32280

03/18/2026

লেইস ফিতাঃ নারীর বিলুপ্তপ্রায় শখের দোকান

নেহাল আহমেদ | Published: 2026-03-18 18:04:31

একসময় গ্রামের রাস্তায় কিংবা শহরের সরু অলিতে-গলিতে হঠাৎ করেই ভেসে আসত এক ডাক—“লেইস ফিতা! লেইস ফিতা!”। সেই ডাকেই যেন ছিল এক অদ্ভুত টান, বিশেষ করে নারীদের মনকে অস্থির করে তুলত। সাপ্তাহিক সেই আগমনের জন্য অপেক্ষায় মেয়েরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, ছোট্ট শিশুদের হাত টেনে নিয়ে যেত রঙিন বাক্সবন্দি ফেরিওয়ালার কাছে।

লেইস ফিতার উৎপত্তি হয়েছিল মূলত ১৯৫০–৬০ দশকে। সামাজিক প্রথা আর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের কারণে তখন নারীদের বাহিরে যাওয়া ছিল এক অচিন্তনীয় ব্যাপার। ফলে তারা সহজে দোকান থেকে সাজসজ্জার জিনিস কিনতে পারতেন না। এই শূন্যস্থান থেকেই জন্ম নেয় এক বিশেষ ফেরিওয়ালা সংস্কৃতি। যারা লেইস, ফিতা, চুড়ি, রিবন, টিকলি আর প্রসাধনী নিয়ে অলিগলি ঘুরতেন, তাদেরই বলা হতো লেইস ফিতাওয়ালা।

জীবিকার তাগিদে পথে পথে ছুটে চলা লেইস ফিতা ওয়ালারা ধীরে ধীরে এই সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। তারা প্রতিদিন লেইস ফিতা, রঙিন সুতা, রঙিন টিপ, রঙিন হাতের চুড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করার জন্য ঘুরতেন। তবে, এখন আর আগের মতো তাদের দেখা মেলে না। শহরের যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে লেইস ফিতাওয়ালারা। তবে মফস্বল বা গ্রামের পথে মাঝে মধ্যে দেখা যায় তাদের।

আধুনিক সভ্যতা কেড়ে নিয়েছে সেই লেইস ফিতাওয়ালাদের বিচরণ। তাই সচরাচর আর চোখে পড়ে না কাগজের কার্টুনের উপর সাদা বা লাল কাপড় পেঁচিয়ে পুটলি কাঁধে ঝুলিয়ে আরেক হাতে কাঁচের ঢাকনা ওয়ালা বক্স বহনকারী লেইস ফিতাওয়ালাদের। একটা সময় দুপুরের পর যখন নারীরা মধ্যাহ্নভোজ ছেড়ে উঠানের আড্ডার জন্য প্রস্তত, তখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন লেইস ফিতাওয়ালারা। তাদের সে ডাক শুনে খুকুমণিরা বায়না ধরতো টিকা চুড়ি বা নেইল পলিশের।

এই পেশার মানুষ কখনো উঠে এসেছে সাহিত্যে কিংবা সঙ্গীতে। কবিতা কিংবা গানে। জেমস এর লেইস ফিতা গান মনে করিয়ে দেয় সেই অলস দুপুরের চঞ্চলতা ডেকে আনা লেইস ফিতাকে।

...........রেশমি চুড়ি, কাঁকন বালা,
ছোট্ট নোলক, ঝিনুক মালা
রেশমি চুড়ি, কাঁকন বালা,
ছোট্ট নোলক, ঝিনুক মালা
কোমর বিছা নূপুর বাজা
তাঁতের শাড়ি অঙ্গে প্যাঁচা

লেইস ফিতা লেইস........

গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ‘লেইস ফিতা’ ফেরি করা এক ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য, যেখানে বিক্রেতারা রঙিন সুতা, চুড়ি, টিপ ও ফিতা নিয়ে বাড়ি বাড়ি যেতেন। ৮০/৯০ দশকে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু বর্তমানে এই ভ্রাম্যমাণ পেশাটি হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আর আগের মতো গলার হাঁক শোনা যায় না, যা গ্রাম বাংলার চিরন্তন দৃশ্য ছিল।

যদিও এই ঐতিহ্য কমে আসছে, তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রামীণ মেলায় বা বিশেষ উৎসবের আগে এর ঝলক দেখা যায়। এই লেইস ফিতা ওয়ালারা এক সময় খুবই জনপ্রিয় গ্রামের দেশের অগণিত তরুণী, বালিকা-কিশোরীদের কাছেও। কারণ তাদের কাছে অতি অল্প দামে মেলে ক্রিম-পাউডার, চুলের ফিতা, ক্লিপ, চুলবাঁধার অলংকৃত কাঁটা, রাবার ব্যান্ড, সেফটিপিন, চুড়ি, পুঁতিরমালা, ইমিটেশনের গয়না, জেড পাথর ও আর্টিফিশিয়াল মুক্তার মালা। চাই কী সাজগোজ করার উপটান, আই লাইনার, খোঁপার কাঁটা, শীতের দাওয়াই ভ্যাসেলিন, চুলে মাখার সুগন্ধী তেল, নানা ব্র্যান্ডের দেশি-বিদেশি গোসল করার সুগন্ধী গ্লিসারিন সাবান, নারীদের পরিধেয় কাপড় অলংকৃত করতে জরির লেইসসহ আরো কতো কি।

সম্প্রতি একজন লেইস ফিতাওয়ালাকে দেখা গেলো মালামালের বিশাল বোঝা, হাতে কাচ বাঁধানো একটি ভ্রাম্যমাণ শো-কেস নিয়ে সেই আগেকার মতো ঘুরে বেড়াতে। তিনি নগরীর পাড়ায়-মহল্লায়, বাড়ির আঙিনায় এসে হাঁক দিচ্ছেন- ‘লেইস ফিতা লেইস’ ‘এই লেইস ফিতা’। তার ডাক শুনে নারী, গৃহবধূরা এসে ভিড় করেন ঘরের দুয়ারে, লেইস ফিতা ওয়ালার কাছ থেকে দরদাম করে কিনে নেন যার যার প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বধূ-কন্যা-মাতাদের জটলায় ঘরের দুয়ারে যেন কেনাকাটার উৎসব শুরু হয়ে যায়। এই দৃশ্যটি চট্টগ্রাম মহানগরীর ৬০ বর্গমাইল এলাকার একজন সাধারণ মানুষের বসতবাড়ির দুয়ারে-আঙিনায় আগের মতোই দৃশ্যমান।

এখনও রাজবাড়ী জেলায় গ্রামের অলিগলিতে হেঁটে লেইস ফিতা, লেইস ফিতা বলে হাঁক দিচ্ছিলেন আব্দুল মিয়া। তার বয়স ৬০ পার হযেছে। বাড়ি ফরিদপুুর জেলায় ভাঙ্গায়। শহীদুল নামে অপর এক বিক্রেতা এই প্রতিবেদককে বলেন, তারা ২০০ জন লেইস ফিতাওয়ালা অস্থায়ীভাবে ভাড়া থাকেন গোয়ালন্দ এলাকায়। এটাই তাদের জীবিকা। বাড়িতে তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ে ও তিন ছেলে রয়েছে। ছেলেরা বিদেশে থাকে। আগে তার তারা দল বেঁধে আসেন আসতেন বিক্রি কম হওয়ার কারনে অনেকেই আগ্রহ হারাচ্ছেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০/৬০০ টাকা, আবার কোনো কোনো দিন ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত পণ্য বিক্রি হয়ে থাকে।

রাজবাড়ী জেলার পাঁচুরিয়ায় এক নিভূত গ্রামের গৃহবধূ আকলিমা বেগম জানান, তিনি সুঁইসুতা, নেপথালিন, সেফটিপিন. এমব্রয়ডারি করার উপকরণ, মাথায় মাখার সুগন্ধী তেল, চুলের ক্লিপ, সাবানসহ প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি পণ্য লেইস ফিতা ওয়ালাদের কাছ থেকেই কিনে থাকেন। এদের কাছ থেকে কেনা এসব পণ্য গুণে ও মানে ভালো পাওয়া যায় বলে তিনি জানান।

কালের স্রোতে এই দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে সমাজ থেকে। আধুনিক শপিংমল, অনলাইন মার্কেট কিংবা কসমেটিক্সের বিশাল দোকান আজ লেইস ফিতার জায়গা দখল করেছে। এখন আর অলিগলিতে ফেরিওয়ালার সেই উচ্ছ্বসিত ডাক শোনা যায় না। নারীদের সাপ্তাহিক প্রতীক্ষাও কোথাও মিলিয়ে গেছে। অথচ সেই অপেক্ষার মধ্যে ছিল এক ধরনের অনাবিল আনন্দ, এক সহজ-সরল সময়ের প্রতিফলন।

আজ লেইস ফিতা কেবলই এখন এক নস্টালজিয়ার অংশ। যারা সেই ডাক শুনে বড় হয়েছেন, তাদের স্মৃতির ভাঁজে এখনো রয়ে গেছে রঙিন চুড়ির ঝনঝনানি শব্দ কিংবা টিকলির ঝিলিক। এই ছোট্ট অথচ প্রাণবন্ত ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ ছিল। হয়ত আর ফিরে আসবে না, তবে ইতিহাসের পাতায় কিংবা মানুষের সুন্দর স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

লেখক একজন বিশিষ্ট কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81