32344

03/28/2026

সিলেটে ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’র ব্যানারে জুয়ার ব্যবসা ও অর্থপাচার

আব্দুর রহিম | Published: 2026-03-28 01:22:52

ছাত্রজীবনে শিবিরের রাজনীতিতে হাতেখড়ি, এরপর শিক্ষকতা, বর্তমানে সিলেটের ব্যবসায়ী ও জামায়াত সমর্থক মাসরুর মাসুম ওরফে আবু ওয়াফি গড়ে তুলেছেন এক ভয়ংকর ও বিষাক্ত অপরাধী সাম্রাজ্য।বাহ্যিকভাবে আলেম-ওলামাদের সাথে গভীর সখ্যতা এবং নিখুঁত ধর্মীয় লেবাস বজায় রাখলেও, নেপথ্যে তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন ‘লাইনবেট’-এর মতো আন্তর্জাতিক নিষিদ্ধ জুয়ার সাইট ও কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল হুন্ডি সিন্ডিকেট।

‘ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’র ব্যানারে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের আড়ালে পরিচালিত এই অন্ধকার জগতের লোমহর্ষক তথ্য এবং মাসুমের চরম শঠতার অকাট্য প্রমাণ উঠে এসেছে আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক পরিচয়কে চতুরতার সাথে পুঁজি করে গড়ে তোলা এই ‘আদর্শিক মুখোশধারী’ মাফিয়ার অপরাধের সমস্ত নথিপত্র ও চাঞ্চল্যকর কল রেকর্ড এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

প্রিন্টিং ব্যবসার আড়ালে জুয়ার পেমেন্ট গেটওয়ে

সিলেটের আম্বরখানার মইন কমপ্লেক্সের (বি-৬) নিচতলায় অবস্থিত ‘ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’—বাহ্যিকভাবে একটি সাধারণ গ্রাফিক্স ডিজাইন ও মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান হলেও এর অন্দরমহলে চলছে আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের বিশাল এক কর্মযজ্ঞ।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর তথ্যমতে; বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত বেটিং সাইট ‘লাইনবেট’-এ অবৈধ লেনদেনের ক্ষেত্রে সরাসরি ‘পেমেন্ট গেটওয়ে’ ও ‘মার্চেন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। প্রিন্টিং ব্যবসার লেবাস পরে মূলত এটি একটি ভয়ংকর ডিজিটাল হুন্ডি সিন্ডিকেটের ট্রানজাকশন পয়েন্ট, যা দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে।

সাধারণ মানুষের চোখে ‘ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’ একটি সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান হলেও নিবিড় তদন্ত বলছে, এর প্রতিটি ইঞ্চিতে লুকিয়ে আছে এক সুসংগঠিত সাইবার অপরাধ ও অর্থপাচারের নীল নকশা। অনেকটাই প্রশাসনের চোখ ফাকি দিয়ে সঙ্ঘবদ্ধ চক্র রমরমাভাবে চালিয়ে যাচ্ছে এই অবৈধ ব্যবসা।

অকাট্য প্রমাণ ও টেস্ট ডিপোজিট

সংগঠিত এই জুয়া সিন্ডিকেটকে হাতেনাতে ধরতে দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান চালানো হয়। প্রতিবেদক ছদ্মবেশে আন্তর্জাতিক বেটিং অ্যাপ ‘লাইনবেট’-এ প্রবেশ করে অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতেই ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’ নামটি। সেখানে পেমেন্টের জন্য একটি নির্দিষ্ট বিকাশ মার্চেন্ট নম্বর (০১৭৪৪-২৩৭১৮১) সরবরাহ করা হয়। তথ্যের শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করতে এই প্রতিবেদক পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ টাকা জমা দিলে দেখা যায়, সেই অর্থ সরাসরি মাসরুর মাসুমের নিয়ন্ত্রিত ‘ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’র অফিশিয়াল মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে।

এই অবৈধ লেনদেনের অকাট্য দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ট্রানজেকশন আইডি: DCQ8HJLX26 (তারিখ: ২৬ মার্চ ২০২৬) এখন প্রতিবেদকের হাতে, যা মাসুমের অপরাধ সাম্রাজ্যের অমোচনীয় এক ডিজিটাল পদচিহ্ন।

কল রেকর্ডে মালিকের ভোলবদল ও ‘সিম’ নাটক

অনুসন্ধানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও নাটকীয় মোড় আসে যখন প্রতিবেদক সরাসরি মাসরুর মাসুমের মুখোমুখি হন (টেলিফোনে)। মুঠোফোনে আলাপের শুরুতে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মার্জিত থাকলেও, জুয়ার পেমেন্ট গেটওয়েতে ‘ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’র সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং বিকাশ মার্চেন্ট নম্বরের অকাট্য প্রমাণের মুখে মাসুম মুহূর্তেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও দিশেহারা হয়ে পড়েন।

কল রেকর্ডে ধরা পড়া তথ্যানুযায়ী, নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি একেকবার একেক অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার এক চরম ব্যর্থ ও মরিয়া চেষ্টা চালান। প্রথমে সুকৌশলে অস্বীকার করলেও একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, বিতর্কিত বিকাশ মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টটি তার নিজস্ব জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই খোলা হয়েছে।

তবে সুপরিকল্পিতভাবে দায় এড়াতে তিনি নতুন গল্পের অবতারণা করে দাবি করেন, অ্যাকাউন্টের সিমটি নাকি তার ‘শামীম’ নামের এক বন্ধু রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে নিজের অসহায়ত্ব ঢাকতে তিনি দাবি করেন যে, তিনি ইতিমধ্যে সেই সিমটি ‘ভেঙে ফেলেছেন’।

অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো গুরুতর অপরাধ সংঘটনের পর ডিজিটাল প্রমাণ লোপাটের এটি একটি অতি প্রাচীন ও সস্তা অপকৌশল মাত্র, যা মূলত অপরাধীর অপরাধে সংশ্লিষ্টতাকেই আরও দৃঢ়ভাবে জনসমক্ষে প্রমাণ করে।

বিকাশ হেল্পলাইনের স্বীকৃতি

মাসরুর মাসুমের অপরাধের রাজত্ব কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং খোদ বিকাশ কর্তৃপক্ষের দালিলিক তথ্যের ভিত্তিতেই প্রমাণিত। বিকাশের অফিশিয়াল হেল্পলাইন ১৬২৪৭-এর সাথে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডে দেখা যায়, প্রতিবেদক কর্তৃক প্রেরিত ৩০০ টাকার ‘টেস্ট ডিপোজিট’ সম্পর্কে জানতে চাইলে কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে নিশ্চিত করেন যে, এই অর্থ সরাসরি ‘ওয়াফি প্রিন্ট মিডিয়া’র মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টেই জমা হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনের এই অনস্বীকার্য ও কারিগরি সত্যতা প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক জুয়ার সাইট ‘লাইনবেট’-এর পেমেন্ট গেটওয়ে হিসেবে মাসুম তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি ব্যবহার করছেন। এই কল রেকর্ডটি মাসুমের ‘অজ্ঞতা’ কিংবা ‘অন্যের ওপর দায় চাপানোর’ দাবিকে স্রেফ একটি সাজানো গল্প হিসেবে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে এবং তার অপরাধের অকাট্য ডিজিটাল পদচিহ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আইনি বাস্তবতা ও মাসুমের মিথ্যাচার

"আর্থিক লেনদেন ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাসরুর মাসুমের ‘আমি জানি না’ কিংবা ‘বন্ধুর সিম’—এই অসার যুক্তিগুলো মূলত তার অপরাধ আড়ালের এক নির্লজ্জ অপচেষ্টা মাত্র। বাস্তবতা হলো, একটি বিকাশ বা নগদ মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন সনদ এবং প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দাখিল করা বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানের মালিকের সশরীরে উপস্থিতি এবং বায়োমেট্রিকসহ কঠোর কেওয়াইসি যাচাইয়ের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করা ছাড়া এই ধরনের বাণিজ্যিক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় হওয়া অসম্ভব।

সুতরাং, এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, মাসরুর মাসুম সম্পূর্ণ সচেতনভাবে ও সুপরিকল্পিত উপায়ে তার প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আইনি নথিপত্র ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক জুয়ার অর্থ সংগ্রহের জন্য এই ‘ডিজিটাল ড্রেন’ বা অবৈধ লেনদেনের পথটি তৈরি করেছেন। তার এই কর্মকাণ্ড কেবল অপরাধমূলকই নয়, বরং দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর এক সুগভীর আঘাত।

ফেসবুক প্রোফাইল ও আদর্শিক মুখোশের ব্যবচ্ছেদ

মাসরুর মাসুমের ফেসবুক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করলে তার ‘দ্বৈত চরিত্রের’ এক চতুর ও সুপরিকল্পিত চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে ধর্মীয় ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক পরিচয়কে একটি অভেদ্য ‘সুরক্ষা কবচ’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রথিতযশা আলেম-ওলামাদের সাথে আলোকচিত্র এবং ছাত্রশিবিরের সাবেক কর্মী ও বর্তমান জামায়াত সমর্থক পরিচয়কে তিনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জনমনে এক কৃত্রিম আস্থার ক্ষেত্র তৈরি করেছেন। মূলত এই ‘পবিত্র ও আদর্শিক ইমেজের’ অন্তরালেই ঢাকা পড়ে আছে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার ও জুয়া সিন্ডিকেটের এক ভয়ংকর নীল নকশা।

মুখে ধর্মীয় অনুশাসন ও আদর্শের বুলি আওড়ালেও নেপথ্যে তিনি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে দেশের মূল্যবান অর্থ বিদেশে পাচার করে জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড দুর্বল করছেন। তার এই কর্মকাণ্ড কেবল আর্থিক অপরাধই নয়, বরং ধর্মীয় ও আদর্শিক বিশ্বাসের ওপর এক চরম প্রতারণা।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও আইনি ব্যবস্থার দাবি

সিলেটের আম্বরখানার মতো অতিব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রিন্টিং ব্যবসার অন্তরালে এমন সুসংগঠিত দেশবিরোধী ও জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও তা এখন পর্যন্ত প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকা রীতিমতো বিস্ময়কর। আমাদের কাছে মাসরুর মাসুমের নিজের কণ্ঠে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক অডিও রেকর্ড, লাইনবেটের অকাট্য স্ক্রিনশট এবং অপরাধের ভিডিওচিত্র সংরক্ষিত রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড ধ্বংসকারী এই মাফিয়া চক্রের মূল হোতা মাসরুর মাসুম ও তার সহযোগীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থা এবং পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এব্যাপারে অজানা থাকায় অপরাধীরা ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে, তারা এই প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের দেশের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। এভাবে কোটি কোটি টাকা পাচার হওয়ায় দেশের আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, অনলাইন জুয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিকাশ, নগদ এবং রকেট সহ বিভিন্ন ব্যাংক এর কর্মকর্তারাও এই ভয়াবহ জুয়ার সহায়তাকারি। তবে আমাদের গোয়েন্দা ইউনিট গুলো এই বিষয়ে কাজ করছে। এই ব্যাপারে মিডিয়ায় আরো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হলে আমাদের জন্য অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সহজ হবে।

[বি.দ্র: দ্যা ফিন্যান্স টুডে এবং দৈনিক বর্তমান দিন যৌথভাবে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরী করেছে। এই দুটি নিউজ পোর্টাল আরএনটিসি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।]


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81