02/23/2025
শাহীন আবদুল বারী | Published: 2024-11-02 13:10:25
ছাগলকান্ডে ওএসডি রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের বান্ধবী আরজিনা খাতুন এবার দুদকের জালে আটকা পড়েছেন। মতিউরের সঙ্গে সম্পর্ক করেই অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তা বান্ধবী আরজিনা খাতুন। বন্ধুর সহায়তায় তিনি বানিয়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। করছেন আলিশান জীবন-যাপন। চলাফেরা করেন বিলাল বহুল দামি গাড়িতে। রাজধানীতে ফ্ল্যাট, গ্রামে আলিশান বাড়ি, পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে জমি, বাসায় বিলাসবহুল ইন্টেরিয়র এবং দামি সব আসবাবপত্র রয়েছে আরজিনা খাতুনের। তিনি মতিউরের ক্ষমতা বলে প্রতিষ্ঠানে কায়েম করেছেন একতছত্র আধিপত্য বিস্তার। টাকার লোভে নিজের স্বামীকে বাসায় রেখে রাতের অন্ধকারে আড্ডা দিতেন মতিউরের সাথে। অনেক সময় আরজিনার স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন রেস্টুরেন্টে খাবার জন্য গিয়ে ছিলাম। অথচ একমাত্র স্বামীর টাকায় আরজিনা পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি নেন। সময়ের ব্যবধানে স্বামীর সব অবদান অস্বীকার করেন এবং ভুলে যান সব কিছুই।
মতিউরের সান্নিধ্যে থেকে মাত্র তিন বছরে আরজিনা ৫০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের মালিক হয়ে যান। যার ২০০ ভরিই চোরাচালানের মাধ্যমে আনা, দুদকের কাছে এসেছে এসব অভিযোগ। মতিউরের সঙ্গে আরজিনার কিছু ফোনালাপও ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে লেখালেখি হয়। তাতে আরজিনা বিচলিত না হয়ে নিজেকে সৎ, মেধাবী ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে সর্বত্র জাহের করেন। মিডিয়ায় তাকে নিয়ে নিউজ প্রকাশিত হলে তার শক্ত প্রতিবাদ লিখে পাঠাতেন।
আরজিনা বর্তমানে রাজস্ব বোর্ডের মূসক মনিটরিং, পরিসংখ্যান ও সমন্বয়ের দ্বিতীয় সচিব। এর আগে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের উপকমিশনার ছিলেন। ১০ জুন তার দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের খতিয়ান তুলে ধরে দুদকে অভিযোগ জমা দেন এক ব্যক্তি। তাতে বলা হয়, মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য আমদানি, মানি লন্ডারিং, স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুদকের ওই অভিযোগ মিথ্যা বলে সাফাই গেয়ে বেড়াতেন। তবে আদালত আরজিনার বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছেন বলে জানাগেছে।
দুদকে জমা দেয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, মিরপুরের সেকশন-১৫, ব্লক-ডি, ওয়ার্ড-৪ থানা কাফরুল, বিজয় রাকিন সিটিতে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। যার মূল্য সঠিক এর চেয়ে কম ধরা হয়েছে। ৬০ লাখ টাকা খরচ করে রাজবাড়িতে পিতা আহমেদ আলীর জমির উপরে একটি অত্যাধুনিক দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। চার কোটি টাকা খরচ করে ভাই ও বাবার নামে গ্রামের আশেপাশে ত্রিশ বিঘা জমি কিনেছেন। মিরপুরের শাহআলীতে বিথিকা হাউস নং-১১৪/১) (টাওয়ার নাম্বার-৪) ( কলোনি-২) এক কোটি দশ লাখ টাকা খরচ করে ফ্ল্যাট কিনেছেন। ক্ষেতলাল থানাধীন সাবেক স্বামীর নামে ৮০ লাখ টাকা খরচ করে জমি কিনে একতলা বাড়ি ক্রয় করেছেন। আরজিনার সাবেক স্বামী আবু হেনা মো. রউফ উল আযমের লিখত ওই অভিযোগে আরো জানা যায়, আরজিনার সঙ্গে তার বিয়ের সময় দুই ভরি স্বর্ণ উপহার দিলেও আয়কর নথিতে এক ভরি দেখানো হয়েছে। আরজিনা চট্টগ্রাম কাস্টমসে থাকা অবস্থায় প্রতিমাসে ২৫/৩০ কোটি টাকা অবৈধ আয় করতেন। এভাবে সে চট্টগ্রামে চাকরি জীবনে একশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আরজিনা তার অবৈধ টাকা দিয়ে স্বর্ণ কিনে বাবার বাড়িতে মাটির নিচে পূতে রেখেছেন বলে অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আরজিনাকে মতিউর রহমান তদবির করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব হিসেবে বদলি করান বলে ডিভিশনে গুঞ্জন আছে। আরজিনার সঙ্গে মতিউরের দীর্ঘদিন প্রেম চলে। তারা ছুটির দিন হলে ঢাকার বিভিন্ন ফ্ল্যাটে গিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতেন। স্বামী আবু হেনা জানতে পারায় তাকে ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তালাক দিয়ে গোপনে মতিউর রহমানকে বিয়ে করেন। বিয়ে করার পর মতিউরকে আরজিনা ৬০ কোটি টাকা দেন। এসব টাকা দু'জন মিলে বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন। পরে আরজিনার সাবেক স্বামী জানতে পারেন মতিউর দুবাই ও মালয়েশিয়ায় দুই টি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন আরজিনার নামে। যার মূল্য ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। স্বামী আবু হেনা আরজিনাকে চরিত্রহীন নারী হিসেবে মন্তব্য করেন। আরজিনা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদেরকে অতি কৌশলে ম্যানেজ করে ভালো ভালো জায়গায় পোস্টিং নিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে আরজিনা মিথ্যা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নন এফ আই আর আদালতে দাখিল করে আবু হেনাকে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেন। দুদকের লিখিত অভিযোগ থেকে আরো জানা যায়, আবু হেনা মো. রউফ উল আযমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার এইচ রয়েল রানার এমএলএম ব্যবসায় ৫০ কোটি টাকা দেন আরজিনা খাতুন। পরবর্তীতে আবু হেনাকে না জানিয়ে আরো টাকা দেন রয়েল রানাকে। সব মিলিয়ে একশত কোটি টাকা রয়েল রানার এমএলএম ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন আরজিনা। এছাড়াও রয়েল রানার এমএলএম ব্যবসায় আবু হেনার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা ধার নেয়া টাকাও দিতে বাধা প্রদান করে আরজিনা। আনোয়ার এইচ রয়েল রানার এমএলএম ব্যবসায় বিনিয়োগ ছাড়াও মতিউর ও আরজিনা তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ জানাগেছে। রয়েল রানার সাথে আরজিনার কোন অসামাজিক কার্যকলাপ ছিলো কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রয়েল রানা পতিত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের শেল্টারে এমএলএম ব্যবসা করেন। তার কিছু বিজ্ঞাপন ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার হাতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ওই বিজ্ঞাপনে আওয়ামী পন্থী একজন সাংবাদিককে দেখা গেছে। শোনা যাচ্ছে এখন তিনি সুবিধা নিতে জামায়াতের পরিচয় বহন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। রয়েল রানা কিভাবে এমএলএম ব্যবসা করে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে দুদক সূত্রে জানাগেছে।
আরো জানাগেছে, আরজিনার ব্যবহৃত বেশিরভাগ গহনাই অনেক দামি। তার অন্তত ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের হীরার গহনা রয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তিনি অন্তত ৫০০ ভরি স্বর্ণ আর ডায়মন্ডের অলংকার নগদ টাকায় কিনেছেন। যার ২০০ ভরি এক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ৩ ধাপে চোরাচালানের মাধ্যমে আনার তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ দুদকে করা অভিযোগের সঙ্গে জমা দেয়া হয়েছে।
২০২২ থেকে শেয়ার ব্যবসাও করেছেন তিনি। এক দিনে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগে দ্বিগুণ লাভের নজিরও আছে তার। তার তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল নগদ টাকা ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগও আছে। বিষয় গুলো পাঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করছে দুদকের অনুসন্ধান টিম।
অভিযোগ আছে, মতিউরের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে জড়ানোর পর থেকে দ্রুতই বাড়তে থাকে আরজিনার সম্পত্তির পরিমাণ। মতিউরের সঙ্গে একই ব্রোকারেজ হাউজে শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ ছিলো আরজিনার। অভিযোগ রয়েছে, কারসাজি করে মতিউরই আরজিনাকে শেয়ার বাজারে মুনাফা তুলে দেন। যখন ছাগল কান্ডের ঘটনা নিয়ে মতিউর আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে ঠিক ওই সময়ে মতিউর-আরজিনার মোবাইল ফোনালাপের অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়। তাতে তাদের মধ্যকার স্পর্শকাতর অশ্লীল কথাবার্তার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব আরজিনার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (মূসক মনিটরিং, পরিসংখ্যান ও সমন্বয়) বিভাগের দ্বিতীয় সচিব আরজিনা খাতুনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক ইব্রাহিম মিয়া দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। দুদকের কোর্ট ইন্সপেক্টর আমির হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।
এদিন দুদকের সহকারী পরিচালক (মানি লন্ডারিং) এসএম মামুনুর রশীদ তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন। এ সময় দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, আরজিনার বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণ, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিজ নামে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগটি অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। জানা যায়, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশে পলায়ন করতে পারেন। তাই সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তার বিদেশ গমন রহিত করা আবশ্যক।
এদিকে আরজিনা খাতুন দুদকের অনুসন্ধান টিমকে ম্যানেজ করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা অপবাদ বলেও বিভিন্ন মহলে দাবি করে আসছেন। দুদকের আইনিপদক্ষেপ ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অভিযোগের বিষয়ে আরজিনা খাতুন এর অফিসের ফোন নাম্বারে একাধিক বার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81