04/04/2026
নেহাল আহমেদ, রাজবাড়ী | Published: 2026-04-04 05:46:38
বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হলো মেলা আর রাজবাড়ী জেলা এই ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ ধারক ও বাহক। বছরের বিভিন্ন সময়ে জেলার গ্রামেগঞ্জে বসা এসব মেলা শুধু বাণিজ্যিক আয়োজন নয়—এগুলো মানুষের মিলন, আনন্দ এবং সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ।
এক সময় লক্ষীকোল রাজার বাড়ীতে বৈশাখ মাসজুড়ে যে মেলা বসতো তা এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে রাজবাড়ীতে যেসব মেলার আয়োজন করা হয় তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী মেলা হচ্ছে বালিয়াকান্দির নলিয়ার মেলা এবং বরাটের শতবর্ষী নুছির মেলা। এসব মেলায় বাঁশ, বেত ও মাটির তৈরি সামগ্রী, মিষ্টি, পুতুলনাচ এবং নাগরদোলা গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্বাদ দেয়। অন্যদিকে, বাউলগান, পালাগান, কবিগান, যাত্রাপালা ও লোকগানের মূর্ছনায় সবাই আনন্দে মেতে ওঠে যা আমাদের সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও উৎসবের আমেজকে পুনরুজ্জীবিত করে।
রাজবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী এসব মেলার ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় আয়োজনের বিস্তারিত 'দ্য ফিন্যান্স টুডে' তার পাঠকদের জন্য আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরছে।
শত বছরের বেশি পুরনো এই মেলাটি বালিয়াকান্দির নলিয়া গ্রামে ফাল্গুন মাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ১০ দিনব্যাপী চলে। ধর্মীয় আচার, লোকবিশ্বাস এবং উৎসবের আমেজ এখানে একত্রে মিশে যায়।
অন্যদিকে, নচির মেলা রাজবাড়ী সদরের একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। এটি সাধারণত চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং স্বল্প সময়ের হলেও স্থানীয় মানুষের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
এছাড়া পাঁচুরিয়ার নসির মেলা-ও জেলার একটি উল্লেখযোগ্য লোকজ মেলা, যেখানে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
এই মেলাগুলোতে গ্রামীণ জীবনের বৈচিত্র্যময় রূপ দেখা যায়। মাটির তৈরি সামগ্রী, বাঁশের জিনিসপত্র, হাতে বানানো খেলনা এবং নানা ধরনের মুখরোচক ও ঐতিহ্যবাহী খাবার (পিঠা-মিষ্টি) সব মিলিয়ে এক জীবন্ত লোকজ বাজার তৈরি হয়। পাশাপাশি নাগরদোলা, লোকসংগীত, বাউল গান ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন মেলাকে করে তোলে প্রাণবন্ত।
রাজবাড়ীর অধিকাংশ মেলাই বসে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে, যখন প্রকৃতি নিজেই উৎসবের আবহ তৈরি করে। এছাড়া পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত লোকজ মেলাগুলো নতুন বছরের আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তোলে। ঈদ ও পূজার সময়ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অনেক মেলা বসে।
গ্রামীণ এই মেলাগুলো স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগররা এখানে তাদের পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পান। একইসঙ্গে এসব মেলা আমাদের সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ায়।
গ্রামীণ মেলার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ধর্মীয় আচার, মৌসুমি উৎসব কিংবা কোনো সাধক-ব্যক্তিত্বের স্মরণে এসব মেলার সূচনা হয়। সময়ের সাথে সাথে এগুলো হয়ে উঠেছে গ্রামের মানুষের আনন্দ, কেনাবেচা ও মিলনের প্রধান ক্ষেত্র। এখানে ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই এক হয়ে যায়। এটাই হচ্ছে মেলার আসল সৌন্দর্য। এছাড়াও, অতীতে আরো অনেক গ্রামীন বিনোদন ছিলো যা এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না।
পুতুল নাচ গ্রামীণ মেলার অন্যতম আকর্ষণ। কাঠ বা কাপড়ের তৈরি পুতুলকে সুতো দিয়ে নাচিয়ে শিল্পীরা নানা গল্পে তুলে ধরেন রাজা-রানী, লোককাহিনী কিংবা সামাজিক বার্তা। শিশুদের জন্য এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং কল্পনার এক জগতে প্রবেশের দরজা।
চরকি বা ঘূর্ণায়মান দোলনা শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় বিনোদনগুলোর একটি। ছোট্ট কাঠের বা লোহার কাঠামোতে বসে ঘুরতে ঘুরতে তারা পায় অদ্ভুত এক আনন্দ—সরল কিন্তু হৃদয়ছোঁয়া।
নাগর দোলা মেলার সবচেয়ে চোখে পড়া আয়োজন। বড় চাকার মতো এই দোলনায় চড়ে মানুষ উপরে উঠে পুরো মেলার দৃশ্য দেখতে পারে। শিশু থেকে বড়—সবাই এই দোলায় চড়ে এক ধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করে।
একসময় গ্রামীণ মানুষের জন্য সিনেমার একমাত্র মাধ্যম ছিল বাইস্কোপ। ছোট একটি বাক্সে চোখ লাগিয়ে দেখা যেত নানা ছবি ও দৃশ্য—গল্প, ইতিহাস বা শহরের ঝলক। এই সরল প্রযুক্তিই মানুষকে দিত নতুন জগত দেখার সুযোগ।
মেলায় পাওয়া মাটির খেলনা গ্রামীণ শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। ঘোড়া, হাতি, পাখি, পুতুল—সবই তৈরি হয় দক্ষ কারিগরের হাতে। এগুলো শুধু খেলনা নয়, বরং ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার প্রতীক।
মেলা মানেই নানা রকম সুস্বাদু খাবার (কয়েক পদের পিঠা (চিতই, ভাপা, পাটিসাপটা), বাতাসা, কদমা, জিলাপি, নাড্ডু, বাতাসা, মুড়ি-মুড়কি, তিলের খাজা ইত্যাদি)। এই খাবারগুলো শুধু স্বাদই দেয় না, বরং গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও আন্তরিকতার অনুভূতিও জাগায়।
গ্রামীণ মেলা আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য অংশ। পুতুল নাচ, চরকি, নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, মাটির খেলনা আর ঐতিহ্যবাহী খাবার—সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আনন্দের জগৎ। আধুনিকতার ভিড়ে এসব আয়োজন কিছুটা কমে গেলেও, এখনও এই মেলা আমাদের শিকড়ের গল্প বলে যায়।
দেশের গ্রামীণ মেলাগুলো শুধু বিনোদনের উৎস নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আধুনিকতার প্রবাহের মাঝেও এই মেলাগুলো আমাদের শিকড়ের সাথে সংযুক্ত রাখে এবং আমাদের পরিচয়কে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81