বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-04-21 14:25:16 BdST
৩ কোটি টাকা দিয়ে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি, এক বছরে ২০ কোটি টাকার সম্পদসাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, নির্লিপ্ত দুদক
সাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, নির্লিপ্ত দুদক
৩ কোটি টাকা দিয়ে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি, এক বছরে ২০ কোটি টাকার সম্পদ
সাভারের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনকে ঘিরে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য, ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মাদক সেবন ও প্রশাসনিক অনিয়মসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, মাত্র ৯ বছরের চাকরি জীবনে তিনি এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
সূত্র মতে, টাঙ্গাইল জেলার মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান জাকির হোসেন ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তীতে লক্ষীপুরের কমলনগর, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এবং হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় দায়িত্ব পালন শেষে তিনি সাভারে পদায়ন পান।
বদলি বাণিজ্য
আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বদলি হতে জাকির হোসেন তৎকালীন আইন উপদেষ্টার পিএস শামসুদ্দিন মাসুমকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দেন। যদিও এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাভারে আসার আগে জাকির হোসেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এক অদৃশ্য জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তিনি সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ (দুর্নীতির আখড়া হিসেবে পরিচিত) একটি স্টেশনে বদলি হন।
অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের পিএস শামসুদ্দিন মাসুমকে ৩ কোটি টাকা দিয়ে এই বদলি নিশ্চিত করেন তিনি। শামসুদ্দিন মাসুমের বাড়ি বানিয়াচং হওয়ায় সেখানে কর্মরত থাকাকালীনই মাসুমের পরিবারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন জাকির। সেই ‘ঘনিষ্ঠতা’ এবং ‘বিনিময়’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সাব-রেজিস্ট্রার সমিতির নেতাদের অবাক করে দিয়ে সাভারে পদায়ন পান তিনি।
আদালতের নির্দেশ অমান্য
সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে সাভারের বিলামালিয়া ও বড়বরদেশী মৌজার কিছু জমির রেজিস্ট্রেশন ও মিউটেশনের ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে গোপনে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তিনি মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা গ্রহন করেন বলেও জানা গেছে।
অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন
অভিযোগ রয়েছে, মাসিক ৫০ হাজার টাকার কম বেতনে চাকুরীরত এই কর্মকর্তা গত এক বছরে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ২০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ গড়েছেন।
আরও পড়ুন: সাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের এত সম্পদের উৎস কি?
দ্য ফিন্যান্স টুডের একটি চৌকস টীম এই বিষয়ে নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়ে জাকির ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। এছাড়া, জাকিরের বিরুদ্ধে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি এবং নিজ এলাকায় জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে। সূত্র মতে, এসব সম্পদের একটি অংশ আত্মীয়স্বজনের নামেও কেনা হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলার মধ্যবৃত্ত ঘরের সন্তান সাভারের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের সাব-রেজিস্ট্রার পদে সব মিলিয়ে মাত্র ৯ বছরের চাকরি জীবন। অথচ এই অল্প সময়েই দুর্নীতির সংজ্ঞাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
সাভারের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়া এবং পাহাড়সম অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
অফিসে মাদক সেবন ও অসদাচরণ
সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, জাকির হোসেন নিয়মিত অফিস কক্ষে মাদক সেবন করেন এবং পরে কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। তবে এই অভিযোগেরও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও মামলা
জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং আন্দোলন সংশ্লিষ্ট একটি মামলার আসামি থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এই বিষয়ে আইনগত অবস্থান বা মামলার বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে প্রশ্ন
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেও তা অগ্রগতি না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিছু মহলের দাবি, তদন্ত প্রক্রিয়া থমকে আছে। যদিও দুদকের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এসব বিষয়ে কথা বলতে সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনরত একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে উত্থাপিত এসব অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ গুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকার দিকেই এখন নজর সবার।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
