04/16/2026
শাহীন আবদুল বারী | Published: 2026-04-16 19:21:40
টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে কৃষক কার্ড পাওয়া কবির হোসেন প্রকৃত কৃষক নন। গত দুইদিন ধরে কিছু সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে এমন প্রচারনা চলছে। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, কবির হোসেন আদতে একজন প্রকৃত কৃষক। এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কৃষি মন্ত্রনালয়।
প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। এছাড়া, টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি আজ বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
উক্ত প্রতিবেদনে কৃষক কবির হোসেন প্রকৃতই একজন কৃষক। তিনি প্রান্তিক কৃষক হিসেবে কৃষক কার্ড পাবার যোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টাঙ্গাইল শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে কৃষক কার্ড বিতরন কর্মসুচির উদ্বোধন করেন। এসময় তিনি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ১৫ জন কৃষকের হাতে সরাসরি কৃষক কার্ড তুলে দেন। ঐ ১৫ জন কৃষকের মধ্যে ছিলেন ঘারিন্দা ইউনিয়নের তারুটিয়া গ্রামের কবির হোসেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে কৃষক কার্ড পাওয়া দুইজন অনুভুতি প্রকাশের সুযোগ পান। তার মধ্যে একজন কবির হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্ড বিতরন অনুষ্ঠানের ভিডিও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কবিরকে ভুয়া কৃষক বলে প্রচারনা চালানো হয়।
এই বিষয়টি সরকারের নজরে আসলে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর খামার বাড়ির মহাপরিচালক মোঃ আব্দুর রহিমকে প্রধান করে চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদ্প্তরের প্রশিক্ষন কর্মকর্তা মোঃ দুলাল উদ্দিন। এই কমিটির সদস্যরা গতকাল বুধবার কবির হোসেনের নিজ গ্রাম তারুটিয়ায় পরিদর্শনে যান। এই কমিটি দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পৃথক তদন্তু কমিটি গঠন করা হয় গতকাল বুধবার। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি আজ বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে 'কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী কবির হোসেন কৃষক কার্ড পাওয়ার যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে তারুটিয়া গ্রামে কবির হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৩ শতাংশ জায়গার উপর একটি দোচালা টিনের ঘর রয়েছে। ঘরের পাশেই টিনের তৈরি ছোট একটি রান্না ঘর। ঘরের পেছনে গোয়ালঘরে তিনটি গরু দেখা যায়। বাড়ির উঠানে পাটশাক ও ডাটার আবাদ করেছেন কবির। এর পাশেই রয়েছে খড়ের গাদা। ঘরের ভেতরে একটি খাট, একটি পুরাতন আলমারী ও ফ্রীজ এবং চেয়ার টেবিল রয়েছে। টেবিলের উপর সাজানো অবস্থায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গ্রহন করা কৃষক কার্ড।
দুই সন্তানের জনক কবিরের স্ত্রী সেলিনা বেগম জানান, আমার স্বামী একজন প্রকৃত কৃষক। আমার শশুরের রেখে যাওয়া অল্প জমি এবং অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করে আমার স্বামী। কৃষিকাজের পাশাপাশি ফেসবুকে কনটেন্ট বানিয়ে কিছু অতিরিক্ত আয় করে। তার কিছু এআই ছবি পোস্ট করার কারণে এখন অনেকে ভুল বুঝছে। একজন কৃষকের কি ভালো পোশাক পরা অপরাধ? সাজিয়ে-গুছিয়ে শুদ্ধভাবে কথা বলা কি অপরাধ? এসব যদি কোন অপরাধ না হয় তাহলে আমার স্বামীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেন এত বিভ্রান্তি ছড়ানো হলো।
স্থানীয় একটি মাদ্রাসার সভাপতি মাজেদ তালুকদার (৬৫) এই প্রতিবেদককে জানান, কবির একজন কৃষক। সে সবসময় কৃষিকাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। পিতার দেয়া শ্যালো মেশিন দিয়ে অন্যের জমি আবাদ করে। নিজের কোন কৃষি জমি নাই। বাপের মাত্র ১৩ শতাংশ জমিতে বাড়ি করেছে।
তারুটিয়া গ্রামের জনৈক হাবেল মিয়া জানান, টাঙ্গাইল সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হোসাইন সাদাব অন্তু কবির হোসেনকে ভুয়া কৃষক হিসেবে অভিহিত করে তার পেইজ থেকে পোষ্ট দেয়। অন্তু ৫ আগষ্টের পর থেকে পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়াতে পলাতক রয়েছে। সে ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিল। এই পোষ্টের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারনা শুরু হয়।
একই গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান (৫০) বলেন, কবির হোসেন আসলেই একজন কৃষক। পদে পদে ক্ষতিগ্রস্ত একজন মানুষ। বাবা মারা যাবার পর থেকেই সে কৃষি কাজে ব্যস্ত। কৃষি নিয়ে সে এতই ব্যস্ত থাকে যে বাড়িতে গিয়ে খাবার সময় তার হয় না। অকাজে তাকে কখনও কোন আড্ডা দিতে দেখা যায়নি। বেঁচে থাকার জন্য কবির কৃষিকাজে জড়িয়ে পড়ে।
আমিনুল ইসলাম (৪০) জানান, ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল কবির। কিন্তু পরীক্ষা দিতে পারেনি। এরপর সৌদি আরবে পাড়ি জমায়। কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে আসে। সে কৃষি কাজের পাশপাশি ফেসবুকে 'কবির হোসেন' নামে পেইজ বের করে। সেখানে প্রতিদিনই কোন না কোন বিষয়ে লাইভ দিত। এই পেজে তার অনেক ফলোয়ার রয়েছে। নিজের ছবি এআই দিয়ে বানিয়ে অনেক সময় পোষ্ট করতো। একজন প্রকৃত কৃষক হিসেবেই সে কৃষক কার্ড পেয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সঞ্জয় কুমার মহন্ত জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক শরীফা হক কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠিয়েছেন।
আলোচিত কৃষক কবির হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। আমার কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। আমাকে নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেকে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়াচ্ছে। এই কারণে আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমি এর সঠিক বিচার চাই।
উল্লেখ্য, ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইল শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত কৃষক কার্ড বিতরণ ও প্রি-পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির হাত থেকে কার্ড গ্রহণ করেন ঘারিন্দা ইউনিয়নের উত্তর তারটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত আবু সাইদ মিয়ার ছেলে কবির হোসেনসহ ১৫ জন কৃষকের মাঝে কৃষক কার্ড বিতরন করেন।
সরকারের এই ভালো কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এআই দিয়ে ফটোকার্ড তৈরি করেছে। চক্রান্তকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ। এসব কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে কৃষক কার্ড প্রদান করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। শ্রেণিগুলো হলো- ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় কৃষক।
কৃষকদের শ্রেণিবিন্যাস:
৫ শতকের কম জমির মালিক → ভূমিহীন
৫–৪৯ শতক জমির মালিক → প্রান্তিক
৫০–২৪৯ শতক জমির মালিক → ক্ষুদ্র
২৫০–৭৪৯ শতক জমির মালিক → মাঝারি
৭৫০ শতকের বেশি জমির মালিক → বড় কৃষক
গত ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) সরকার প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলায় ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করেছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের তথ্য অনুযায়ী, ২,২৪৬ জন ভূমিহীন কৃষক, ৯,৪৫৮ জন প্রান্তিক কৃষক, ৮,৯৬৭ জন ক্ষুদ্র কৃষক, ১,৩০৩ জন মাঝারি কৃষক এবং ৯১ জন বড় কৃষক এই কার্ড পেয়েছেন।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণির কৃষকদের একটি সুসংগঠিত কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করছে সরকার।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81