31074

01/18/2026

ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক: বড়দের জন্য নতুন সুযোগ, ছোট এনজিওদের জন্য মৃত্যুঘণ্টা

মোস্তফা কামাল আকন্দ | Published: 2026-01-18 14:09:38

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ খাতের ভূপ্রকৃতি পরিবর্তনের সময় আসছে। সরকারের প্রস্তাবিত ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৫’ দেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা করছে।

“প্রথম দর্শনে” এটি স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার উদ্যোগ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতায়, এটি বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করছে এবং ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর জন্য মারাত্মক হুমকি।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৭৩১টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৫,০০০ শাখা থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা ৪ কোটি ৫০ লাখ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এসব প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালে মোট প্রায় ২,৪৯,০০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে এবং ৯৮% ঋণ পুনঃপরিশোধের হার দেখিয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের ৯১% নারী, যা দেশের নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান নির্দেশ করে।

কিন্তু প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের জন্য অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি এবং পরিশোধিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবে এই শর্ত পূরণ করতে পারবে কেবল দেশের কয়েকটি শীর্ষ এনজিও—যেমন ব্র্যাক, আশা, ব্যুরো বাংলাদেশ, টিএমএসএস। ফলে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় অযোগ্য হয়ে যাবে।

ক্ষুদ্রঋণের মূল শক্তি হলো বিশ্বাসভিত্তিক, সহজলভ্য আর্থিক ব্যবস্থা, যা গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের কঠোর কাঠামো এ কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করবে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন সংরক্ষণ ও ঋণ শ্রেণীবিভাগ বাধ্যতামূলক করা হবে। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়ার সুযোগ হারাবে।

একজন খাত বিশেষজ্ঞ বলেন—"যদি পরিশোধিত মূলধন ৫০–১০০ কোটি টাকা ধরা হতো, অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে রূপান্তরের সুযোগ পেত। বর্তমান শর্তে সুযোগ সীমিত এবং অনেক ছোট এনজিও কার্যত বাদ পড়বে।"

এতে ক্ষুদ্রঋণ খাত ধীরে ধীরে কেন্দ্রীভূত এবং কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে যাবে। ছোট এনজিওগুলো হয় বিলুপ্ত হবে, নয়তো বড় প্রতিষ্ঠানের অধীনে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে।

শীর্ষ ১৭টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে—প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ খাতবান্ধব নয় এবং বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের চেয়ারম্যান বলেছেন, "কম মূলধনের ধাপযুক্ত লাইসেন্স থাকলে আরও প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হতে পারত। বর্তমান কাঠামো সেই সুযোগ রাখছে না।"

বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধান অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা সহায়ক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত, যাতে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোও ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগ দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য, নাকি কেবল বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যকে শক্তিশালী করার জন্য?

যদি এটি সংশোধন করা না হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি এনজিও গুলো কার্যত অদৃশ্য হয়ে যাবে। এর ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প অর্থায়নের পথ সংকুচিত হবে।

সুতরাং, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এই পদক্ষেপকে সংস্কার বলা যায় না। এটি শুধুমাত্র বড় এনজিওকেন্দ্রিক সুযোগ তৈরি করবে এবং ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মৃত্যুঘণ্টা হয়ে উঠতে পারে। সরকারের উচিত—অধ্যাদেশ পুনর্বিবেচনা করে এমন কাঠামো তৈরি করা, যেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর টিকে থাকার বাস্তব সুযোগ থাকবে।

শেষ কথা হচ্ছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক নতুন দরজা খুলতে পারে—কিন্তু এই দরজাটি সবার জন্য উন্মুক্ত না হলে, এটি শুধু ধনী প্রতিষ্ঠানের সুযোগ বাড়াবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আশা সংকুচিত করবে।

লেখক একজন উন্নয়ন বিশ্লেষক ও নীতিবিষয়ক গবেষক


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81