04/02/2026
কূটনৈতিক প্রতিবেদক | Published: 2026-04-02 03:07:07
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনা আরব বিশ্বের গত এক বছরের অর্জিত সমস্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে উল্টো পথে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই শঙ্কার কথা উঠে এসেছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাত্র পাঁচ সপ্তাহের এই সংঘাতের প্রভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে আগামী কয়েক বছরের কঠোর শ্রমের ফসল এবং বহু কষ্টার্জিত প্রবৃদ্ধি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউএনডিপির নতুন এই প্রাক্কলন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক অস্থিরতার ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩.৭ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত লোকসান হতে পারে। আর্থিক অংকে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১২০ থেকে ১৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক কারণ এই ক্ষতির পরিমাণ ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে অর্জিত মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়েও অনেক বেশি। ফলে এই অঞ্চলটি যে উন্নয়নের পথে হাঁটছিল, তা এখন গভীর এক খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
এই সংঘাতের অভিঘাত কেবল বড় বড় অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষকেও। ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কারণে বেকারত্বের হার ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো প্রায় ৩৬ লক্ষ মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারাবেন, যা গত এক বছরে সৃষ্টি হওয়া মোট চাকরির সংখ্যার চেয়েও বেশি। কর্মসংস্থানের এই অভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে তলানিতে নিয়ে ঠেকাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলবে।
আর্থিক সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে দারিদ্র্যের হারে। ইউএনডিপি আশঙ্কা করছে, এই সামরিক উত্তেজনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে। বিশেষ করে লেভান্ট অঞ্চলের দেশগুলোতে এই প্রভাব হবে সবচেয়ে বিধ্বংসী। এর আগে দারিদ্র্য বিমোচনে যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো নেওয়া হয়েছিল, সংঘাতের এই ঝাপটা সেগুলোকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দিচ্ছে। এতে করে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সংস্থাটির সহকারী মহাসচিব এবং আরব অঞ্চলের ব্যুরো ডিরেক্টর আবদুল্লাহ আল দারদারি বর্তমান পরিস্থিতিকে এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য ‘সতর্ক সংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি মনে করেন, এটি বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উচিত হবে এখন কেবল জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। উৎপাদন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
ইউএনডিপির এই বিশ্লেষণটি পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন কৃত্রিম পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সংঘাতের ভয়াবহতা ও সময়সীমাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামান্য বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে চরম মাত্রার জ্বালানি সংকট; সব ক্ষেত্রেই এই অঞ্চলের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থার সম্মুখীন হবে। বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো এবং লেভান্ট অঞ্চলের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সরাসরি তাদের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে।
আঞ্চলিক বিভাজন অনুযায়ী দেখা যায়, লেভান্ট অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যার অর্থ হলো কেবল এই এলাকাতেই প্রায় ৩৩ লক্ষ মানুষ হতদরিদ্র হয়ে পড়বে। এটি পুরো আরব অঞ্চলে দারিদ্র্য বৃদ্ধির হারের প্রায় ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রভাব তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহনীয় হলেও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটায় সেখানেও প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মানবিক উন্নয়নের প্রতিটি সূচকই নেতিবাচক দিকে মোড় নেবে।
সামগ্রিকভাবে এই সংকটের ফলে মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডআই)-এর মানে উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সামরিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের মানব উন্নয়ন অগ্রগতি প্রায় এক বছর পিছিয়ে যেতে পারে। এর অর্থ হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ুর মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে যে অর্জনগুলো গত কয়েক মাসে অর্জিত হয়েছিল, তা নিমেষেই হারিয়ে যাবে। এই দীর্ঘমেয়াদী আর্থ-সামাজিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অঞ্চলটিকে আগামীতে দীর্ঘ সময় ও বিশাল অংকের পুঁজিতে বিনিয়োগ করতে হতে পারে।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81