02/22/2026
নেহাল আহমেদ, রাজবাড়ী | Published: 2026-02-21 14:22:34
সারা দেশের মতো রাজবাড়ী জেলার সন্তানরাও মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার সংগ্রামে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল ঢাকা-কেন্দ্রিক কোনো ঘটনা ছিল না; এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামগঞ্জ, মহকুমা ও জেলা শহরে—রাজবাড়ী তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
রাজবাড়ীর সন্তান আবুল কাশেম (কার্টুনিস্ট) ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলা অক্ষর তাড়াও আন্দোলনের অংশ হিসেবে আঁকেন ঐতিহাসিক ‘হরফ খেদাও’ কার্টুন। এই কার্টুন শুধু আন্দোলনের ভাষা হয়ে ওঠেনি, বরং বাংলা ভাষার অধিকারের প্রতীক হিসেবে আজও বিশ্বব্যাপী স্মরণীয়।
আরেক কৃতি সন্তান অধ্যাপক আব্দুল গফুর (একুশে পদকপ্রাপ্ত)—যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রথম তিনজন শিক্ষার্থীর একজন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তমদ্দুন মজলিসের বাংলা মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। এই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয় এবং তাঁকে প্রায় তিন মাস আত্মগোপনে থাকতে হয়।
অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, রাজবাড়ী জেলায় আয়োজিত কোনো উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আব্দুল গফুরের নাম উচ্চারিত হতে খুব কমই দেখা যায়।
১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস থেকে প্রকাশিত ঐতিহাসিক পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা—বাংলা না উর্দু?’ ভাষা আন্দোলনের বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণে অনন্য ভূমিকা রাখে। এই পুস্তিকার লেখক ছিলেন রাজবাড়ীর সন্তান কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ এবং অধ্যাপক আবুল কাশেম।
তাঁরা স্পষ্টভাবে দাবি তোলেন—পূর্ব বাংলায় ভাব বিনিময়, শিক্ষা, অফিস ও আদালতের একমাত্র ভাষা হতে হবে বাংলা।
অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী রাজবাড়ীর বহু বিদগ্ধ ও গুণী মানুষ শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত শক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতেও রাজবাড়ীর ভাষা সৈনিকদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রাজবাড়ী জেলায় তাঁদের নিয়ে পরিকল্পিত কোনো গবেষণা বা সংরক্ষণমূলক কাজ হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো ঘটনা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রসমাজ ভাষার প্রশ্নে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে অনড় থাকায় সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। এরই চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত অধ্যায়।
ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজবাড়ী জেলার উল্লেখযোগ্য ভাষা সৈনিকদের মধ্যে ছিলেন—
ড. কাজী মোতাহার হোসেন (বাগমারা, পাংশা)
অধ্যাপক আব্দুর গফুর (দাদপুর, বেলগাছি)
এ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী (কাটাখালী, বরাট)
সামছুল আলম চৌধুরী (রাজবাড়ী সদর)
অধ্যক্ষ মিয়া মোহাম্মদ কায়েম উদ্দিন (রাজবাড়ী সদর)
হামিদুল হক ভোলা মিয়া (সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী)
অধ্যক্ষ বদরুদ্দোজা টুকু মিয়া (সূর্যনগর, রাজবাড়ী)
মুন্সি মোঃ তফাজ্জল হোসেন (পাকুরিয়া, পাংশা)
২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে যোগ দিয়ে এ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী হাতের তালুতে গুলিবিদ্ধ হন। বদরুদ্দোজা টুকু মিয়া গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সামছুল আলম চৌধুরী ও অধ্যক্ষ মিয়া মোহাম্মদ কায়েম উদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন মিছিলে অংশ নেন। হামিদুল হক ভোলা মিয়া মিছিলে অংশগ্রহণের কারণে গ্রেপ্তার হন।
মুন্সি মোঃ তফাজ্জল হোসেন সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় গোপনে ছাত্রদের আর্থিক সহায়তা করেন। এই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শালের বিচার শুরু হলেও মাতৃভাষার পক্ষে দৃঢ় ও সাহসী আত্মপক্ষ সমর্থনের ফলে তিনি অব্যাহতি পান।
ঢাকায় ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি নিরীহ ছাত্র ও জনতার ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ী শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
এ. কে. এম. আসজাদ, সমর সিংহ, হাবিবুর রহমান প্রমুখের নেতৃত্বে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৬–৭ হাজার মানুষ আজাদী ময়দানে সমবেত হন। পরে তাঁরা ডানলফ হলে (বর্তমান চিত্রা হল) মিলিত হন।
১৯৫২ সালের ১৬ মার্চ প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—ঢাকায় ছাত্র হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজবাড়ী মহকুমার সর্বত্র স্কুল ও হাট-বাজার বন্ধ রাখা হয়।
এই ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ভাষা আন্দোলনের মহান অধ্যায় শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজবাড়ীর মাটি, মানুষ ও মননও সেই সংগ্রামে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এই অবদান সংরক্ষণ ও প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81