01/01/2026
বিশেষ প্রতিবেদক | Published: 2026-01-01 08:48:59
ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মে বিপর্যস্ত ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড
বোর্ডবিহীন পরিচালনা, প্রশাসনিক শূন্যতায় কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ
ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডে চলমান প্রশাসনিক অচলাবস্থা, বৈধ পরিচালনা পর্ষদের অনুপস্থিতি এবং সংঘবদ্ধ আর্থিক অনিয়ম এখন দেশের বীমা ও পুঁজিবাজার খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, অভ্যন্তরীণ নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে এটি প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তালিকাভুক্ত এই বীমা কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত কোনো বৈধ বোর্ড ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এই ঘটনা বীমা কোম্পানি আইন, বীমা আইন ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালার সরাসরি ও গুরুতর লঙ্ঘন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এই বীমা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও আত্মগোপনে রয়েছেন।
এর ফলে বিগত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডে কোনো নিয়মিত চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কিংবা বৈধ বোর্ড সভা নেই। অথচ একটি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে বোর্ড ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বীমা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন নেতৃত্বশূন্যতা কেবল অনিয়মের পথকেই প্রশস্ত করে না, বরং এটি শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ আত্মসাতের একটি সংগঠিত কাঠামো তৈরি করে।
দ্যা ফিন্যান্স টুডের গভীর অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য মতে, একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের সভা ব্যতীত কোন ব্যক্তি কীভাবে একজন মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পান? এছাড়া বীমা প্রতিষ্ঠাণের পরিচালনা পর্ষদের কোনো প্রকার রেজোলিউশন বা অনুমোদিত সিগনেটরি ছাড়াই একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কীভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকবিহীন অবস্থায় চেক স্বাক্ষর করে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দ্যা ফিন্যান্স টুডের চৌকস টীম জানতে পেরেছে, বিতর্কিত এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক, ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. মইনুল হাসান চৌধুরী এবং আন্ডাররাইটিং বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বোর্ড সভা ছাড়াই আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন। আর এসব কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ মদদ দিচ্ছেন এই বীমা কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্পন্সর ডিরেক্টর নূর মোহাম্মদ।
এদিকে, দ্যা ফিন্যান্স টুডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চৌকস টীমের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির বিতর্কিত এই ৪ উর্ধতন কর্মকর্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। উত্থাপিত অভিযোগের সূত্র ধরে নিবিড় অনুসন্ধানের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতা এবং প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে আগামী পর্বে বিস্তারিত প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হবে।
সূত্র মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই কোম্পানিটি প্রায় ৮ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করেছে। কিন্তু এর সিংহভাগ অর্থই প্রশাসনিক ব্যয়, কমিশন, ভাতা এবং বিভিন্ন খাতে খরচ দেখিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বিল ও অস্বাভাবিক কমিশন দেখিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত পকেট ভারী করছেন।
বীমা বিশ্লেষকদের মতে, বোর্ড অনুমোদন ছাড়া এই ধরনের আর্থিক লেনদেন কেবল অবৈধই নয়, এটি বীমা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণার শামিল।
অনিয়মের জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে বীমা প্রতিষ্ঠানটির উত্তরা ব্রাঞ্চের একটি ঘটনা। সেখানে এক ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে মাসিক ৬ লাখ টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য থেকে প্রতি মাসে অন্তত ২ লাখ টাকা ঐ সিন্ডিকেটের সদস্যদের পকেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া উত্তরা ব্রাঞ্চের মাধ্যমে সংঘটিত ‘প্রতীক সিরামিক’ ক্লেইম কেলেঙ্কারির তদন্ত বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চলমান, যা কোম্পানির ভেতরে দীর্ঘদিনের অনিয়মের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ) এসব অনিয়ম সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন সময় অসন্তোষ প্রকাশ করে চিঠিপত্র পাঠালেও কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা তা উপেক্ষা করে আসছেন।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, সম্প্রতি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জেরে এই বীমা কোম্পানিকে মাত্র ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়কে কার্যত বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এতে বীমা খাতের স্বচ্ছতাপ্রত্যাশী মহল গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পারস্পরিক যোগসাজশ ছাড়া এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন সম্ভব নয়।
এই সমস্ত অনিয়ম সরাসরি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ শেয়ারহোল্ডার চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন—এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ এসব অনিয়ম সম্পর্কে জেনেও যদি নীরব থাকে, তবে তাদের ভূমিকার বৈধতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
বোর্ড ছাড়াই একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি পরিচালনা, অবৈধ অর্থ উত্তোলন ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা চললেও স্টক এক্সচেঞ্জের নিষ্ক্রিয়তা পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক বার্তা বহন করে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ছায়া-নিয়ন্ত্রণ এখনও এই বীমা কোম্পানিটির ওপর বিদ্যমান। যদিও এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে জানতে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হলেও তারা কোন প্রকার মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, কোম্পানির সেক্রেটারি, সিএফও ও ভাইস চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও কোনো লিখিত বা মৌখিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বীমা খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, অবিলম্বে বৈধ বোর্ড পুনর্গঠন, নিরপেক্ষ ফরেনসিক অডিট, অবৈধ নিয়োগ ও লেনদেন বাতিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরী।
উক্ত পদক্ষেপ সমূহ দ্রুত গ্রহন করা না হলে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড গভীর সংকটে পড়বে। আর এটি যদি ঘটে তবে তা কেবল একটি কোম্পানির সংকট নয়—বরং পুরো বীমা ও পুঁজিবাজার ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ নজিরে পরিণত হবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81