04/09/2026
কূটনৈতিক প্রতিবেদক | Published: 2026-04-09 04:03:16
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। টানা ৩৯ দিন অব্যাহত ছিল এই যুদ্ধ। এতে ইরানের পাল্টা আঘাতে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপসগারীয় অঞ্চলের মিত্ররা।
যুদ্ধের প্রভাবে ইরান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্বের জ্বালানির বাজারে দেখা দেয় চরম অস্থিরতা। ভীষণ চাপে পড়ে বেশ্বিক অর্থনীতি। বিপাকে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অবশেষে মঙ্গলবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু এই যুদ্ধে কে বিজয়ী আর কে পরাজিত? কেননা, যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- দুই পক্ষই নিজেদের ‘বিজয়’ দাবি করেছে। চলুন বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করা যাক।
প্রথমেই বলা যায়, এই যুদ্ধে ইরানের বিজয় হয়েছে কেননা, ইরান টিকে আছে। আর তাদের জন্য টিকে থাকা মানেই জিতে যাওয়া। ইরান শুধু টিকে আছে তাই নয়, বরং খুব ভালোভাবেই টিকে আছে। টানা ৩৯ দিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও তার অন্যতম সামরিকভাবে শক্তিশালী মিত্র দখলদার ইসরায়েল ইরানের ওপর অবিরাম হামলা চালিয়েছে। হত্যা করেছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বসহ বহু শীর্ষ নেতাকে। তারপরও টিকে আছে ইরান।
আরও যেসব মাপকাঠিতে বিচার করলে ইরানের বিজয় সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর এই ইসরায়েলে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটিতে সাধারণ মানুষ জানতে চাইছে, কেন এই যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবে ইসরায়েল রাজি হয়েছে? কেন এত ইসরায়েলিকে প্রাণ দিতে হলো? ইসরায়েল এই যুদ্ধ থেকে কী পেল?
ইসরায়েলের বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের জন্য একটি রাজনৈতিক বিপর্যয়। তার মতে, ইরান ইসরায়েলের জন্য হুমকি। অথচ যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের টেবিলেই ছিল না ইসরায়েল।
এক বিবৃতিতে ইয়ার লাপিদ বলেছেন, “আমাদের (ইসরায়েল) সমগ্র ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় আর কখনও ঘটেনি। ”
তিনি যুক্তি দিয়েছেন, “আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ইসরায়েল সেই আলোচনার অংশই ছিল না। ”
তিনি আরও যোগ করেন, “যদিও ‘সেনাবাহিনীকে যা করতে বলা হয়েছিল তার সবই তারা পালন করেছে’ এবং ‘জনগণ আশ্চর্যজনক সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে,’ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘রাজনৈতিকভাবে ও কৌশলগতভাবে’ ব্যর্থ হয়েছেন এবং তিনি নিজে যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন তার একটিও পূরণ করতে পারেননি। ”
লাপিদ সতর্ক করে বলেন, “অহংকার, অবহেলা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবের কারণে নেতানিয়াহু যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি করেছেন, তা পূরণ করতে আমাদের বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে। ”
এত আঘাতের পরও যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইরানের রাজধানী তেহরানসহ প্রতিটা রাস্তায় মানুষ নেমে এসেছে আনন্দ মিছিল করতে। জাতীয় পতাকা উড়িয়ে এবং স্লোগান দিয়ে এই মুহূর্তটিকে একটি ‘বড় বিজয়’ হিসেবে উদযাপন করছে।
শুধু তা-ই নয়, মানুষ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় মিছিল করে এবং আতশবাজি ফুটিয়ে আলোকিত করে গোটা ইরানের আকাশ। এটিকে তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের টিকে থাকা ও ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করছে।
মার্কিন কংগ্রেস এবং সিনেটের সদস্যরাও ট্রাম্পকে দোষারোপ করছেন ইরান যুদ্ধের জন্য। তাদের কেউ কেউ ট্রাম্পের অপসারণ দাবি করছেন।
যুদ্ধের প্রথম দিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, ইরানের সরকার উৎখাত করাই এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য। অথচ টানা ৩৯ দিন বোমা বর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও ইরানে সরকার পতন সম্ভব হয়নি। এক খামেনিকে হত্যা করেছে, দায়িত্ব এসেছেন আরেক খামেনি।
আমেরিকা ও ইসরায়েল চেয়েছিল হামলার ইরানিরা রাস্তায় নেমে সরকারের পতন ঘটাবে। হয়েছে বরং উল্টো। সেখানকার জনগণ এখন ঐকবদ্ধ। যুদ্ধের আগে জনগণের একটা অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উসকানিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নেমেছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি ভয়াবহ হামলার মধ্যেও দেশের পক্ষে রাস্তায় নামছে লাখ লাখ মানুষ।
ট্রাম্প যখন সেতু উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখনও ইরানি জনগণ পতাকা ও মার্কিন বিরোধী বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে সেতুর উপর অবস্থান নিয়েছে।
সরকারের পতন ঘটাতে না পেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলেছিল, সরকার পতন না, আমরা ওদের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে চাই। কিন্তু সেটিও ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। হয়তো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আগের মতোই আছে।
যখন কোনও কিছুতে পেরে উঠতে পারলেন না, তখন ট্রাম্প হুমকি দিলেন- শর্ত না মানলে ইরানকে প্রস্তর যুগে নিয়ে যাওয়া হবে। ওদের সভ্যতাই ধ্বংস করে দেওয়া হবে। যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি হুমকি দিয়ে বললেন, “আজ রাতে ইরানের পুরো সভ্যতার মৃত্যু ঘটবে। ”
কিন্তু এতে সফল হতে পারলেন না। বরং হলো উল্টো। ইরান আরও শক্তিশালী হয়েছে। তারা যুদ্ধবিরতিতে নিজেদের ১০ দফা শর্তেই ট্রাম্পকে রাজি হতে বাধ্য করেছে। আল্টিমেটামে বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা দিয়ে বলেছেন- ইরানের প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য। দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ১০ দফা পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো হলো-
হরমুজ প্রণালিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ
ইরান তার সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত যাতায়াতের’ প্রস্তাব দিয়েছে। এটি কার্যকর হলে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে ইরানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হবে। এছাড়া তারা একটি ‘নিরাপদ ট্রানজিট প্রটোকল’ তৈরির দাবি করেছে, যা এই প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য নিশ্চিত করবে। এখানে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে টোল নেবে ইরান।
মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার
পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধকালীন ঘাঁটি এবং সেনা মোতায়েন কেন্দ্র থেকে মার্কিন সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
মিত্রশক্তির নিরাপত্তা
ইরান স্পষ্ট করেছে যে, তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। এটি মূলত হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথিদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ মুক্তি
ইরানের বিরুদ্ধে থাকা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সব নিষেধাজ্ঞা বাতিল এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদের সব নেতিবাচক প্রস্তাব প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব সম্পদ ও সম্পত্তি অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি
বিগত বছরগুলোতে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ‘পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ’ দাবি করা হয়েছে তেহরানের পক্ষ থেকে।
আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা
ইরান দাবি করেছে যে ইসলামাবাদে সমঝোতা হওয়া প্রতিটি বিষয়কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি ‘বাধ্যতামূলক রেজোল্যুশন’ হিসেবে পাস করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনও পক্ষ এর থেকে সরে যেতে না পারে।
এসব বিষয় থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইরান আগের চেয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে। আগের চেয়ে আরও বেশি অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে এগিয়ে যাবে। কারণ ইরানে আর কোন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।
এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পতন শুরু হয়ে যাবে। এই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি আধিপত্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই যুদ্ধে উপসাগরীয় আরব শেখদেরও পরাজয় হয়েছে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে নিরাপত্তার জন্য তারা নিজেদের মাটিতে মার্কিন সেনাঘাঁটির অনুমতি দিয়েছিল, ইরান সেগুলো তছনছ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আরবদের নিরাপত্তা দেওয়া তো দূরের কথা, নিজেদের ঘাঁটি ও সেনাদেরই রক্ষা করতে পারেনি। এমনকি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সেভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করতে পারেনি। সুতরাং মার্কিন এই নিরাপত্তা এখন আর আরবদের রক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে অনেক শক্তিশালী হলেও কৌশলগত দিক থেকে তারা ইরানের থেকে পিছিয়ে। যুদ্ধ কখনওই শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে জেতা যায় না। ভিয়েতনাম তার অকাট্য প্রমাণ। শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে জেতা গেলে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধেও আমেরিকা জিতে যেতো। কিন্তু শোচণীয় পরাজয় হয়েছিল আমেরিকার, যা বিশ্বে ইতিহাস হয়ে আছে।
অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, সাময়িক এই যুদ্ধবিরতি শেষ হলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র আবারও হামলা চালাবে। কিন্তু সেটির সম্ভাবনা খুবই কম। এক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। কেননা, এই প্রণালী দিয়ে বিশ্ব জ্বালানির এক পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
এই ব্যাপারে মার্কিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জন মার্সেইমারের একটি বিশ্লেষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বিষয়টি নিয়ে যা বলেছেন, তা অনেকটা এরকম- যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ইরানে হামলা চালায়, তাহলে আমেরিকা এখন তো তবুও মুখ দেখাতে পারছে। এরপর তারা আর মুখই দেখাতে পারবে না। কারণ আমেরিকার হাতে এমন কোনও ম্যাজিক নেই যে, দুই সপ্তাহ পর তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ইরানকে আঘাত করতে পারবে।
তার মতে, হরমুজ প্রণালী শক্তি প্রয়োগ করে খোলার সাধ্য পৃথিবীর কোনও সামরিক শক্তির নেই। এটাই বাস্তবতা। কেননা, এই প্রণালীতে চলাচলকারী একটি জাহাজেও যদি আঘাত করা হয়, বাকি জাহাজগুলো আর ওই দিক দিয়ে যেতে চাইবে না। কারণ ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো তাতে রাজি হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে পরিস্থিতি আবারও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81