05/18/2026
বিশেষ প্রতিবেদক | Published: 2026-05-18 08:19:30
দীর্ঘদিন ধরেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের যেকোনো প্রকল্প টাকা লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দু। সরকারি হিসাব এবং অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, গত এক দশকে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে অর্ধশতাধিক প্রকল্পে। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকের পরিবর্তন সত্ত্বেও, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে মূল দায়ী কর্মকর্তারা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অনেক দিন ধরেই সক্রিয়। এদের নেতৃত্বে রয়েছেন সেই কর্মকর্তারা, যারা স্বৈরাচারী আমলে নিয়োগ পরীক্ষা ব্যতীতই সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে পদোন্নতি লাভ করেছেন এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করেছেন। সিন্ডিকেটটি শুধুমাত্র প্রকল্প বরাদ্দ ও টেন্ডার কারচুপিই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং কর্মী নিয়োগ, বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এরা এমন ক্ষমতাশালী যে, দপ্তরের ভেতরে তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের আড়ালে প্রতিষ্ঠানটির ‘কাঠের কারখানা’ খ্যাত স্পেশাল ইউনিটে গড়ে উঠেছে দুর্নীতি, অনিয়ম আর লুটপাটের এক বিশাল সাম্রাজ্য। সরকারি বিধিবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখানে চলছে কমিশন বাণিজ্য, যেখানে মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের নাম। তার কাছে জিম্মি হয়ে আছেন সাধারণ ঠিকাদাররা, আর লুটপাট হচ্ছে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা। এক্ষেত্রে তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বদরুল আলম খান। যখনই জাহাঙ্গীর কোন বিপদে পড়েছেন তখনই ত্রানকর্তা হিসেবে তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন এই বদরুল আলম।
স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনামলে সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি নিয়োগ কেলেঙ্কারি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বিসিএস পরীক্ষাকে পাশ কাটিয়ে ছাত্রলীগপন্থী কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর সেই বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের অন্যতম মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে সরকারের কয়েকশত কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলী।
সূত্রমতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাধারণত ৯ম গ্রেডে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া হলেও আওয়ামীপন্থী একটি সিন্ডিকেট পিএসসিকে ব্যবহার করে মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, সমীরণ মিস্ত্রী, জিয়াউর রহমান, মোঃ আবু তালেবসহ কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। গনপূর্তের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া এবং শেখ পরিবারের দুই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ শেখ সেলিম ও শেখ হেলালের তদবিরে পিএসসিতে এই বিশেষ সুপারিশ পাঠানো হয়।
আরও ভয়াবহ অভিযোগ হলো—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম আহমেদুলকে সরাসরি ফোন করে নির্দেশ দেন যেন কোনো লিখিত পরীক্ষা বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র ভাইভার মাধ্যমে নির্ধারিত তালিকার ১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে পিএসসি নামমাত্র ভাইভা নিয়ে সেই সুপারিশ চূড়ান্ত করে।
এই অবৈধ নিয়োগের প্রতিবাদ করেন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা। তারা হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে আদালত ১৭টি পদ বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষণের আদেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আদালতের সেই আদেশকেও কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়। বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের শুধু বহালই রাখা হয়নি, বরং সংরক্ষিত কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে তাদের সিনিয়রিটিও দেওয়া হয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ হচ্ছে—আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালীন প্রায় ১১ মাস ব্যাকডেট দেখিয়ে যোগদানপত্র তৈরি করা হয় এবং চাকরিতে উপস্থিত না থেকেও সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ বকেয়া বেতন উত্তোলন করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বিআইডাব্লিউটিএতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত সরকারি বেতন উত্তোলন করছিলেন। একই সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকেও তিনি বেতন গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, স্পেশাল ইউনিটে টেন্ডার প্রক্রিয়া এখন কেবলই একটি লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা। মূলত টেন্ডার হওয়ার আগেই পছন্দের ঠিকাদারদের কাছে কাজের এস্টিমেট (ব্যয় নির্ধারণী খসড়া) ফাঁস করে দেওয়া হয়। বিনিময়ে জাহাঙ্গীর সিন্ডিকেট গ্রহণ করে ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত ‘অগ্রিম কমিশন’। অর্থাৎ, টাকা দিলে কাজ নিশ্চিত, না দিলে যোগ্যতা থাকলেও মিলছে না কার্যাদেশ। অনেক লাইসেন্সধারী ঠিকাদার অগ্রিম টাকা দিয়েও কাজ না পেয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কাজ পাওয়ার পর ঠিকাদারদের ওপর নির্দিষ্ট কিছু ফার্নিচার কোম্পানি (যেমন: হাতিল, পশ, রিগেল, আকতার ও ডট ফার্নিচার) থেকে মালামাল কেনার শর্ত চাপিয়ে দেন নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম। এই শর্ত অমান্য করলে মৌখিকভাবে চুক্তি বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়। এর ফলে মানসম্পন্ন কাজ করা বহু পুরনো ঠিকাদাররা বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন এবং একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পিপিডব্লিউডি উড ডিভিশনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাজ আসার পর থেকেই শুরু হয় বদরুল আলম খানের দৌরাত্ম্য। নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে গনপূর্তের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানকে দিয়ে এই ইউনিটে অবৈধ হস্তক্ষেপ করান।
এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপিপিভুক্ত কাজগুলো কৌশলে দুই ভাগে ভাগ করে বিশাল অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রধান প্রকৌশলীর ছোট ভাই ‘মামুন’-এর নাম ভাঙিয়েও ঠিকাদারদের কাছে মোটা অংকের টাকাও দাবি করা হচ্ছে, যা অধিদপ্তরের ভেতরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে দেশের প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনের সংস্কার কাজ নিয়ে। সেখানে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার তড়িঘড়ি করে জাহাঙ্গীর আলমকে রাজশাহীতে বদলি করেন। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির ইশারায় মাত্র আট মাসের মাথায় তিনি পুনরায় ঢাকার এই লাভজনক স্পেশাল ইউনিটে ফিরে আসেন। এই রহস্যজনক প্রত্যাবর্তন নিয়ে খোদ প্রশাসনের ভেতরেই কানাঘুষা চলছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড’ নামের একটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠান গত দুই অর্থবছরে অস্বাভাবিকভাবে কোটি কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার আটশত দুই টাকা একান্ন পয়সা টাকা চুক্তিমূল্যে ২০২৫/১৩ নং লটে মডেল মসজিদ প্রকল্পে ৭টি উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক কালচারাল সেন্টারে আসবাবপত্র সরবরাহ ও স্থাপন কাজ, একই অর্থবছরে একই প্রকল্পে ২০২৫/৩ নং লটে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার নয়শত দুই টাকা একান্ন পয়সা চুক্তিমূল্যে আরো ৭টি মডেল মসজিদে একই কাজ, একই অর্থবছরে ২০২৫/৪নং লটে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার নয়শত দুই টাকা একান্ন পয়সা নির্ধারিত বরাদ্দে অন্য ৭টি মসজিদে একই ধরণের কাজগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানীটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় রায়েবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার একশত টাকা চুক্তিমূল্যে ফার্নিচার ও ফিটিং ফিক্সারস সরবরাহ ও স্থাপণ, একই অর্থবছরে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরী ও গবেষণাগার নির্মাণ প্রকল্পে ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৪ হাজার সাতশত টাকা চুক্তিমূল্যে ফার্নিচার সরবরাহ ও স্থাপণ কাজ ‘ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড’ হাতিয়ে নিয়েছে।
এদিকে, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম সবচেয়ে বেশী সমালোচিত হয়েছন নির্মাণাধীন পাবলিক লাইব্রেরীর বহুমুখী ভবন নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। সূত্র মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাবলিক লাইব্রেরীর বহুমুখী ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৩০ হাজার সাতশত ছাপান্ন টাকা উনসত্তুর পয়সা চুক্তিমূল্যে ফার্নিচার সরবরাহের কাজও ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেডকেই দেয়া হয়। অথচ এই ভবনের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি। দুর্নীতি আর কারসাজির নাটেরগুরু প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের বদৌলতে এরকম আরো বহু কাজ ফার্নিচার কনসেপ্টের পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, মূল ভবনের সিভিল কাজ শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে কয়েক কোটি টাকার ফার্নিচার সরবরাহের চুক্তি সম্পন্ন হয়? এটি কি কেবলই সরকারি টাকা আত্মসাতের পরিকল্পনা?
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গণপূর্তের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমকে নারীলোভী নন-বিসিএস প্রকৌশলী হিসেবে সবাই তাকে চেনেন ও জানেন। সূত্র মতে, সরকারি ছুটির দিন তার জন্য ঈদ। ঢাকায় একেক ঠিকাদার একেক রিসোর্টে সুন্দরী রমনী দিয়ে তার আনন্দ ও মনোরঞ্জন করাতেন।
অন্যদিকে, আখতার ফার্নিচারস, নাদীয়া ফার্নিচার ও হাতিলের মতো নামীদামি কোম্পানী কয়েক কোটি টাকার বেশকিছু কাজ বাগিয়ে নিয়েছে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরকে বিশেষভাবে ম্যানেজ করে বা বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে। কোন কোন কোম্পানী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের মনোরঞ্জনের জন্য কুয়াকাটা, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লোকশনে বান্ধবীসহ প্লেজার ট্রিপের ব্যবস্থা করে বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে এনেছে বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
এছাড়া, দশ লাখ টাকা খরচ করে তিনি বোট ক্লাবে মেম্বারশিপ নিয়েছেন। সেখানে উঠতি মডেল ও চলচ্চিত্র নায়িকা ছাড়াও অনেক আবেদনময়ী নারীদের সাথে আয়েশি সময় কাটান বলেও একাধিক সূত্র দাবী করেছে।
একটি অভিযোগে থেকে আরও জানা যায়, ওয়ার্ক এসিস্ট্যান্ট, পাম্প অপারেটর, লিফট অপারেটর, সিসি ক্যামেরা অপারেটর, বড় বাবু বা হিসাব সহকারী, জেনারেটর অপারেটর পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অসংখ্য লোকজন। ই/এম বিভাগ- ২ এর অধীনে উপ বিভাগ ৩ ও ৪ এর লোকবলের অধিকাংশই রাজশাহীর এবং তারা জাহাঙ্গীর আলমের আত্মীয়-স্বজন। এরা সবাই আর্থিক লেনদেনে নিয়োগপ্রাপ্ত। এর মধ্যে কিছু লোকবল কোন প্রয়োজন ছাড়াই নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তাদের বেতন ছিল দ্বিগুণ, এমনকি ঠিকাদারের অধীনস্থ লোকবল দিয়ে চালিয়েছেন বড়বাবুর-সেকশন প্রধানের দায়িত্ব, ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহার করতেন তাদেরকে। রাষ্ট্রের অর্থ খরচে লোকবল নিয়োগ দিয়ে করাতেন ভুয়া বিল ভাউচারও।
নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বর্তমানে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ তিনটি পৃথক তদন্ত চলমান। আইনত তদন্তাধীন কর্মকর্তার ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার কথা থাকলেও, গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানের প্রত্যক্ষ মদদে তিনি উল্টো আরও দেড়শ কোটি টাকার নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়ার অনুমতি পেয়েছেন।
এই বিষয়ে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব জানান, ৩টি পৃথক তদন্ত কমিটি নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনুসন্ধান করছে।আমার জানামতে, তাদের তদন্তও শেষ পর্যায়ে। তবুও তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে কেন দেরি হচ্ছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পুনরায় চিঠি দেওয়া হবে।`
এদিকে, উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম ঘুষ-অনিয়ম-দূর্নীতির মাধ্যমে মাত্র ৯ বছরেই প্রায় শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। জাহাঙ্গীর আলমের নামে বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য দ্য ফিন্যান্স টুডের হাতে এসেছে। এই মুহুর্তে নিজস্ব অনুসন্ধানে সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে আগামী পর্বে প্রকাশিত হবে।
সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ংকর অভিযোগগুলোর একটি হচ্ছে—গণপূর্তকে ঘিরে গড়ে ওঠা কথিত “গৃহপালিত সাংবাদিক কাম দালালচক্র”। গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এক ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও বাস্তবে তিনি প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের হয়ে দালালি করেন। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তে তার নিয়মিত অফিস রয়েছে। তিনি প্রধান প্রকৌশলী, আহসান হাবীবসহ কয়েকজন কর্মকর্তার হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে দেনদরবার করেন, দুর্নীতির সংবাদ ঠেকানোর চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল থেকে প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলতে চাপ সৃষ্টি করেন।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখানো হয়, পরে অর্থের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে হুমকি দেওয়া হয়।
এই চক্রকে ঘিরে নতুন বিতর্ক ছড়ায় আখতারুজ্জামান খান রকির একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। তিনি লেখেন— “গণপূর্ত অধিদপ্তরে এক সাংবাদিক নাকি কক্ষ দখল করে নিয়মিত অফিস করছেন। প্রধান প্রকৌশলীসহ অন্যান্যদের নিউজ না করার তদবির (হুমকি) করছেন সেই অফিসে বসে।” পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে গণপূর্তের অভ্যন্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
গণপূর্তের এই ‘স্পেশাল ইউনিট’ কি সত্যিই উন্নয়নের কাজ করছে, নাকি এটি জাহাঙ্গীর সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন এখন তুঙ্গে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সচেতন মহল মনে করেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে হয় প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে নতুবা উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। অন্যথায়, সরকারের কয়েকশ কোটি টাকা গচ্চা যাবে এবং মুখ থুবড়ে পড়বে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, দপ্তরের ভেতরে সংস্কারের চেষ্টা করার মতো সাহসী কর্মকর্তারা নানা প্রভাবের কারণে সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
বিগত বছরগুলোতে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজের সুবাদে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র অভিজ্ঞতার আলোকে অকপটেই বলা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা গণপূর্ত অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোতে উচ্চপদে নিয়োগ নিয়ে নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখেন। অন্যদিকে, গনপূর্তে তাদেরই অনুসারী কিছু অসাধু নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্প বরাদ্দে প্রভাব বিস্তার করে, নির্বাচিত ঠিকাদারদের মাধ্যমে অনিয়ম করে, প্রকল্পের গুণগত মান হ্রাস করে এবং অতিরিক্ত ব্যয় প্রদর্শন করে পূর্বসূরিদের ন্যায় লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে।
উপরোক্ত কৌশলগুলো নিশ্চিত করেছে, যে সরকারি প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হলেও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরে এখনও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব দেশটির অবকাঠামো প্রকল্পের ন্যায্যতা ও জবাবদিহির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে দপ্তরের সংস্কার কার্যক্রম এখনো কার্যকর হয়নি।
সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যদি প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে সরকারি প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির এই ধারা চলতেই থাকবে। জনগণের করের টাকা সুষ্ঠুভাবে ব্যবহারের জন্য দপ্তরের তৎপর সংস্কার, স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি অপরিহার্য।
Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman
Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81