01/08/2026
নেহাল আহমেদ, রাজবাড়ী | Published: 2026-01-05 16:29:27
মানুষের সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সময়কে চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিয়েছে পঞ্জিকা—যা প্রাচীন সমাজে ছিল একমাত্র ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা। ধর্মীয় আচার, কৃষিকাজ, সামাজিক উৎসব ও দৈনন্দিন জীবনের সময় নির্ধারণে পঞ্জিকা দীর্ঘকাল ধরে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে সময় গণনাকে সহজ ও একরূপ করতে গিয়ে পঞ্জিকা থেকে আধুনিক ক্যালেন্ডারের উদ্ভব ঘটে। তবু ভারত ও বাংলাদেশে আজও ধর্মীয় তারিখ ও আচার নির্ধারণে পঞ্জিকার গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ, যদিও নাগরিক জীবনে ক্যালেন্ডারই প্রাধান্য পেয়েছে।
পঞ্জিকা হলো এমন এক গ্রন্থ যেখানে বছরের প্রতিদিনের তারিখের সঙ্গে সঙ্গে তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ, করণ, লগ্ন, শুভাশুভ ক্ষণ, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় পর্বদিনের বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে। একে পঞ্জী বা পাঁজি বলেও অভিহিত করা হয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে এর নাম ‘পঞ্চাঙ্গ’—কারণ এতে বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ—এই পাঁচটি অঙ্গ অন্তর্ভুক্ত থাকে। বাংলায় যদিও এটি পঞ্জিকা নামেই সুপরিচিত।
কালবিভাগের ধারণা সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের চিন্তায় স্থান করে নেয়। বৈদিক যুগের ঋষিরা ঋতুভিত্তিক পূজা-পার্বণের প্রয়োজনে সময় নিরূপণের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেন। তাঁরা বছরকে উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন—এই দুই ভাগে বিভক্ত করেন এবং সূর্যের গতি অনুসারে সময় গণনা করতেন। সেই সময় বছরকে বারোটি মাসে ভাগ করা হতো—তপঃ থেকে সহস্য পর্যন্ত—যার মধ্যে প্রথম ছয়টি উত্তরায়ণ এবং পরের ছয়টি দক্ষিণায়ণের অন্তর্ভুক্ত। যর্জুবেদের কালে (প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) এই ধরনের সময়বিভাগ প্রচলিত ছিল বলে অনুমান করা হয়।
প্রথমদিকে তিথির ধারণা ছিল সীমিত; পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টকার ব্যবহারই প্রধান ছিল। নক্ষত্র গণনায় কৃত্তিকা থেকে শুরু করে ২৭ বা ২৮টি নক্ষত্রে আকাশমণ্ডল বিভক্ত করা হতো। বৈদিক সাহিত্যে ফাল্গুনী পূর্ণিমার উল্লেখ থেকে চান্দ্রমাস গণনার প্রাচীনতার প্রমাণ মেলে।
তৎকালীন সমাজে গণকঠাকুর বা ব্রাহ্মণরা তালপাতায় লেখা পঞ্জিকা গ্রামে-গঞ্জে প্রচার করতেন। পঞ্জিকার সাহায্যেই ধর্মকৃত্য ও উৎসবের সঠিক সময় নির্ধারিত হতো। বাংলাদেশের পঞ্জিকার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। স্মার্ত রঘুনন্দন সম্পাদিত নবদ্বীপ পঞ্জিকা এর অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। পরবর্তীকালে রামরুদ্র বিদ্যানিধি ও বিশ্বম্ভর জ্যোতিষার্ণব এই ধারাকে এগিয়ে নেন।
১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে পঞ্জিকা প্রথম মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়, যা এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৫২ সালে ভারত সরকারের উদ্যোগে পঞ্জিকা সংস্কার করা হয় এবং মেঘনাদ সাহার সভাপতিত্বে ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি গঠিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৫৭ সাল থেকে ভারতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পঞ্জিকা প্রকাশ শুরু হয়।
বাংলা বর্ষপঞ্জিকে নাগরিক জীবনের উপযোগী করতে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে শহীদুল্লাহ কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের টাস্ক ফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী মাসের দিনসংখ্যা নির্ধারণ ও অধিবর্ষের নিয়ম প্রবর্তিত হয়, যা ১৪০২ বঙ্গাব্দ থেকে কার্যকর হয়। এতে বাংলা বর্ষপঞ্জি গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে পঞ্জিকা শুধু ধর্মীয় তারিখ নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে বর্ষফল, মাসফল, রাষ্ট্রফল ও দৈনিক রাশিফলও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। লোকনাথ ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা ও মোহাম্মদী পকেট পঞ্জিকা বাংলাদেশে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। পঞ্জিকা থেকে ক্যালেন্ডারের উত্তরণ মূলত মানবসভ্যতার প্রয়োজন ও বাস্তবতারই প্রতিফলন।
ক্যালেন্ডার নাগরিক ও প্রশাসনিক জীবনে সহজতা এনেছে, আর পঞ্জিকা আজও ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে টিকে আছে। এই দুইয়ের সহাবস্থান আমাদের সময়চিন্তার ইতিহাস, বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের এক অনন্য সমন্বয়কে তুলে ধরে—যা বাঙালি সংস্কৃতির এক গভীর ও গৌরবময় উত্তরাধিকার।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81