01/15/2026
এএইচ এম. বজলুর রহমান | Published: 2026-01-14 20:44:30
“এনজিও থেকে ব্যাংকে রূপান্তর কোনো সংস্কার নয়; এটি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক নীরব হত্যাযজ্ঞ”
বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো (এনজিও) মানবিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং প্রান্তিক জনগণের জন্য সরকারের তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে, এনজিওরা সমাজের এই নিরন্ন অংশের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এক নতুন আশা তৈরি করেছে। তারা শুধু সেবা প্রদান করেনি, তারা ছিল মানুষের আস্থা, সম্মান এবং জীবনের সঙ্গী, বিশেষ করে দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া এবং নারীদের জন্য।
তবে সম্প্রতি, বাংলাদেশের এনজিও খাতের উপর চাপানো যে তথাকথিত "সংস্কার" প্রক্রিয়া—বিশেষত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে রূপান্তরের যে ব্যবস্থা—এটি মূলত মানবিক উন্নয়নকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি কোনো সংস্কার নয়; বরং একটি পরিকল্পিত কাঠামোগত পরিবর্তন, যার উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ নয়, বরং আর্থিক মুনাফা এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
এনজিও খাতে যারা একসময় পরিবর্তন আনতে কাজ করতেন, সেই নির্বাহী পরিচালক এবং মাঠকর্মীরা আজ এক কর্পোরেট যন্ত্রের অংশে পরিণত হচ্ছেন। আজকাল, বোর্ডরুমে বসে নীতিনির্ধারণ করা হচ্ছে, যেখানে মানবিক উন্নয়ন নয়, বরং ব্যাংকিং বিধি, রাজস্ব লক্ষ্য, এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। এনজিওর পুরনো আত্মা—যে আত্মা ছিল সহানুভূতি, সংলাপ এবং অংশগ্রহণ—সেটি এখন আর নেই। এখন "টার্গেট" এবং "গ্রাফ"-এর ভাষা রাজত্ব করছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মীরা, যারা একসময় দরিদ্র জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জীবনে পরিবর্তন এনেছিল, এখন ঋণ আদায়ের কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন। তাদের জন্য এটি এখন পেশাদারির ক্ষেত্রে এক প্রকার ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিকতা হয়ে উঠছে দুর্বলতা এবং সহানুভূতি পেশাগত অক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন সমাজে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা করছে, যেখানে উন্নয়ন আর মুক্তির প্রতীক নয়, বরং শাসনের আরেক রূপ হয়ে উঠছে।
ক্ষুদ্রঋণের ধারণাটি শুরু হয়েছিল মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে—নারী ক্ষমতায়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক উন্নতি নিশ্চিত করার জন্য। তবে বাস্তবে এটি আজ এক কর্পোরেট শোষণব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। আজকের দরিদ্র মানুষ "ডিফল্ট রিস্ক" হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, যেখানে তাদের পরিস্থিতি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আর্তনাদ হয়ে উঠছে। নারীর ক্ষমতায়ন এবং অংশগ্রহণের উন্নয়ন আজ শুধুমাত্র রিপোর্টের গ্রাফে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এতদিন যেসব মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিত, তারা এখন শুধুমাত্র ঋণ আদায়ের শিকার। এখন উন্নয়ন আসে "উপর থেকে"—নীতিমালা, রাজস্ব লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত কাঠামোর মাধ্যমে। এর ফলে, অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, নাগরিকদের কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধ হচ্ছে এবং দরিদ্র জনগণ শুধুমাত্র উপভোক্তা হিসেবে পরিণত হচ্ছে, অংশীদার হিসেবে নয়।
এটি বৈধতা পেতে সরকার, রেগুলেটরি সংস্থা এবং এনজিও লবিস্টরা এক যৌথ স্বার্থচক্রে আবদ্ধ। তারা উন্নয়ন এবং মানবিকতার পরিবর্তে দক্ষতা বৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কারের নামে মূল বাস্তবতাকে আড়াল করছে। এই শর্তগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, যা এনজিওদের মানবিক লক্ষ্যের পরিবর্তে কর্পোরেট মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করছে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে বিতর্কিত—যখন নীতিনির্ধারকরা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে পরিচালিত হন, তখন "গরিবের জন্য উন্নয়ন" পরিণত হয় "গরিবের ওপর উন্নয়ন"। একসময় যে এনজিও ছিল মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়, আজ তা পরিণত হচ্ছে আর্থিক স্বার্থে নিষ্কলুষ।
উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি মানবিকতার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতিশ্রুতি। যে উন্নয়ন মানুষের মর্যাদাকে খর্ব করে, সেটিকে উন্নয়ন বলা যায় না; এটি শোষণের আরেক রূপ। এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে রূপান্তরের প্রক্রিয়া মূলত একটি মানবিক বিপর্যয়; যেখানে উন্নয়ন হয়ে উঠছে নৈতিক অবক্ষয় এবং মানবিক প্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে যাচ্ছে কর্পোরেট হাতিয়ার।
জাতিসংঘের ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) মূল ভিত্তিই ছিল "কাউকে পেছনে না ফেলা"। কিন্তু বর্তমানে এই নীতিটি বিপন্ন হচ্ছে। যদি রাষ্ট্র এবং উন্নয়ন সহযোগীরা এই প্রবণতা রোধ না করেন, তাহলে ভবিষ্যতে উন্নয়ন খাত এমন এক অর্থনৈতিক মরুভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে থাকবে ঋণ, প্রতিবেদন এবং রিপোর্ট, কিন্তু থাকবে না মানুষ।
এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে রূপান্তর কোনো সংস্কার নয়; এটি এক নৈতিক অবক্ষয়, একটি মানবিক হত্যাযজ্ঞ। এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধুমাত্র মতামত নয়, এটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব।
যারা উন্নয়নকে বিশ্বাস করেন, তাদের এখনই প্রশ্ন করতে হবে—উন্নয়ন কার জন্য? উন্নয়ন কাদের হাতে? আর উন্নয়নের প্রকৃত মালিক কে? রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক সহযোগী এবং সুশীল সমাজ—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে এই মানবিক সংকোচনের বিরুদ্ধে।
কারণ উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, এটি মানবিকতার অঙ্গীকার। যদি আমরা এখনই এই দায় স্বীকার না করি, তবে ভবিষ্যতের ইতিহাস বলবে—আমরা মানবিক উন্নয়নকে কর্পোরেট নীতির কাছে বিকিয়ে দিয়েছিলাম।
---------------------------------------------------------
লেখক একজন ডিজিটাল গণতন্ত্র বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক দূত
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81