32307

03/25/2026

গণহত্যা রাজবাড়ী: একটি ঘড়ি এবং হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র

নেহাল আহমেদ, কবি ও সাংবাদিক | Published: 2026-03-25 11:20:57

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস রক্ত, অশ্রু আর অসমাপ্ত শোকগাথায় লেখা। Bangladesh Liberation War-এর সেই নয় মাস শুধু যুদ্ধের সময় নয়—এটি ছিল পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের এক অধ্যায়, যেখানে একটি জাতির মেধা, সাহস ও ভবিষ্যৎকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বিশেষ করে যুদ্ধের শেষ প্রহরে, যখন বিজয় নিশ্চিত, তখনই সংঘটিত হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো এক নির্মম অধ্যায়।

Intellectual Killings in Bangladesh—এই শব্দবন্ধের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অগণিত পরিবার হারানোর ইতিহাস। আলবদর ও আলশামস বাহিনী নাম ধরে খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—বাংলাদেশ যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, যেন স্বাধীনতার ভোরও অন্ধকারে ঢেকে যায়।

রাজবাড়ীর মাটি সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। Rajbari District-এর বাগমারা গ্রামের সন্তান শহীদ ডাঃ খন্দকার নুরুল ইমাম—ডাকনাম তুর্কি—ছিলেন সেই হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্রদের একজন। সরকারি কর্মকর্তা খন্দকার আব্দুস সাত্তার ও মেহের-উন-নেসার সন্তান তুর্কি ছিলেন চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। সদ্য চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা এক তরুণ, যার সামনে ছিল সম্ভাবনায় ভরা একটি ভবিষ্যৎ।
কিন্তু সময় তখন অন্য গল্প লিখছে। যুদ্ধ শুরু হতেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার। কয়েকজন সহকর্মী চিকিৎসকের সঙ্গে পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই ঘটে যায় বিশ্বাসঘাতকতা। এক সকালে, নাস্তার টেবিলে বসে থাকা অবস্থাতেই চৌদ্দজন তরুণ চিকিৎসককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের অপরাধ—তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল।

এরপর নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার। চারদিকে যুদ্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, আর এক মায়ের নিরন্তর অপেক্ষা। “খেয়াল রাখিস তুর্কি”—মায়ের সেই শেষ কথাগুলো যেন বাতাসে ভাসতে থাকে। যুদ্ধ শেষ হয়, দেশ স্বাধীন হয়, কিন্তু তুর্কি আর ফেরে না।

একজন মা তখন থেমে থাকেন না। তিনি ছুটে যান কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে, খুঁজে বেড়ান ছেলের কোনো চিহ্ন। অবশেষে এক নাপিত—মোহনশীল—জানান, কিছু মানুষকে গুলি করে একটি গর্তে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। মাটি খুঁড়ে বের করা হয় কঙ্কালগুলো। সময়ের ব্যবধানে সব পরিচয় মুছে গেছে—শুধু একটি কঙ্কালের হাতে তখনো রয়ে গেছে একটি ঘড়ি।
সেই ঘড়ি—মায়ের নিজের হাতে কেনা। একটি সাধারণ বস্তু, কিন্তু সেটিই হয়ে ওঠে পরিচয়ের শেষ চিহ্ন। মা তার সন্তানকে চিনে নেন। একটি ঘড়ি যেন সাক্ষ্য দেয়—একটি জীবনের, একটি স্বপ্নের, একটি হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্রের।

এই গল্প শুধু একজন তুর্কির নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের গল্প। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমরা যখন শ্রদ্ধা জানাই, তখন এই প্রশ্নটিও সামনে আসে—কেন গণহত্যা নিয়ে এখনো এত নীরবতা? এই নীরবতা কি শুধুই বিস্মৃতি, নাকি দায় এড়িয়ে যাওয়ার এক অদৃশ্য প্রচেষ্টা? কেন আজও সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়নি রাজাকারের তালিকা? কেন প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে?

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—ভুলে যাওয়া। কারণ ভুলে গেলে সত্য মুছে যায়, অপরাধীরা অদৃশ্য হয়ে যায়, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারিয়ে ফেলে তাদের শেকড়।

রাজবাড়ীর সেই মাটির নিচে শুধু কঙ্কাল নয়, চাপা পড়ে আছে একটি জাতির বেদনা, একটি মায়ের কান্না, আর একটি ঘড়ির টিকটিক শব্দ—যা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময় থেমে থাকেনি, কিন্তু কিছু ক্ষত কখনোই শুকায় না।

শ্রদ্ধা জানাই বাংলার সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, যারা নিজেদের জীবন দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য এনে দিয়েছেন। তাদের স্মৃতি আমাদের দায়বদ্ধ করে—সত্যকে ধরে রাখার, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার, এবং নীরবতার দেয়াল ভেঙে ইতিহাসকে উচ্চারণ করার


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81