্ররুপের ঋণ জালিয়াতি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকটিকে গ্রাহকের আস্থার সংকটে ফেলে দিয়েছিল। ওই কেলেংকারির ঘটনায় দুদক কিছু ব্যক্তিকে ‘অভিযুক্ত’ করতে পেরেছে বটে। কিন্তু অধরাই থেকে যায় ব্যাংকটির তৎকালিন ঋণ প্রদানকারী ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণকারী। বহু চেষ্টায়  যখনই ব্যাংকটির ভাবমূর্তি পূনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে তখনই উদঘাটিত হয় অ্যানন টেক্স গ্ররুপের ৫ হাজার  কোটি টাকার কেলেংকারি। আলোতে আসে  ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের ৪ হাজার কোটি টাকার কেলেংকারি।

দুদকের হাতে আসা এ দুটি কেলেংকারির রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, ২০০৮ সাল থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ পায়। ২০১২-২০১৩ সালে উদঘাটিত বিসমিল্লাহ গ্ররুপের ঋণ কেলেংকারির অনুসন্ধানেও দেখা যায়, ১২শ’ কোটি টাকার ঋণ কেলেংকারির সুযোগটি সৃষ্টি করে দেয়া হয় ২০০৮সালে। ঘটনা চাউর হওয়ার আগেই লাপাত্তা হয়ে যান বিসমিল্লাহ গ্ররুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান, পরিচালক আনোয়ার চৌধুরি এবং পরিচালক নওরীন হাসিব। ওই কেলেংকারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন জনতা, বেসরকারি যমুনা, প্রিমিয়ার ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কোনো কোনো কর্মকর্তা। সম্প্রতি উদঘাটিত অ্যানন টেক্স গ্ররুপ ।ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের ঋণ কেলেংকারির সঙ্গেও বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়ার তথ্য মিলেছে। 

জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুদকের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করে ‘দি ফাইনান্স টুডে’কে জানান, ব্যাংকটিতে অনেক জালিয়াতির ঘটনাই ঘটেছে যা দালিলিকভাবে প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য। বৃহৎ ঋণগুলোর প্রস্তাব প্রেরণ, একেকটি ধাপ অতিক্রম এবং ঋণ মঞ্জুরের সময়কাল খুব সংক্ষিপ্ত। অর্থাৎ দ্রুত গতিতেই ঋণগুলো মঞ্জুর  এবং টাকা ছাড় হয়।  এ সময়কালে কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করলে দেখা যায়, আতœসাতের সঙ্গে শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। অথচ এটি প্রমাণ করা দু:সাধ্য। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া প্রসঙ্গে দুদকের ওই কর্মকর্তা  আরো  জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত¡ জনতা ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির সূচনা হয় ২০০৮ সালের দিকে। সেবছর ২৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন এসএম আমিনুর রহমান।  ওই সময় অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের মতো ঋণগুলো অনুমোদন পায়। তার দেয়া ঋণের ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকাই এখন খেলাপি। এ ছাড়া ঝুঁকিতে আছে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ। অথচ এসব আতœসাৎ নিয়ে দুদক এখন অনুসন্ধান শুরু করতে পারছে না। দুদকের অনুসন্ধান-তদন্ত ঠেকাতে ব্যাংক নিজেই বাদী হয়ে আগেভাগে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে। মামলার কারণে বৃহৎ এই  আতœসাৎগুলো নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারছে না।  কোনো কোনোটির অনুসন্ধান শুরু হলেও ঋণ জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ডকে স্পর্শ করা যাচ্ছে না। কমিশনের সদিচ্ছা এবং দালিলিক প্রমাণ না পাওয়াই এর অন্যতম কারণ।

দুদকের অপর একটি সূত্র জানায়, জনতা ব্যাংকের একাধিক ঋণ কেলেংকারি নিয়ে অনুসন্ধান চলমান থাকলেও ঋণ কেলেংকারির ‘মাস্টারমাইন্ড’কে স্পর্শ করা যাচ্ছে না। জনতা ব্যাংকের সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকা আত্তসাতের একটি অনুসন্ধানে দেখা উঠে  এসেছে  এসএম আমিনুর রহমানের নাম। এ ছাড়া বিসমিল্লাহ গ্ররুপের ১২ শ’ কোটি টাকার ঋণ কেলেংকারির মাস্টারমাইন্ডও তিনি। অ্যাননটেক্স’র  কেলেংকারির সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। তার সহযোগিতায়ই প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. ইউনুছ বাদল হাতিয়ে নেন সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। ২০০৭ সালে গাড়ি চুরিচক্রের হোতা হিসেবে আইন-শৃক্সখলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া ইউনুছ বাদলকে রাতারাতি শিল্পপতি বানিয়ে নেয়ার নেপথ্যে রয়েছেন আমিনুর রহমান। জুভেনিল সোয়েটার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসায় নামেন ইউনুছ বাদল। ২০০৪ সালে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় গ্রাহক হওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি ব্যাংকিং সুবিধা নেয়া শুরু করে। ওই শাখার বেশি ঋণ দেয়ার ক্ষমতা না থাকায় এসএম আমিনুর রহমানের পরামর্শে ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করেন তিনি। পরপরই ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট ইউনুছ বাদলের ‘গ্যালাক্সি সোয়েটাস অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড’ নামক নাম সর্ব¯^ প্রতিষ্ঠানকে ৮০ কোটি  টাকা ঋণ দেন তিনি। শুধুমাত্র ব্যাংকের অর্থ লোপাটের উদ্দেশ্যে আমিনুর রহমানের পরামর্শে একের পর এক  নাম সর্বসস  প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে জনতা ব্যাংক থেকে তাকে দেয়া হয় শত শত কোটি টাকার ঋণ সুবিধা। প্রাপ্ত এ ঋণ তিনি অন্যখাতে ব্যয় করেন। বিত্ত-বৈভব করেন দেশের বাইরে। এ বিষয়ে জানতে এসএম আমিনুর রহমানকে ২০ অক্টোবর দুপুর পৌনে ২টায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হয়। বারবার রিং  হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

দুদকের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা, মগবাজার শাখা ও এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে নামসর্বশ্ব চারটি প্রতিষ্ঠানের নামে ইউনুছ বাদল হাতিয়ে  নেন সাড়ে ৭ শ’ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋন ৬৭৮ কোটি টাকা। নন-ফান্ডেড ১৯ কোটি ৫২ লাখ। ‘শেহরিন টেক্সটাইল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’ নিয়েছে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ‘শাহরিজ কোম্পোজিট টাওয়েল’ নিয়েছে ২৯৮ কোটি ৩ লাখ টাকা। ‘ আলফা কম্পোজিট’ নিয়েছে ১৮৩ কোটি ৮৪  লাখ টাকা। দুদকের অনুসন্ধানে এসব তথ্য ও প্রমাণাদি উঠে এলেও কথিত এসব ঋণ প্রাপ্তিতে ব্যাংকটির ভেতর থেকে সহযোগিতাকারী এসএম আমিনুর রহমানের নাম নিচ্ছে না সংস্থাটি। অদৃশ্য ইশারায় প্রতিবারের মতো এবারও তাকে দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

দায়মুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিন  বলেন, দুদক কখনো কাউকে দায়মুক্তি দেয় না। তদন্ত কর্মকর্তারা প্রতিবেদন দাখিল করেন প্রমাণের ভিত্তিতে। কারো বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ হাজির করা না গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে অথচ তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে দুদকে সম্ভবত এমন রেকর্ড নেই।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.


Popular Article from FT বাংলা