03/29/2026
এ এইচ এম ফারুক | Published: 2026-03-28 20:59:04
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল—সাজেকের মেঘাচ্ছন্ন পাহাড় থেকে সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশি পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভূখণ্ডটি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়; বরং এটি হতে পারে আগামীর বাংলাদেশের টিকে থাকা এবং সমৃদ্ধির প্রধানতম ‘অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড’। সমুদ্রের নীল জলরাশি থেকে পাহাড়ের মেঘের দেশ পর্যন্ত এই বিশাল অঞ্চলটি ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম অনন্য একটি রুট।
বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় দশভাগের একভাগ জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আগামীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এমন এক কৌশলগত উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে, যা সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই একটি মধ্যম ও উচ্চ-আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যেহেতু একটি উন্নত, আধুনিক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়ন করছেন, তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ‘সুপার পটেনশিয়াল’কে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করার এখনই মোক্ষম সময়। তবে এই অপার সম্ভাবনার পথটি নিষ্কণ্টক নয়; পাহাড় ও সমুদ্রের এই সম্পদ ভাণ্ডারকে ঘিরে দেশি-বিদেশি নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সেন্টমার্টিন থেকে সাজেক পর্যন্ত এই বিশাল অঞ্চলটি ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে পৃথিবীর অনন্য একটি রুট। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং তিন পার্বত্য জেলাকে (বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি) নিয়ে একটি পরিকল্পিত 'সমন্বিত পর্যটন হাব' গড়ে তোলা গেলে এটি বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে একটি প্রধান গন্তব্য হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৪ শতাংশের নিচে থাকলেও, পরিকল্পিতভাবে পাহাড়কে কেন্দ্র করে একটি ‘সমন্বিত পর্যটন হাব’ গড়ে তুললে এটি ১০-১২ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। এতে পর্যটন খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৪ শতাংশের নিচে। যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। তুলনামূলকভাবে মালদ্বীপে পর্যটনের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন আয়ের সিংহভাগ আসে অভ্যন্তরীণ পর্যটন থেকে।
সরকার যদি এই অঞ্চলে ‘স্পেশাল ট্যুরিজম জোন’ ঘোষণা করে এবং আন্তর্জাতিক মানের ইকো-রিসোর্ট স্থাপনে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করে, তবে কর্মসংস্থানের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে। পাহাড়ের ১৩টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রা বিশ্ব পর্যটকদের কাছে একটি বড় আকর্ষণ। অ্যাডভেঞ্চার ও ইকো-ট্যুরিজমকে থাইল্যান্ড বা বালির মতো পরিকল্পিতভাবে সাজানো গেলে এটি বিশ্বের শীর্ষ ১০টি পর্যটন গন্তব্যের একটি হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক সীমান্তের সাথে সংযুক্ত। ভারত ও মিয়ানমারের সাথে আমাদের এই দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত এলাকাটি দক্ষিণ এশিয়ার কানেক্টিভিটির প্রধান প্রবেশদ্বার হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা করা মানেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা। এই অঞ্চলটি স্থিতিশীল থাকলে ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর সাথে আমাদের বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা করা যেমন সহজ হবে, তেমনি আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। সাজেক থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত যে দীর্ঘ পর্যটন ও অর্থনৈতিক সংযোগ রুট, তার ভৌগোলিক কেন্দ্রে রয়েছে এই পার্বত্য জেলাগুলো।
বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্যের সাথে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূতাত্ত্বিক গঠন বা ‘Anticlinal Structure’ নির্দেশ করে যে, এখানে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের প্রবল সম্ভাবনা। History of Oil and Gas Exploration in Bangladesh, পেট্রোবাংলা পাবলিকেশনের তথ্যানুসারে ১৯০৮ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে হওয়া ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ এবং ১৯৫০-এর দশকে সীতাপাহাড় ও কাসালং এলাকায় গভীর খনন চালিয়ে গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছিল।
জ্বালানি নিরাপত্তা: ১৯৬০-এর দশকে আবিষ্কৃত খাগড়াছড়ির সেমুতাং গ্যাস ফিল্ড প্রমাণ করে যে, পাহাড়ের গভীরে জ্বালানির অফুরন্ত ভাণ্ডার রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে ড্রিলিং করলে এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের জ্বালানি সংকট চিরতরে মেটাতে পারে।
ভারী খনিজ ও ধাতু: আধুনিক গবেষণায় (২০২১) পাহাড়ের মাটিতে সিসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো অত্যন্ত মূল্যবান ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া চুনাপাথর ও হার্ডরকের বিশাল স্তূপ আমাদের সিমেন্ট ও অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পের জন্য বড় আশীর্বাদ।
প্রশ্ন হলো, কেন এই অঞ্চলে বারবার অস্থিরতা তৈরি করা হয়? কেন পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার অপচেষ্টা চলে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পাহাড়ের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের ছকে। যখনই এই খনিজ সম্পদ উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয় বা বড় কোনো বিনিয়োগের কথা ওঠে, তখনই পাহাড়ের একদল উগ্রবাদী গোষ্ঠী ‘সেনা প্রত্যাহার’ বা ‘স্বায়ত্ত শাসনের’ নামে গোলযোগ সৃষ্টি করে। এই উগ্রপন্থীদের নেপথ্যে থাকা বিদেশি শক্তিগুলো আসলে চায় না বাংলাদেশ তার নিজের সম্পদ ব্যবহার করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক। পাহাড়কে অশান্ত রেখে আমাদের জাতীয় উন্নয়নযাত্রা থমকে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ডে রূপান্তর করতে সরকার নিচের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করতে পারেন। যেমন- সার্কুলার হিল ট্র্যাকস রোড: তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে উন্নত ও নিরাপদ সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এটি কেবল পর্যটন নয়, বরং কৃষিপণ্য পরিবহনেও বিপ্লব ঘটাবে।
ক্যাবল কার: পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতির সৌন্দর্যের লেক-পাহাড়ের উপর একাধিক দীর্ঘ ক্যাবল কার নির্মাণ করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা যায়।
পাহাড়ী কৃষির আধুনিকায়ন: জুম চাষের পাশাপাশি পাহাড়ে কফি, কাজু বাদাম, ড্রাগন ফল এবং উচ্চমূল্যের মসলা চাষের জন্য ‘এগ্রো-ইকোনমিক জোন’ করা। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম পাহাড়ী কৃষি থেকে বিলিয়ন ডলার আয় করছে, যা আমাদের জন্যও সম্ভব।
ট্যুরিস্ট পারমিট ও ই-ভিসা সহজীকরণ: পর্যটনখানের উন্নতি সাধনেরপর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য পাহাড় ভ্রমণের অনুমতি প্রক্রিয়া (পারমিট) আরও সহজ ও ডিজিটাল করা।
স্থানীয়দের অংশগ্রহণ: পর্যটনের সুফল যেন স্থানীয় নৃ-গোষ্ঠী ও স্থানীয় বাঙালিরাও পায়, সেজন্য তাদের দক্ষ গাইড ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। এতে পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জনসমর্থন হারাবে এবং স্থায়িত্বশীল শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব: পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নয়, বরং এই বিশাল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য অপরিহার্য। সেনা উপস্থিতি পাহাড়ের স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি।
পাহাড়ের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে যখন পাহাড়ের ৫১ শতাংশ বাঙালি এবং বাকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মধ্যে একটি সমন্বিত নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে পারব। উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছালে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও দূরত্ব কমে আসবে। সাজেক থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত যে পর্যটন করিডোর গড়ে উঠবে, তা হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত অন্যতম ‘লাইফলাইন’।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অপার সম্ভাবনাকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকার নিচের ৫টি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে:
১. হিল ট্র্যাকস স্পেশাল ইকোনমিক জোন: তিন পার্বত্য জেলায় পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (যেমন- ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, কাজু বাদাম ও কফি রোস্টিং প্ল্যান্ট) স্থাপনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা।
২. ডিজিটাল ট্যুরিজম করিডোর ও ই-পারমিট: বিদেশি পর্যটকদের জন্য দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক অনুমতির বদলে একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপের মাধ্যমে 'ই-পারমিট' ও 'অন-অ্যারাইভাল সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স' নিশ্চিত করা।
৩. খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান টাস্কফোর্স: বাপেক্স ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে পাহাড়ে স্থগিত হয়ে থাকা গ্যাস ও তেলের ব্লকগুলোতে আধুনিক 'থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে' পুনরায় শুরু করা।
৪. কানেক্টিভিটি মাস্টারপ্ল্যান: তিন পার্বত্য জেলার সংযোগকারী 'সার্কুলার হিল রোড' প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সাজেক বা নীলগিরির মতো কেন্দ্রে পরিবেশবান্ধব 'ক্যাবল কার' প্রবর্তন করা।
৫. নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা কাউন্সিল: পাহাড়ের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনী ও স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিল গঠন করা, যা বিদেশি ষড়যন্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপতৎপরতা রুখতে কাজ করবে।
পরিশেষে বলবো-পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জন্য একটি ‘প্রাকৃতিক গিফট’। যদি সঠিক কৌশল এবং দৃঢ় জাতীয় নিরাপত্তা নীতির মাধ্যমে একে পরিচালনা করা যায়, তবে এই পাহাড়ী সম্পদই হবে আগামী কয়েক দশকের বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে যদি পাহাড়ের গ্যাস, খনিজ এবং পর্যটনকে একটি মহাপরিকল্পনার আওতায় আনা যায়, তবে বাংলাদেশ আর কারও দয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা এবং এর সম্পদ আহরণই হোক আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেখক একজন সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81