02/23/2025
মোঃ মতিউর রহমান | Published: 2024-11-21 11:29:35
ব্যাংক ঋণ ও পুন:তফসিল করনে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পতিত সরকারের দোসরদের অবৈধ সুবিধা দিয়ে ব্যাংক খাতকে দেউলিয়ায় পরিণত করেছেন সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান।
তিনি এমপি হয়েও মন্ত্রী হবার খায়েশে দু’হাতে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। সেসব টাকার ভাগ দিয়েছেন গণভবনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব তহবিলে। বিদেশেও পাচার করেছেন শত কোটি টাকা। নিজস্ব ক্ষমতা বলে নিয়ম নীতির বাইরে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই চার শতাধিক জনবল নিয়োগ দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। নিয়োগকৃত অধিকাংশই তার নিজ এলাকা “উত্তরবঙ্গের”। প্রতিজন লোক নিয়োগের জন্য পদ অনুযায়ী ৮ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আছে দুর্নীতি পরায়ণ এই ব্যাংকারের বিরুদ্ধে। তাছাড়া সোনালী ব্যাংক ইউকে শাখার দুর্নীতির বিচার না হয়ে বিপরীতে পেয়েছেন পদোন্নতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে ৪ কোটি টাকার অধিক খরচ করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। অন্তবর্তী সরকার আমলেও অধরা রয়েছেন শেখ হাসিনা পরিবারের আশীর্বাদপুষ্ট এই দুর্নীতিবাজ ব্যাংকারের সহযোগী এবং ঋণখেলাপী ব্যবসায়ীরা। করোনা মহামারীর সময়ে ব্যবসায়ীদের প্রনোদনা সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগটিও অনেক গুরুতর। এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে ঋণ নেয়ার মাধ্যমে ১৮৪ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদ উদ্দিন (অবসরপ্রাপ্ত) সহ অন্যায় কর্ম করার অপরাধে তার বিরুদ্ধে ২০২২ সালে দুদক চার্জশিট দিলেও মামলাটি ধামাচাপা পড়ে আছে। ফরিদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরাসরি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দরবার মহলে যোগাযোগ রাখতেন। সে কারণে সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল ও দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমানের সাথে তার নিবির সখ্যতা ছিলো। গণভবন থেকে তদবিরের মাধ্যমেই দুদকের মামলাটি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন দুর্নীতিবাজ এই ব্যাংকার। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যার দ্বারা সবচেয়ে বেশী অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে তিনি হলেন আতাউর রহমান প্রধান। এই ব্যাংকার পতিত সরকারের সবচেয়ে বেশী সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তিনি কথায় কথায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শশুরবাড়ি এলাকার লোক বলে পরিচয় দিতেন। ৩৭ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে সর্বশেষ রাষ্ট্রায়ত্ব সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আসনে বসে তিনি ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে বেশী কলুষিত করেছেন এবং আর্থিক খাতকে করেছেন পর্যদুস্ত। তার আমলে সোনালী ব্যাংক মূলত: দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। ব্যবসায়ীদের কাছে তিনি ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট। সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক লি: এ ৩+৩=৬ বছর মেয়াদে পতিত আওয়ামী ব্যবসায়ীদের ব্যাংকি খাতকে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিনত করেছিলেন আতাউর রহমান প্রধান। সোনালী ও রূপালী ব্যাংকে খেলাপী ঋনের সিংহভাগই দুর্নীতিবাজ এই ব্যাংকারের সময়ে সংগঠিত হয়েছে। মূলত: আওয়ামী ব্যাংক লুটেরাদের পুনর্বাসিত করতেই এই দুর্নীতিবাজ ব্যাংকারকে বার বার প্রমোশন দেওয়া হয়েছে।
২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আতাউর রহমান প্রধান। তার সময়ে অনিয়ম, দুর্নীতি আর পরিচালনা ব্যর্থতার জন্য বন্ধ হয়ে যায় ব্যাংকটি। ঐ সময় একের পর এক দুর্ঘটনা ও আর্থিক অপরাধ সংগঠিত হয় ব্যাংকটিতে।
বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২রা জুন ব্যাংকটির ওল্ডহাম শাখা থেকে কোড জালিয়াতির মাধ্যমে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শাখাটি বন্ধ করে দেয় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। ২০১০ সালের ২০ আগস্ট থেকে ২০১৪ সালের ২১ জুলাই সময়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডকে ৩২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করে যুক্তরাজ্যের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল কাউন্ট অথরিটি (এফসিএ)। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়াও শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে অবহেলা, সুপারভিশন ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য কারনে যুক্তরাজ্যের এফসিএ কর্তৃক ৭৬ হাজার ৪০০ পাউন্ড জরিমানার মুখে পড়ার বিষয়টি অনেক বিলম্বে প্রকাশ করা হয়।
এতো ঘটনা ঘটলেও পতিত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট দুর্নীতিপরায়ণ ব্যাংকার আতাউর রহমান প্রধানকে পদোন্নতি দিয়ে ২০১৬ সালের আগষ্টে রূপালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুসারে, কোন আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক ব্যাংক কর্মকর্তা শাস্তিপ্রাপ্ত হলে তিনি কোনও ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা হতে পারবেন না। এই বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে এবং কোন কর্তৃপক্ষের সুপারিশে আতাউর রহমান প্রধানকে রূপালী ও সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা করা হলো তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক অথবা ব্যাংকিংখাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করে এসব দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবী উঠেছে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কমিশনের কাছে।
রূপালী ব্যাংকে দুর্নীতির চিত্র ও অবৈধ নিয়োগ: ২০১৬ সালের দুর্নীতিবাজ আতাউর রহমান প্রধান রূপালী ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেই নেমে পড়েন দুর্নীতির মহাযাত্রায়। ২০১৬-২০১৯ মেয়াদে রূপালী ব্যাংকটি হয়ে উঠে উত্তরবঙ্গের দালালী প্রতিষ্ঠান। ২০১৬-২০১৯, এই তিন বছর ব্যাংকিং নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয় যার অধিকাংশই উত্তরবঙ্গের। কারণ একটাই, আতাউর রহমান প্রধানের বাড়ী লালমনিরহাট জেলায়।
আতাউর রহমানের রূপালী ব্যাংকে কর্মকালীন সময়ে বিনা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পিয়ন, ক্যাশিয়ার, ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে জুনিয়র অফিসার পদে প্রায় ৪০০ ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। উক্ত নিয়োগের প্রতিটিতে পদ অনুসারে ৮ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন আতাউর রহমান।
রূপালী ব্যাংকে উক্ত নিয়োগে কোন ব্যাংকিং নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা তিনি করেননি। শুধু তাই নয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও উত্তরবঙ্গের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
আতাউর রহমান প্রধান ২০১৬ সালে রুপালী ব্যাংকের যোগদানের সময় ব্যাংকের ঋণ ছিলো ১৫ হাজার ৪শত ২১ কোটি টাকা। আর খেলাপির পরিমাণ ছিলো ২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। আতাউর রহমানের মেয়াদকালে ২০১৯ সালের জুনে এই ঋণ দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এসময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয় ৪ হাজার ৩১১ কোটি টাকা।
রূপালী ব্যাংকে কর্মকালীন সময়ে আতাউর রহমানের দুর্নীতি ছিলো ভয়াবহ। তার নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের প্রতিটি কর্মকর্তা এখন বিভিন্ন ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছে। সোনালী, জনতা, কৃষি সহ বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ পদে রয়েছে আতাউর সিন্ডিকেটের সদস্যরা। তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি চোখে পড়ার মত।
সোনালী ব্যাংকে কর্মকাল ও উত্তরবঙ্গ সিন্ডিকেটঃ ২০১৯-২০২২ সাল মেয়াদে সোনালী ব্যাংকে দুর্নীতির যে ভয়াবহতা সৃষ্টি হয়েছিল তার নেপথ্য নায়ক আতাউর রহমান প্রধান। করোনা মহামারিকালীন সময়ে আতাউর রহমান প্রধান ব্যাংকিং খাতে করোনা প্রনোদনার নামে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। আতাউর রহমান প্রধান সোনালী ব্যাংকেও উত্তরবঙ্গের যে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তার প্রধান কারণ ছিল নিজের মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ। তিনি বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আওয়ামী লীগের অর্থ পরিচালনা উপ-কমিটির সদস্য ছিলো। তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা পাটগ্রাম) আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। প্রার্থী বাছাইপর্বে প্রথমে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয় পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে মনোনয়নপত্র ফিরে পান। উল্লেখ্য যে, দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে উচ্চাবিলাসী দুর্নীতিবাজ এই ব্যাংকার তার অবৈধ উপার্জিত অর্থের গরমে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে পরাজিত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে ৪ কোটি টাকা খরচঃ আতাউর রহমান প্রধান সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট নির্বাচনে ৪ কোটি টাকা খরচ করে এবং সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্বাচনের কাজে ব্যবহার করে। ঐ সময়ে তাকে নির্বাচিত করার জন্য গণভবন থেকেও চাপ সৃষ্টি করা হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন তার দুর্নীতির তদন্ত শুরু করলেও তার অর্থ ও দাপটের নিকট তা থেমে আছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও অর্থ পাচার, ঋণপূর্ণ তফসিল করনে কমিশন আদায়ের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
উত্তরবঙ্গ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্য, সিএসআর বিজ্ঞাপন থেকে নামে বেনামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় দুর্নীতির নব্য এই বরপুত্র আতাউর রহমান ও তার সিন্ডিকেট। অনেক কর্মকর্তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি ও ভালো পোস্টিং থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের আত্মীয়-স্বজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও বদলি করেছেন আতাউর রহমান।
স্বজনপ্রীতির সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত তার এক ভাগ্নে জামাই এবাব হোসেন। তাকে কোন রকম নিয়মণীতির তোয়াক্কা না করেই সোনালী এক্সচেঞ্জ কোং ইনকঃ, যুক্তরাষ্ট্র শাখায় পোস্টিং দেয়া হয়। আরেক ভাগ্নে জামাই মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে সৌদি আরবের জেদ্দা শাখায়।
ব্যাংকিং খাতে দুবৃত্তায়ন ও সহযোগীদের অন্যতম কারিগর আতাউর রহমান পতিত সরকারের ব্যাংক লুটেরা চক্রের অন্যতম সহযোগী। তিনি বর্তমানে দেশে আছেন নাকি বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন আইন শৃংখলা বাহিনী তার কোন সন্ধান পাচ্ছেনা।
আপাদমস্তক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এই ব্যাংকারের হাত ধরেই মূলত: দেশের সর্ববৃহৎ সোনালী ও রুপালী ব্যাংকে ধ্বস নেমেছে। পূণঃ তফসিলের নামে আওয়ামী ব্যবসায়ীদের পূর্ণবাসন ও ব্যাংক থেকে টাকা লুটের এই কারিগর এখনো ধরাছোঁয়ার বাহীরে।
সোনালী, জনতা, রুপালী, অগ্রণী, বেসিক ব্যাংক সহ সরকারী বেসরকারী ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানী সহ বীমা খাতের লুটেরাদের আইনের আওতায় আনা খুবই জরুরী বলে মনে করেন বিশ্লেষকগণ। শেখ পরিবারের আশীর্বাদপূষ্ট ছিলেন প্রতিটি ব্যাংকের এমডি, চেয়ারম্যান। অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী। এরাই মূলত পতিত সরকারের দোসর। এই দোসরদের হাতে মোটেই নিরাপদ নয় বাংলাদেশের আর্থিক খাত।
এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে ১৮৪ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২২ সালে সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে পেয়েছিলেন। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটির অনুসন্ধানী টিমকে ম্যানেজ করার অভিযোগ উঠেছে। যে কারণেই মামলার অগ্রগতি থেমে গেছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একে অন্যের সহযোগিতায় প্রতারণা ও অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১১৭ শতাংশ জমি বন্ধকী দলিলের মাধ্যমে রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান কার্যালয় থেকে মেয়াদী প্রকল্প ঋণের বিপরীতে ৯৪ কোটি ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৮৮৭ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে বন্ধকী জমির বিপরীতে প্রথম দফায় ৭৬ কোটি ও পরে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন এবং এই ঋণের ওপর ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরোপিত সুদ ৯০ কোটি ৬৩ লাখ টাকাসহ মোট ১৮৪ কোটি ৭৮ লাখ ৯৫ হাজার ৮৮৭ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত আসামিরা হলেন-রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদ উদ্দিন, সাবেক উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (বর্তমানে-অবসরপ্রাপ্ত) মো. নেয়ামত উল্লাহ, রূপালী সদন কর্পোরেট শাখার প্রধান (অবসরপ্রাপ্ত) মো. সিরাজ উদ্দিন, একই শাখার প্রাক্তন প্রিন্সিপাল অফিসার (বর্তমানে- উপমহাব্যবস্থাপক) মো. কামাল উদ্দিন, ডিজিএম (চলতি দায়িত্ব) সৈয়দ আবুল মনসুর (অবসারপ্রাপ্ত) ও রূপালী ব্যাংকের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল অফিসার ও বর্তমানে সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু নাছের মো. রিয়াজুল হক।
ছয় ব্যাংক কর্মকর্তা ছাড়াও এইচ আর স্পিনিং মিলস (প্রা:) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শাহিন রহমান, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. মাসুদুর রহমানকে অভিযোগপত্রে আসামি করে চার্জশিট অনুমোদন দেওয়া হয়।
দুদক জানায়, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সনের ২নং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় কমিশন কর্তৃক চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন করেছে কমিশন। দুদকের অনুসন্ধান টিমের একজন কর্মকর্তা বলেন, রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম ফরিদ উদ্দিন ছিলেন বেশ ক্ষমতাধর। তিনি তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং কমিশনের কাছে মাঝে মধ্যেই আসতেন। তাছাড়া তদবির করে মামলাটি অনেকটাই থামিয়ে রেখেছেন। অপর একটি সূত্রমতে, এম ফরিদ উদ্দিন ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবারের ঘনিষ্ঠ। তাছাড়া সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সাথে ছিলো তার নিবির সখ্যতা। তাছাড়া অঘাধ টাকার মালিকও তিনি। প্রচুর টাকা খরচ করে মামলাটি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন।
সাবেক এই ব্যাংকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তিনি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে পতিত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ছিলেন। এম ফরিদ উদ্দিন এজন্য গণভবনে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তহবিলে মোটা দাগের টাকা অনুদান দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয় আন্দোলন বিরোধী কর্মকাণ্ডেও সরগরম থাকার অভিযোগ আছে রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি এম ফরিদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ।
ছাত্র জনতার অভ্যুর্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে একাধিক ব্যাংক দখল করে রীতিমতো অর্থ লুট করা হয়। এর বাইরে অন্য সরকারী বেসরকারী ব্যাংক থেকে নিয়মের বাইরে নামে বেনামে ঋনের নামে অর্থ বের করে নেয়া হয়। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক বরং এ কাজে সহায়তা করেছে। অনেক ক্ষেত্রে আড়াল করে রেখেছে বড় অংকের খেলাপি ঋন। এসব ঋনের বিপরীতে নেই পর্যাপ্ত জামানত। সরকার বদলের পর এখন ব্যাংক ঋনের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসছে। জানা যাচ্ছে প্রকৃত খেলাপি ঋনের পরিমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মালিকানা বদল হওয়া ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋন বেড়েছে দ্বিগুনের বেশি। আওয়ামীলীগের ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকো, এসআলম, বসুন্ধরা গ্রুপ সহ আরও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ঋনও খেলাপি হয়ে পড়েছে। ফলে বিগত জুলাই সেপ্টেম্বর সময়ে সব মিলিয়ে খেলাপি ঋন বেড়েছে তেয়াত্তর হাজার পাঁচশো ছিয়াশি কোটি টাকা (৭৩,৫৮৬ কোটি) এতে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋন বেড়ে হয়েছে দুই লাখ চুরাশি হাজার নয়শো সাতাত্তর কোটি টাকা (২,৮৪,৯৭৭ কোটি)। যা ব্যাংক খাতের মোট ঋনের ১৬.৯৬ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋনের পরিমান আরও বেশি। তাই খেলাপি ঋনের সংখ্যা আরও বাড়বে। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋনের তথ্য গোপন রাখতে ও কাগজে কলমে কমিয়ে দেখাতে নানা কৌশল অবলম্বন করত। ব্যাংকারদের অভিযোগ বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী ব্যাংকগুলোতে আওয়ামী দোসরদেরকে এমডি চেয়ারম্যান বানিয়ে অর্থ লোপাটের মহারাজ্য গড়ে তুলেছিল পতিত সরকার।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81