May 28, 2026, 5:48 am


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-05-28 01:06:19 BdST

৪ হাটের ইজারায় সিন্ডিকেটের কারসাজি, অনিয়মের জেরে বাতিল ৬টি হাটডিএনসিসির ১১টি হাটেই বিএনপির আধিপত্য; চাঁদাবাজি না হলেও সংঘাতের আশঙ্কা


ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১১টি পশুর হাটেই চাঁদাবাজি, ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাসোহারা, নেতৃবৃন্দের চাঁদাবাজি এবং হাটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার হাট, উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের হাট, ভাটারা ও কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন এলাকার হাট, খিলক্ষেত ও কাওলা এলাকার হাট এবং হরিরামপুর ও ডুমনি বাজার এলাকার হাটে এই সংঘাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তবে, সরেজমিনে এসব হাট ঘুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছেন, ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন অস্থায়ী ১০টি হাট এবং স্থায়ী গাবতলী পশুর হাটে এখন পর্যন্ত কোনও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।

গাবতলী হাটে গরু বাঁধার জন্য প্রতি খুঁটির জন্য ১৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এমন প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক মিল্টন বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছি। এমন কোনও সত্যতা পাইনি। এছাড়া হাট ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে। তদন্তে ৫ শতাংশ হাসিলের বেশি অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এর আগে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)-র পশুর হাট ইজারায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের ব্যাপক আধিপত্য ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে। নিয়ম ভেঙে ও প্রতিযোগিতা ছাড়াই নামমাত্র মূল্যে প্রভাবশালী মহল নিজেদের কবজায় নিয়েছে বেশিরভাগ হাট। ইজারাবঞ্চিত অনেক প্রতিষ্ঠান ডিএনসিসির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সর্বোচ্চ দরদাতা না হয়েও প্রভাবশালীদের ইজারা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

পশুর হাটের ইজারা প্রদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকালে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিএনপি ও এর অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের একচেটিয়া আধিপত্য দেখা গেছে। অস্থায়ী ১০টি ও একটি স্থায়ী হাটের আটটিই পেয়েছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। বাকি তিনটির ইজারা ব্যবসায়ীদের নামে থাকলেও নেপথ্যে এই ৩টি হাটও নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারাই।

'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র নিবিড় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১১টি হাটের মধ্যে বেশ কয়েকটি হাটেই সরকারি দরের চেয়ে মাত্র কয়েক হাজার টাকা বেশি মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এসব হাটে দরপত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সংখ্যাও ছিলো কম। সেই কারণে গত বছরের তুলনায় এবার অন্তত চার কোটি টাকা কম রাজস্ব পেয়েছে ডিএনসিসি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি দরের কাছাকাছি দামে ইজারা পাওয়ার বিষয়টি ‘সিন্ডিকেট’ বা ‘সমঝোতার’ ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সবকিছুর দাম যেখানে বাড়ছে, সেখানে সিটি কর্পোরেশনের হাট ইজারার আয় কমে যাওয়া প্রশ্নের উদ্রেক করে। যেহেতু সরকারদলীয় লোকেরা ইজারা পেয়েছেন এবং দরপত্রে অংশ নেওয়ার সংখ্যাও কম, সেহেতু এখানে সমঝোতা হয়ে থাকতে বা সরকারদলীয়দের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হতে পারে। ফলে দরপত্র প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

রাজস্ব আদায় হ্রাস

ডিএনসিসির বেশিরভাগ হাটেই হাতেগোনা কয়েকটি দরপত্র জমা পড়ায় সরকারি দরের চেয়ে কিছু টাকা বেশি দিয়ে ইজারা বাগিয়ে নিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। একাধিক হাটের দরপত্রে কোন ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল না। কোনো কোনো স্থানে সরকারের ভিত্তিমূল্যের চেয়ে সামান্য বেশি বা মাত্র ১০,০০০ টাকা বেশি দর দিয়ে একক ঠিকাদার হিসেবে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কিছু হাটের দরপত্র নিয়েও চরম লুকোচুরি হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে দরদাতা সর্বোচ্চ দরদাতা হওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে জামানত জমা দেননি। মূলত, বিনা টেন্ডারে 'খাস কালেকশনের' নামে গোপনে বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়। অনেকটা ‘প্রতিযোগিতাহীন’ এই ‘সমঝোতার’ দরপত্রের কারণে গত বছরের তুলনায় সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আয় কমেছে।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, এবার কোরবানির হাট থেকে সব মিলে আদায় হয়েছে ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে অস্থায়ী হাট থেকে এসেছে ৩০ কোটি ৩২ লাখ ২৪ হাজার এবং স্থায়ী (গাবতলী) হাট থেকে এসেছে ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ৪৮ লাখ ৫১ হাজার ৩০ টাকা।

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান বলেন, ‘কে কোন দলের, সেটা বিবেচনা করে হাটের ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পে-অর্ডারসহ যাবতীয় নথিপত্র যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কোনও হাটের দরপত্র নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে দিতে হবে। যেসব হাটের ইজারা এখনও হয়নি, সেগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।’

হাট পেলেন যারা

ডিএনসিসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এবার একটি হাটে কোনো প্রতিযোগীই ছিল না। বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রি হলেও, জমা পড়ে মাত্র একটি। ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা পান স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।

একইভাবে ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁচকুড়া বাজার সংলগ্ন হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রি হয় এবং তিনটিই জমা পড়ে। ১৫ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ২৭ লাখ টাকায় ইজারা পান উত্তরখান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম সরকার।

বড় বেরাইদ বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গায় হাটের ২১টি শিডিউল বিক্রি হলেও, জমা পড়ে তিনটি। ১ কোটি টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ৫ কোটি ৭ লাখ টাকায় ইজারা পান ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আতাউর রহমান।

বাড্ডা স্বদেশ প্রপার্টি এলাকার হাটে ১৯টি সিডিউল বিক্রি ও চারটি জমা পড়ে। সেখানে ৫০ লাখ টাকার সরকারি দরের বিপরীতে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ইজারা পান উত্তর বিএনপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক তুহিনুর ইসলাম।

৩০০ ফিট ডুমনি হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রির বিপরীতে সমানসংখ্যক জমা পড়ে। ৬০ লাখ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা পান উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তার হোসেন।

উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর হাটে ১৯টি সিডিউল বিক্রি হয়, জমা পড়ে চারটি। ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা পান ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন হাটে ১৭টি শিডিউল বিক্রি ও তিনটি জমা পড়ে। ১ কোটি ১৩ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ইজারা পান মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম।

পূর্ব হাজীপাড়ার ইকরা মাদ্রাসা-সংলগ্ন হাটে ৯টি শিডিউল বিক্রি ও তিনটি জমা পড়ে। ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় ইজারা পান জিয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও রামপুরা থানা বিএনপির সদস্য এম আসলাম।

ব্যবসায়ীদের আড়ালেও বিএনপি

ডিএনসিসির ৮টি হাটের ইজারা বিএনপির নেতৃবৃন্দ পাওয়ার পর বাকী ৩টি হাটের ইজারা কাগজে-কলমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নামে নেওয়া হলেও এর নেপথ্যে বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে বাকি তিনটি হাট।

মিরপুর সেকশন-৬ (ইস্টার্ন হাউজিং) হাটে পাঁচটি শিডিউল বিক্রি হলেও, জমা পড়ে তিনটি। ১ কোটি ৭৬ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৮ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় ইজারা পান সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী।

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাটটি পরিচালনার নেপথ্যে আছেন উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম ও রূপনগর থানা বিএনপির সদস্য এম আশরাফুল ইসলাম।

মিরপুর কালশী বালুর মাঠ হাটে তিনটি শিডিউল বিক্রি ও দুটি জমা পড়ে। ৩০ লাখ টাকার বিপরীতে মাত্র ১১ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা পান ব্যবসায়ী রেদোয়ান রহমান। এই হাট পরিচালনার নেপথ্যে রয়েছেন পল্লবী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন।

এছাড়া, ডিএনসিসির একমাত্র স্থায়ী গাবতলী পশুর হাটে ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ টাকা সরকারি দরের বিপরীতে মাত্র ১১ হাজার ৬১০ টাকা বেশি দিয়ে (১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা) ইজারা পেয়েছেন মো. হানিফ, যিনি বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী এবং হানিফ এন্টারপ্রাইজ নামে পরিবহন কোম্পানির মালিক।

৪ হাটের ইজারায় সিন্ডিকেটের অভিযোগ

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আসন্ন কোরবানির পশুর হাট ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম এবং যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। কোনো ধরনের অফিসিয়াল গেজেট ঘোষণা ছাড়া অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পছন্দের বিশেষ মহলকে হাট পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

ডিএনসিসির চারটি প্রধান হাটের দরপত্র প্রক্রিয়ায় এই অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এই কারণে বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই অনিয়মের নেপথ্যে জড়িত ছিলেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

স্বদেশ প্রপার্টির খালি জায়গায় হাট

বাড্ডা থানার আওতাধীন স্বদেশ প্রপার্টির খালি জায়গায় হাটের সরকারি ভিত্তি মূল্য ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। হাটটি ইজারা পান উত্তর বিএনপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক তুহিনুর ইসলাম। এই হাটের ইজারা প্রদানে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এখানে মোট চারটি দরপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে এ্যামাবা ট্রেড অ্যাসোসিয়েট এর পক্ষ থেকে ফাহিম মোহাম্মদ আকিল মাহমুদ সর্বোচ্চ ৭ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা বিড করেন। মোহাম্মদ মেহেদী মাসুদ রানা ৯১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বিড করে ২৯ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকার পে-অর্ডার এবং মোঃ ওমর ফারুক ৭১ লক্ষ টাকা বিড করে ২১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেন। অন্যদিকে, তুহিনুল ইসলাম ২ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা বিড করে ৭০ লক্ষ টাকার পে-অর্ডার জমা দেন।

নিয়ম অনুযায়ী, স্বদেশ প্রপার্টির খালি জায়গার হাটের ইজারা সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে এ্যামাবা ট্রেড অ্যাসোসিয়েটের পাওয়ার কথা থাকলেও অনিয়ম ও কারচুপির মাধ্যমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা তুহিনুল ইসলামকে এই হাটের ইজারা প্রদান করে ডিএনসিসি।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে এ্যামাবা ট্রেড অ্যাসোসিয়েট এর পক্ষ থেকে ফাহিম মোহাম্মদ আকিল মাহমুদ বলেন, সরকারি নিয়ম বা গেজেট প্রকাশের আগেই একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ বাগিয়ে নিয়ে হাট বসিয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনা ও যোগসাজশের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ এবং বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতারা হাটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অন্যদিকে মেহেদী মাসুদ বলেন, ভুয়া পে-অর্ডার দিয়ে এই হাটটি নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসির কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই অনিয়মের সাথে জড়িত।

বড় বেড়াইদ বা বসুন্ধরার খালি জায়গার হাট

বড় বেড়াইদ বা বসুন্ধরার ভেতরের খালি জায়গায় হাটের জন্য সরকারি ভিত্তি মূল্য ছিল ১ কোটি টাকা। এখানে তিনটি টেন্ডার জমা পড়ে। এএম এন্টারপ্রাইজ নামে আতাউর রহমান ৫ কোটি ৭ লক্ষ টাকা বিড করেন এবং ১ কোটি ৫২ লক্ষ ১০ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেন। মাহমুদ হাসান মুনির নামে এক ব্যবসায়ীর পক্ষে আরেকটি টেন্ডার জমা পড়ে ১ কোটি ৮২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার এবং পে-অর্ডার হয় ৫৪ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার। একই হাটের জন্য মোহাম্মদ রকিবুল ইসলামের নামে আরেকটি টেন্ডার জমা পড়ে ১ কোটি ২১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার, যার পে-অর্ডার ছিল ৩৬ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা।

মাহমুদ হাসান মুনির অভিযোগ করেন ভুয়া পে-অর্ডারের মাধ্যমে হাটটি নেওয়া হয়েছে এবং সরকারের কোষাগারে তাদের টাকা জমা দিতে বিলম্ব করে। আর আমরা প্রকৃত টাকা জমা দিয়েও কারসাজিতে পরে গিয়েছি।

বনরুপা আবাসিক প্রকল্পের হাট

বনরুপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গায় পশুর হাটের জন্য সরকারি ভিত্তি মূল্য ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে এই হাটের জন্য মাত্র একটি টেন্ডার জমা পড়ে। আরিফিন এন আরাফ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভিত্তি মূল্যের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ১০ হাজার টাকা বিড করে।

নিয়ম অনুযায়ী, মাত্র একটি দরপত্র জমা পড়লে পুনরায় টেন্ডার ডাকার বিধান থাকলেও, এক্ষেত্রে তা করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিডের বিপরীতে ৫৪ লক্ষ ৩ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেয়। একক দরদাতার মাধ্যমে হাটটি চূড়ান্ত করার এই প্রক্রিয়াকে সাজানো নাটক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

মহাখালী টিএনটি মাঠের হাট

মহাখালী টিএনটি মাঠের হাটের সরকারি ভিত্তি মূল্য ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। অথচ এখানে যে তিনটি টেন্ডার জমা পড়েছে, তার প্রতিটিই সরকারি মূল্যের অর্ধেকেরও কম। এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেডিং ১৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বিড করে ৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেয়। মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আহমেদ নামের আরেকজন ১৭ লক্ষ টাকা বিড করে ৫ লক্ষ ১০ হাজার টাকার পে-অর্ডার করেন। একই হাটের জন্য আরেকটি কোম্পানি ১৬ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা বিড করে ৫ লক্ষ ১০ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেয়।এই তিনটি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানই মূলত একই সিন্ডিকেটের সদস্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগকারীরা বলেন, সরকারি ভিত্তি মূল্য ৫০ লক্ষ টাকা হওয়া সত্ত্বেও কেন ১৭ লক্ষ টাকার ঘরে বিড গ্রহণ করা হলো, তা নিয়ে কোনো সদুত্তর নেই ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের। এটি স্পষ্টত একটি যোগসাজশের বিডিং, যেখানে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

খাস কালেকশনের অভিযোগে ৬ হাট বাতিল

ডিএনসিসির ১৬টি অস্থায়ী হাটের বিপরীতে ১০টি হাট চুড়ান্ত হলেও শেষ মুহুর্তে ৬টি হাট বাতিল হয়েছে নানা অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগে। সূত্র মতে, এই ৬টি হাটের দরপত্র নিয়ে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত চলে নানা লুকোচুরি। ৪টি হাটে কেউ দরপত্র দাখিলই করেননি এবং দুইটি হাটে দরপত্র দাখিল করে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হলেও অনুমোদিত টাকা নির্ধারিত সময়ে জমা না দেওয়ায় বাতিল হয়ে যায়।

বিভিন্ন মহল থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই ৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বিনা টেন্ডারে নেয়ার উদ্দেশ্যে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে গোপনে আতাত করেছিলো কথিত খাস কালেকশনের নামে পুরো অর্থ ভাগাভাগি করতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এই ৬টি হাটের মধ্যে ৩০০ ফিট সংলগ্ন ডুমনি মৌজায় যমুনা গ্রুপের নিজস্ব জমিতে অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য দরপত্র নিয়েছিলেন মেসার্স মসিকা এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো: আক্তার হোসেন। এই হাটটির সরকারি দর ছিলো ৬০ লাখ টাকা। সর্বোচ্চ দর উঠেছিলো ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা না দেওয়ায় হাটটি বাতিল হয়ে যায়।

মহাখালী টিএন্ডটি মাঠ হাটে কেউই দরপত্র নিতে সিডিউল ক্রয় করেননি। ভাটুরিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে ১০ নং সেক্টর রানাভোলা এভিনিউ সংলগ্ন উত্তরা স্লুইচগেট পর্যন্ত এলাকার হাটের সরকারি দর ছিলো ৬০ লাখ টাকা। সর্বোচ্চ দরদাতা (৮৮ লাখ টাকা) ছিলেন মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজ প্রোপ্রাইটর মো: নুরু আলম। তিনিও নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা না দেওয়ায় হাটটি বাতিল হয়ে যায়।

খিলক্ষেতের মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন পশ্চিমপাড়ার খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি দর ছিলো ৯৩ লাখ ২২ হাজার ৩৩৪ টাকা। সর্বোচ্চ দরদাতা (৩ কোটি ৭ লাখ টাকা) বিল্লাল হোসেন হাটটি ইজারা পেয়েছিলেন। তবে খিলক্ষেতের র্এই হাটের ইজারাদার টাকা জমা দেননি এবং কার্যাদেশ নিতে আসেননি বলে এই হাটটিও বাতিল হয়েছে।

২১ নম্বর ওয়ার্ডের মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার-সংলগ্ন খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি দর ছিলো ১৪ লাখ টাকা। এই হাটের জন্য ৩১টি শিডিউল বিক্রি হলেও একটিও জমা হয়নি। ফলশ্রুতিতে, হাটটি বাতিল হয়ে যায়।

মোহাম্মদপুরের বসিলার ৪০ ফুট সড়ক-সংলগ্ন খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য ৪টি শিডিউল বিক্রি হলেও কেউই শিডিউল জমা দেননি।

ভাটারার সুতিভোলা খালসংলগ্ন খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য সরকারি দর ছিলো ৩ কোটি ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। এই হাটে ১৫টি শিডিউল বিক্রি হওয়া স্বত্বেও একটিও জমা হয়নি।

ইজারার প্রজ্ঞাপন প্রকাশে লুকোচুরি

নিয়ম অনুযায়ী, টেন্ডার খোলার পর সর্বোচ্চ দরদাতাকে সাময়িকভাবে নির্বাচিত করে সাথে সাথে অফিসিয়াল গেজেট প্রকাশ করার কথা। কিন্তু এই চারটি হাটের ইজারার জন্য ডিএনসিসি তাৎক্ষণিক কোনো গেজেট ইস্যু করে নাই।

কে বা কারা সর্বোচ্চ বিড করে টেন্ডার পেয়েছে, তারও কোন অফিসিয়াল ডিক্লারেশন তাৎক্ষণিকভাবে না দিয়ে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ পাঁচ দিন পরে গেজেট প্রকাশ করে।

এদিকে, নিয়ম অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের পর নির্ধারিত দিন থেকে হাট পরিচালনার কথা থাকলেও ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজশে ইজারাদাররা নির্ধারিত দিনের তিন দিন আগে থেকেই হাট পরিচালনা শুরু করে। যা রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী স্পষ্টভাবে অনিয়ম বা দুর্নীতি।

ডিএনসিসির উর্ধতন একজন কর্মকর্তা জানান, ‘এসব বিষয়ে রিভিউ কমিটি পর্যালোচনা করে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই হাটগুলোর ইজারা প্রদান করেছে।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির অপর এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, উর্ধতন মহল থেকে চাপ থাকায় অনেক সময় নিয়ম ভেঙে কম মূল্যের টেন্ডার গ্রহণ করতে হয়। আমরা এবার এমনও পে-অর্ডার গ্রহণ করেছি যা সম্পূর্ণ ভূয়া এবং লোক দেখানো। উপরের মহলের নির্দেশে আমরা এসব গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।

এই ব্যাপারে জানতে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান এবং প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানকে মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।

তবে একই বিষয়ে আগে শফিকুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, দলীয় বিবেচনায় হাটের ইজারা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেছিলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সর্বোচ্চ দরদাতা ও শর্ত পূরণকারী ব্যক্তিকেই মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীতে পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়াও সাধারণ মানুষের সুবিধা এবং ঈদযাত্রায় যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই রাজধানীতে পশুর হাটের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। পাশাপাশি হাট ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে সিটি করপোরেশন আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.