32274

03/18/2026

মাননীয় পার্বত্যমন্ত্রী; দয়া করে সাম্প্রদায়িক হবেন না

এ এইচ এম ফারুক | Published: 2026-03-17 22:24:09

মাননীয় পার্বত্যমন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ান এমপি, সাম্প্রদায়িক হবেন না প্লিজ। তারেক রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই পাহাড়ের সুসম উন্নয়ন ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।

শুরুতেই এমন কথা লিখার কারণ হলো—বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার এক অবিচ্ছেদ্য এবং সংবেদনশীল অংশ হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, জাতিগত বিভেদ এবং আস্থার চরম সংকট কাটিয়ে এই অঞ্চলে টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে বর্তমান সরকারের হাত ধরে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে আধুনিক রূপরেখা, তার সফল প্রতিফলন হিসেবে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দু’জন যোগ্য অভিভাবককে পেয়েছি মনে করতে পারি।

নবনিযুক্ত পার্বত্যমন্ত্রী নিজে পাহাড়ের সন্তান এবং তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন আইনজীবী এবং বিচারকও ছিলেন। আপনার নতুন এই পথচলায় পাহাড়ের সন্তান ও একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কিছু গভীর পর্যবেক্ষণ ও গঠনমূলক পরামর্শ তুলে ধরছি যা এখন সময়ের দাবি।

অসাম্প্রদায়িকতা ও ‘রেইনবো নেশনস’ গঠনের কঠিন পরীক্ষা

পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল চ্যালেঞ্জ দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি। পূর্ববর্তী শাসনের বিভাজনের রাজনীতি এই অঞ্চলে এক ধরনের অদৃশ্য সাম্প্রদায়িক দেয়াল তুলে দিয়েছে। নবনিযুক্ত মাননীয় মন্ত্রীর কাছে পাহাড়ের মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা হলো—তিনি কোনো নির্দিষ্ট একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংকীর্ণ প্রতিনিধি না হয়ে বরং পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিসহ ১৪টি জনগোষ্ঠী তথা পাহাড়ে বসবাসরত সকল নাগরিকের পরম আত্মীয় ও পরম অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এটি তার জন্য কেবল একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নয়, বরং তার ব্যক্তিগত অসাম্প্রদায়িকতা প্রমাণের এক অগ্নিপরীক্ষা।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাহাড়ে তার নিজ চাকমা জাতি ছাড়াও বাকি ১২টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক তথা ৫১ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাকে মনে রাখতে হবে, তিনি কেবল আনুমানিক ৩০ শতাংশ চাকমা জনগোষ্ঠীর মন্ত্রী নন, বরং ৫১ শতাংশ বাঙালি ও বাকি প্রায় ২০ শতাংশ অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তারও মন্ত্রী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতি সমান সুবিচার ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাব বজায় রাখাই হবে তার নেতৃত্বের সার্থকতা।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের স্নেহধন্য হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া আমানত রক্ষায় তাকে সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হতে হবে। পাহাড়ের বৈচিত্র্যকে ধারণ করে একটি ‘রেইনবো নেশনস’ বা বহুবর্ণিল জনপদ গড়ে তোলাই হোক তার মূল লক্ষ্য।

পাহাড়-সমতল ভারসাম্য ও সমন্বিত নেতৃত্বের শক্তি

পাহাড়ের জটিল আর্থ-সামাজিক সমীকরণ মেলাতে সরকার যেমন পাহাড় থেকে পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছে, তেমনি সমতল ও পাহাড়ের মানুষের মধ্যে ভারসাম্য ও সেতুবন্ধন তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষ হিসেবে তিনি এবং তার পরিবার পাহাড়ের সাথে ওয়েল কানেক্টেড। ফলে তিনি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন তার অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে।

মন্ত্রীর প্রতি বিশেষ অনুরোধ থাকবে, তিনি যেন তার এই বাঙালি প্রতিমন্ত্রীকে কাজের ক্ষেত্রে ভ্রাতৃপ্রতিম সহযোগিতা প্রদান করেন। পাহাড় ও সমতলের এই ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই পারে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মিশনে প্রকৃত সফলতা আনতে। এই যৌথ নেতৃত্বই প্রমাণ করবে যে, সরকার পাহাড়ের সকল মানুষের সমান অধিকারে বিশ্বাসী এবং এখানে কোনো গোষ্ঠীগত আধিপত্যের স্থান নেই।

পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান

বিচারক সত্তার প্রতিফলন ও সাংবিধানিক সুরক্ষা

একজন সাবেক বিচারক তথা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে মাননীয় মন্ত্রীর কাছে পাহাড়বাসীর প্রত্যাশা অন্য সবার চেয়ে অনেক গভীরে। বিচারকের আসনে বসে যেমন আবেগ বা ব্যক্তিগত পছন্দের স্থান নেই, তেমনি রাষ্ট্রীয় এই উচ্চপদে আসীন হয়ে তাকে দেশের পবিত্র সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিক সমান—সেটি পাহাড় হোক বা সমতল। সংবিধানের আলোকে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিতে নিজেকে মানসিকভাবে নিয়োজিত করাই হবে তার প্রধান নৈতিক দায়িত্ব।

যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই এখানে দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও সুযোগ রয়েছে। এখানে কাউকে জাতিগত কারণে বিতাড়িত করার চেষ্টা করা বা নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানে দেশের সংবিধানের সাথে ‘গাদ্দারি’ করা। পাহাড়ের কিছু উগ্রপন্থী মানুষ যারা বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষবাষ্প ছড়ায় এবং সমতলের মানুষকে ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে বঞ্চিত রাখতে চায়, তাদের বিভ্রান্তিকর আদর্শের বিপরীতে মন্ত্রীর অবস্থান হতে হবে পাহাড়ের মতো কঠোর ও আপসহীন।

সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও উগ্রবাদ মোকাবিলা

পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন রহস্যময়, এর ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তেমনি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রুখতে মন্ত্রণালয়কে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সার্বক্ষণিক ও নিবিড় সমন্বয় করতে হবে।

এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, পাহাড়ের কিছু উগ্র গোষ্ঠী এখনো সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। একজন দেশপ্রেমিক অভিভাবক হিসেবে মাননীয় মন্ত্রীকে এসব গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণে এবং তাদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে। দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের অধীনে পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অটুট রাখা তার মেয়াদের অন্যতম প্রধান পরীক্ষা।

গবেষণালব্ধ উন্নয়নের টেকসই অগ্রাধিকার

দীর্ঘদিনের গবেষণার আলোকে আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনা কেবল অবকাঠামোগত হওয়া উচিত নয়, বরং তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। পাহাড়ের ইকো-সিস্টেম বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে পর্যটন ও কৃষিকে আধুনিকায়ন করতে হবে। উন্নয়নের নামে পাহাড়ের অনন্য বৈশিষ্ট্য যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

এছাড়া, পাহাড়ে মাদক চোরাচালান ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা জরুরি। মাননীয় মন্ত্রী যদি তার দীর্ঘ প্রশাসনিক ও বিচারিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই দীর্ঘদিনের ক্ষতগুলো নিরাময় করতে পারেন, তবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দর্শন পাহাড়ে পূর্ণতা পাবে।

পরিশেষে বলতে চাই—মাননীয় পার্বত্যমন্ত্রী, আপনার সামনে এখন পাহাড়ের ইতিহাস নতুন করে লেখার এক বিশাল সুযোগ। আপনি পাহাড়ের ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতি যেমন দায়বদ্ধ, তেমনি ৫১ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায়ও সমভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপনার ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় আমানত ও সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষায় আপনি আপসহীন থাকবেন—এটিই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।

সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে এবং প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য প্রতিনিধির সাথে মিলেমিশে একটি সুন্দর, শান্ত ও সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়তে আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ সফল হোক। তারেক রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সেই কালজয়ী পথরেখায় আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে যাক আমাদের প্রিয় পাহাড়।

লেখক একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81