01/10/2026
শাহীন আবদুল বারী | Published: 2026-01-08 17:07:15
‘ঝুট বাপ্পি’ থেকে ‘কাউন্সিলর বাপ্পি’ হয়ে উঠে তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মিরপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিকে চিহ্নিত করেছে মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। বাপ্পি চাঞ্চল্যকর হাদি হত্যা মামলার তিন নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি।
দীর্ঘ সময়কাল আলোচনার বাইরে থাকা এই বাপ্পির উত্থান, প্রভাব বিস্তার এবং অপরাধজগতের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক আবারও সামনে এসেছে হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে।
ডিবি মিডিয়াকে জানায়, হাদি হত্যাকাণ্ডে বাপ্পিসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীসহ কয়েকজন এখনো পলাতক। ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ।
ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, শরিফ ওসমান হাদি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিতেন। এসব বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আওয়ামী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেতাকর্মীরা। এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে হাদিকে হত্যা করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে পালাতে সহায়তা করেন মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ। এই দুজনকে দেশ ছাড়তে সহায়তা করেন বাপ্পি নিজেই।
ডিবির তদন্তে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়, আসামিদের স্বীকারোক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ, অস্ত্র ও গুলির ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে বাপ্পির সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মামলার ১৭ আসামির মধ্যে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক পাঁচজন হলেন, হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখ, হত্যার নির্দেশদাতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, মানবপাচারকারী ফিলিপ স্নাল এবং ফয়সালের বোন জেসমিন। এরা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকায় রাস্তার উপরে চলন্ত রিকশায় প্রকাশ্যে মোটরসাইকেল যোগে এসে ওসমান হাদিকে গুলি করেন ফয়সাল করিম মাসুদ। হাদিকে গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমান হাদির মৃত্যু হয়। হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কিছু উশৃংখল ব্যক্তি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিস ভাঙচুর এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। যা ছিলো দুষ্কৃতকারীদের রীতিমতো তান্ডব।
রূপনগর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা জমশেদ আলী জানান, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলছুটদের নিয়ে সাংবাদিক ও রাজনীতিক ব্যক্তি ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী নতুন রাজনৈতিক দল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) গঠন করেন। ওই দলে যোগ দেন বাপ্পির বাবা নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি মিরপুর-পল্লবী এলাকায় ‘ঝুট মন্টু’ নামে পরিচিত ছিলেন। পিডিপির প্রার্থী হিসেবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তা আর হয়নি। পিডিপিতে যোগ দেয়ার আগে মন্টু আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে তিনি আবারও আওয়ামী লীগে ফেরেন। ২০০৯ সালের ২৬ মে মিরপুর ১১ নম্বরের নান্নু মার্কেটের সামনে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী জামিল গ্রুপের গুলিতে নিহত হন ঝুট ব্যবসায়ী মন্টু। এরপর বাবার রাস্তা বেছে নেন বাপ্পি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জীবনের শুরুতে বাপ্পি পূরবী, রূপনগর ও শিয়ালবাড়ি এলাকায় সিএনজি ও টেম্পু স্ট্যান্ডের লাইনম্যান হিসেবে কাজ করতেন। পরে তিনি চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে যুক্ত হন। এরপর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলীর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। রজ্জব আলীর মাধ্যমে বাপ্পি পল্লবীর সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ইলিয়াস মোল্লার সঙ্গে এস এম মান্নান কচি ও কাউন্সিলর নান্নুর দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে পল্লবী এলাকায় বাপ্পির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১২ সালের জুলাইয়ে বাপ্পি ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হোন। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান।
বাপ্পির প্রতিবেশীদের সাথে আলাপ করে জানা যায় বাপ্পির বেড়ে উঠার গল্প। বাবা মন্টু মিয়া নিহত হওয়ার পর বড় ছেলে হিসেবে বাপ্পি পুরো পরিবারের দায়িত্ব নেন। মন্টু মিয়া ১৭টি বিয়ে করেছিলেন এবং তার সন্তান ছিল ২২ জন। বাপ্পি তার ভাই-বোনদের বিভিন্নভাবে কাজের ব্যবস্থা করে দেন। ১৭ জন মাকে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা করে হাতখরচ দিতেন বাপ্পি। মন্টুর অধিকাংশ বিয়ে ঝুট ব্যবসায় কাজ করা নারীদের সাথে হয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ২৬ বছর বয়সেই বাপ্পি হারুন নিট, স্নোটেক্স, ইপিলিয়ন, ইভেঞ্জ, আজমত, ম্যাক্স-২০০০, শরৎ, আলানা, পূরবী অ্যাপারেলস, ডেকো ইন্টারন্যাশনাল, ইমা ক্লথসহ মিরপুর ও পল্লবী থানা এলাকার অর্ধশতাধিক গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়ের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন। পরবর্তী প্রায় ১৫ বছর ধরে এই অঞ্চলের গার্মেন্টস ঝুট কাপড়ের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখেন তিনি। বাপ্পি কচির শেল্টারে এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, নামমাত্র মূল্যে প্রতি মাসে ঝুট কাপড় নিয়ে যাওয়া হতো। থানা-পুলিশ বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। উল্টো মারধরের শিকার হতে হয়েছে। বিনা টাকায় ঝুট কাপড় দিতে হয়েছে। ভবিষ্যতে অভিযোগ করা যাবে না, এই মর্মে লিখিত দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে ঘটনার নিষ্পত্তি করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, বাপ্পি নিয়ন্ত্রিত গার্মেন্টসগুলো থেকে মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার ঝুট কাপড়ের ব্যবসা করতেন। যার বড় একটি অংশ বিভিন্ন জায়গায় ভাগ দিতে হতো।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি একসময় এলাকায় ‘ঝুট বাপ্পি’ নামে পরিচিত ছিলেন। গার্মেন্টস শিল্পের ঝুট কাপড়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই তার উত্থান ঘটে। তিনি সাবেক কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলীকে মাদক মামলাসহ বিভিন্নভাবে কোণঠাসা করে রাখেন। ২০২০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রূপনগর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন রবিনকে নাটকীয়ভাবে পরাজিত করে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বাপ্পি। ওই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রবিন আদালতে মামলা করেন ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে।
এরপর থেকে বাপ্পি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার বিরুদ্ধে পরিবহন, গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, অটোরিকশা, জমি দখল, ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজার থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বাপ্পিকে প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও তিনি আত্নগোপনে থেকেই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
অপরাধ বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা লুকিয়ে থেকে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আরও হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। এজন্য প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে। অন্যথায় সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করবে।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81