১৬০০ কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার ।। ১৫টি মামলা সত্বেও বহাল তবিয়তে।। রহস্যময় অন্তর্ধান
সিডিএ'র আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ কাজী শামসের অবিশ্বাস্য দুর্নীতি ও জালিয়াতি
চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার এড়াতে কাজী হাসান বিন শামস বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে বৈধ বা অবৈধ কোনো পন্থায় তিনি দেশত্যাগ করেছেন কিনা সেই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউই নিশ্চিত নন
বিশেষ প্রতিবেদন
দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ১৫টি মামলায় অভিযুক্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বর্তমানে কোথায় আছেন; সরকার বা প্রশাসনের কেউই তা জানেন না। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই এখন চরম বাস্তবতা। তার এই রহস্যময় অন্তর্ধান এখন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে সরকার ও প্রশাসনের অভ্যন্তরে। কাজী শামসের ক্ষমতা, প্রভাব ও খুটির জোর কতটা শক্তিশালী এবং তার নেটওয়ার্ক কত বড় সেটি তার আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় স্বচ্ছ কাচের মতো পরিষ্কার সর্বমহলে।
একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০৮ সালে কাজী হাসান বিন শামসসহ পাঁচজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মোট ১৫টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পের নির্মাণ কাজে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ভাতা গ্রহন ও ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে অতিরিক্ত বিল উত্তোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এই মামলাগুলো করা হয়েছিলো।
এর মধ্যে, কালুরঘাট সড়ক প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মামলায় চার্জশিটভূক্ত আসামী হয়েও কাজী হাসান বিন শামস বহাল তবিয়তে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ও তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-১ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন বা চাকুরী বিধিমালা তার জন্য কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর একজন চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার এড়াতে কাজী হাসান বিন শামস বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে বৈধ বা অবৈধ কোনো পন্থায় তিনি দেশত্যাগ করেছেন কিনা সেই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউই নিশ্চিত নন।
কর্মজীবন
সিডিএ'র আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ কাজী হাসান বিন শামসের গ্ৰামের বাড়ী চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। তিনি ১৯৯৮ সালের ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) তে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। তার ২০১৯ সালে তিনি প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর তাকে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করায় বিধি মোতাবেক কাজী হাসান বিন শামসকে অবমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
দীর্ঘ ২৭ বছর ৯ মাস সিডিএ'তে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নকশা অনুমোদন, ছাড়পত্র, আর্থিক নথি প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকল্প অনুমোদনে অনিয়ম এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।
খোদ সিডিএ-র নথিপত্র, মন্ত্রণালয় ও আদালত সূত্রে কাজী হাসান বিন শামসের দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের এক রোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে দ্য ফিন্যান্স টুডের বিশেষ অনুসন্ধানে। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে কাজী শামসের আমলনামা তুলে ধরা হলো।
দুর্নীতিতে হাতেখড়ি
কাজী হাসান বিন শামস দুর্নীতির খাতা খোলেন ২০০৫ সালে। চট্রগ্রাম নগরের বাকলিয়ায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কল্পলোক আবাসিক এলাকা (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পের পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পেয়েই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে এই প্রকল্পে কাজী শামসের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি তাকে শুনানিতে ডাকলেও অদৃশ্য ইশারায় সেই তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ৫ মামলা
২০০৮ সালে অক্সিজেন-কুয়াইশ বুড়িশ্চর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পিডি থাকাকালীন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে অবিশ্বাস্য জালিয়াতি করেন কাজী হাসান। ২০০৬ সালে নির্মিত দুটি ক্রস কালভার্টের (লট নং- ১৭ ও ২৫) প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় ছিল যথাক্রমে ২ লাখ ২৪ হাজার ও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু ভুয়া পরিমাপ বই (এমবি) ও ভুয়া বিল তৈরি করে সিডিএ থেকে উত্তোলন করা হয় যথাক্রমে ৫ লাখ ৯১ হাজার ও ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এভাবে সরকারের ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় কাজী হাসানের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা দায়ের করে দুদক।
ট্রুথ কমিশনে দায় স্বীকার
দুর্নীতির জাল থেকে বাঁচতে ২০০৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজী হাসান বিন শামস বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখার মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে ট্রুথ কমিশন থেকে মার্জনাপত্র নেন।
তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিশন— সাবেক বিচারপতি হাবিবুর রহমান খান, সাবেক নিয়ন্ত্রক ও অডিটর জেনারেল আসিফ আলী এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মঞ্জুর রশিদ চৌধুরী এই মার্জনাপত্রে স্বাক্ষর করেন।
তবে পরবর্তীতে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ ট্রুথ কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করায় তার সেই মার্জনা বাতিল হয়ে যায়।
আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলার দায় থেকে তার পার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এমনকি ২০১২ সালে গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিলেও সিডিএ-র তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুস সালাম তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে সযত্নে আগলে রাখেন।
মেগা প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়ম
নগরীর পতেঙ্গায় টানেলের প্রান্ত থেকে সাগরিকা পর্যন্ত সাগরতীর ধরে নির্মাণ করা হয় আউটার রিং রোড। এটি ছিলো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গৃহীত অন্যতম একটি মেগা প্রকল্প। লুটপাটের খতিয়ান থাকার পরও ২০১১ সালে কাজী হাসান বিন শামসকে দেওয়া হয় এই প্রকল্পের দায়িত্ব। ৮৫৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প দফায় দফায় সংশোধন করে খরচ বাড়ানো হয় ৪ গুণ! ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্পে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ৬০%।
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে কাজী হাসান বিন শামস এই প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল) অনুযায়ী একজন পিডি-কে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। একাধিক পদ থাকার পরও তিনিই এই প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৯ সালের ১৩ জুলাই নির্মাণাধীন পতেঙ্গা আউটার রিং রোডের কয়েকশ ফুট ধসে পড়ে, সরে যায় মূল শহর রক্ষা বাঁধের ব্লক। রড বা বাঁশ ছাড়াই যেনতেন সিসি ঢালাইয়ের কারণে সিডিএ-র কাজের মান নিয়ে তীব্র সমালোচনা ঝড় ওঠে।
এখানেই শেষ নয়; এই প্রকল্পে নিযুক্ত সিডিএ-র ৭ কর্মকর্তা মূল বেতনের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত পাওয়ার নিয়ম থাকলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিয়েছেন ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ। ২০২১ সালে দুদক কাজী শামসকে রহস্যজনক ‘দায়মুক্তি’ দিলেও, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এই প্রকল্পে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
ক্ষমতার অপব্যবহার
বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড প্রকল্পে সীতাকুণ্ড মৌজায় স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে রিসোর্ট নির্মাণে সরাসরি সহায়তা করেন কাজী হাসান। বিনিময়ে ওই এলাকায় নিজের নামেও বিশাল জায়গা কেনেন তিনি। সিডিএ-র বড় বড় টেন্ডার পাইয়ে দিতে তাকে ব্যাকআপ দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার
কাজী হাসান বিন শামস নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বরত থাকলেও অদৃশ্য শক্তির আশীর্বাদে দীর্ঘদিন সিডিএএ'তে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (১–২), প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত), বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালকসহ মোট আটটি পদ একাই ধরে রেখেছিলেন। তার নেতৃত্বে আউটার রিং রোডের মতো মেগা প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়েছিলো।
এফটি টীমের প্রাথমিক অনুসন্ধান চলাকালে একাধিক সূত্র থেকে এই প্রতিবেদকের পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নিজের মামা (দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোসলেম উদ্দিন), সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং চট্রগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে ব্যবহার করে সিডিএ-র পুরো নিয়ন্ত্রণ নেন কাজী হাসান।
কাজী হাসান বিন শামস বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয়ে উক্ত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মূল নির্বাহী প্রকৌশলী পদে থেকেও দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এবং প্রকল্প পরিচালকের মতো আটটি অতিরিক্ত পদ একাই ধরে রেখেছিলেন। এই পদগুলো সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে একাই সামাল দিয়েছেন।
এর ফলে, একদিকে সেবাপ্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, একই ব্যক্তি নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন এবং নিজেই আবার প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে সেটার তদারকি করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতাচ্যুতি
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কাজী হাসান বিন শামসের ক্ষমতা কমে আসে। সিডিএ'র অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে। এই চাপের মুখে পূর্বের ৮টি অতিরিক্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিতে তিনি বাধ্য হন।
সিডিএ'র সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার ছেড়ে দেওয়া পদগুলো তিনজন সিনিয়র প্রকৌশলীর মধ্যে বণ্টন করা হয়। এর মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী এজিএম সেলিমকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, মনজুর হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-১ এবং আশরাফুল ইসলামকে আউটার রিং রোড প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে পদবঞ্চিত থাকা এই প্রকৌশলীরা বর্তমানে তাদের নতুন দায়িত্ব পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য প্রকল্পটি সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের আমলে নেওয়া। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার প্রয়াসে জালিয়াতি
২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের মামলা সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় কাজী হাসানের বিপক্ষে গেলেও তিনি দমে যাননি। একই বছরের ৩ নভেম্বর মামলা থেকে 'অব্যাহতি' পাওয়ার ভুয়া ধোঁয়াশা তুলে প্রধান প্রকৌশলী পদের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। নিয়মিত পদোন্নতি পেতে ১০ নভেম্বর উচ্চ আদালতে রিট করেন। কিন্তু জমা দেন জাল নথিপত্র!
আদালতে তিনি সিডিএ চেয়ারম্যান বরাবর করা দুটি আবেদনপত্র (২০১৯ ও ২০২৫ সালের) সংযুক্ত করেন, যেখানে দুই আবেদনেই তিনি ২১ বছর কর্মরত আছেন বলে দাবি করেন। অর্থাৎ ৬ বছরের ব্যবধানেও তার কর্মজীবনের হিসাব অপরিবর্তিত! সিডিএ নথিপত্র ঘেঁটে জানিয়েছে, ওই আবেদনপত্রগুলোর রিসিভ কপি ভুয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরের সাথে মেলার কোনো সুযোগ নেই।
তাছাড়া, চউকের চাকরি প্রবিধানমালা ১৯৯০ অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলী হতে হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কাজী হাসানের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ায় তার সেই যোগ্যতাই নেই। এছাড়া তার নামে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের পাঁচটি মামলা চলমান রয়েছে, যা রিটে গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ সিডিএর।
পদ রক্ষায় ১৬ বছরে ৪৪টি রিট
সিডিএর একটি সূত্র জানায়, গত ১৬ বছরে নিজের পদ রক্ষায় কাজী হাসান বিন শামস রেকর্ড ৪৪টি রিট পিটিশন করেছেন। এসব রিটেও অসত্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে ১১ ডিসেম্বর সিডিএ-র ২০ হাজার ৭১৬ কোটি টাকার ১৩টি মেগা প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে ৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু অভিযোগ উঠে, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং ‘এ্যাব’ মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হাছিন আহমেদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে সেই তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হন কাজী হাসান বিন শামস।
যুক্তরাষ্ট্রে অর্থপাচার!
বিগত ১৬ বছরে প্রকল্প কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে কাজী হাসান প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। যার বড় একটি অংশ পাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
সূত্রমতে, কাজী হাসান বিন শামসের বড় মেয়ে নিউইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন এবং মেয়ের নামেই নিউইয়র্ক স্টেটে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কেনা হয়েছে। আর সেই সম্পত্তি ক্রয়ে কাজী হাসান বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচার করেছেন বলে জানা গেছে।
বদলি বিতর্ক
দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর সিডিএ-তে দায়িত্ব পালনের পর আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ কাজী শামসকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত বছরের ২০ নভেম্বর সিডিএ থেকে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করে। কিন্তু নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করে অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।
সরকারের একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত বছরের ২০ নভেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৪ এর সিনিয়র সহকারী সচিব আম্বিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে কাজী হাসান বিন শামসকে সিডিএ থেকে আরডিএ-তে বদলি করে বলা হয়েছিলো ২৩ নভেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান না করলে সিডিএ থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন তিনি।
নিয়মানুযায়ী, ২৩ নভেম্বর (রবিবার) অপরাহ্নে সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে অবমুক্ত ঘোষণা করেন। মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশের সূত্র ধরে তিনি উক্ত আদেশ জারি করেছিলেন। তবে, সোমবার (২৪ নভেম্বর) বিকাল ৫টা পর্যন্তও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)-এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান না করে বর্তমানে নিখোঁজ বা পলাতক রয়েছেন কাজী হাসান বিন শামস।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে এই প্রতিবেদককে বলেন, অদ্যাবধি তিনি যোগদান করেননি। এই বিষয়ে আমার সাথে তিনি যোগাযোগও করেননি।
সচেতন মহলের ভাষ্যমতে, আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ কাজী হাসান বিন শামসের খুঁটির জোরে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একক আধিপত্যের ফলে সিডিএ'র স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যা নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। একের পর এক জালিয়াতির পরও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যদিও আউটার রিং রোডসহ বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো গভীর তদন্তের দাবি রাখে। তবে, নতুন করে দায়িত্ব বন্টনের ফলে সিডিএ'র কাজে গতিশীলতা ফিরবে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।
Shamiur Rahman
