33080

06/11/2026

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী নির্দেশনা

আলহাজ্ব আবুল মেছের | Published: 2026-06-11 05:50:04

আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা একটি জরিপ পরিচালনা করে। উক্ত প্রাক-বর্ষা জরিপের তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় অধিকাংশ বসতবাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অভিজ্ঞতার আলোকে তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

সম্ভাব্য ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ মোকাবিলা এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনীতির ক্ষতি কমাতে এবার গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগকে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ যৌথভাবে নগর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, মশাবাহিত রোগ (ডেঙ্গু) নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করছে। যৌথ কর্মপরিকল্পনার মূল কার্যক্রম নিম্নরূপ।

কার্যকর সমন্বয়

যে কোনও রোগ-বালাই সংক্রান্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তবে প্রায়শই এই দুই বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব পালনে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা দেখা যায়। যে কারণে বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবসময় বছরব্যাপী সমন্বিত ও পরিকল্পনাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দিয়ে থাকে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমেই স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

তথ্য হালনাগাদ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভা আয়োজন করে তথ্য হালনাগাদ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তথ্য আদান-প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি সেই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে প্রদান করা যাতে মশক নিধন কর্মীরা দ্রুত সেই এলাকায় ব্যবস্থা নিতে পারে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে থাকা ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কাছে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। এই কেন্দ্রগুলো সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ভবনগুলোতে থাকলেও এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবেন সিভিল সার্জনরা।

সরকারি সেবা সংক্রান্ত নির্দেশনা

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ‘ডেঙ্গু কর্নার’, ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের চিকিৎসক-নার্সদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিদ্যমান ৩১ ও ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে।

এছাড়া জরুরি চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে পর্যাপ্ত আইভি স্যালাইন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

এছাড়া মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক করার রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।

বেসরকারি সেবা সংক্রান্ত নির্দেশনা

সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। তবে, এবার সরকার ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়ে দেশের সকল বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যা নিম্নরূপ।

➤ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অন্তত ১০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

➤ ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি কমিয়ে ৮০% পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

➤ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো ডেঙ্গু রোগীর জন্য চিকিৎসকরা অতিরিক্ত ভিজিট বা ফি নিতে পারবেন না।

প্রতিরোধমূলক নির্দেশনা

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে "পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ" এবং "প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম"—এই দুটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে খতিব, ইমাম, ফাদার, পুরোহিত সহ অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে জুমার খুতবা এবং নিয়মিত প্রার্থনায় পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারের উদ্যোগ নিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে খুব দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন ধর্মীয় অনুশাসনে গড়ে উঠা আমাদের সকলের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ক্রাশ প্রোগ্রাম:

এডিস মশা নিধনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা হয়েছে। এর আওতায়

➤ মশা নিধন: মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও লার্ভা নিধনে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

➤ সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান: স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্ব স্ব এলাকায় প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

➤ বংশবিস্তার রোধ: এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে বাড়ির আঙিনা, ছাদ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর কড়া নির্দেশনা রয়েছে। ফুলের টব, ড্রাম, বালতি বা নর্দমায় যেন তিন দিনের বেশি পানি জমতে না পারে, সেই বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।

➤ মোবাইল কোর্ট: এডিস মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিবিড় নজরদারি এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সচেতনতামূলক নির্দেশনা

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এক্ষেত্রে জনগণের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ। উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সম্প্রতি এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ ভিডিওবার্তায় দেশের মানুষকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সচেতন ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে বাড়ি, অফিস ও আশেপাশের ফুলের টব, টায়ার, ডাবের খোসা বা অন্য কোনো স্থান/পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য নগরবাসীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন। এছাড়া, এসির পানি, ফ্রিজের ট্রে বা পানির পাত্র এবং পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার ও ঢেকে রাখার পাশাপাশি বাড়ির আশেপাশের ড্রেন বা নর্দমা পরিষ্কার করা ও মশক নিধনের জন্য নিয়মিত ওষুধ বা স্প্রে ব্যবহারের আহবান জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, মশার কামড় থেকে বাঁচতে (দিনে হোক বা রাতে) ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি টানানোর অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ফুল হাতা জামা ও ফুল প্যান্ট পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধক ক্রিম বা স্প্রে (মসকুইটো রিপেলেন্ট) ব্যবহারের কথাও বলেছেন আমাদের সচেতন প্রধানমন্ত্রী। মশা যেন ঘরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য অন্তত সকাল-সন্ধ্যা ঘরের দরজা ও জানালা বন্ধ রাখা অথবা নেট লাগানোর অনুরোধ করেছেন।

এছাড়া, ডেঙ্গুর লক্ষণ (যেমন: তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে র‌্যাশ) দেখা মাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বলেছেন মানবিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

উপসংহার

করোনাকালে যেমন আমরা সবাই একযোগে কাজ করেছি, তেমনি ডেঙ্গু প্রতিরোধেও আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সরকারের আগাম প্রস্তুতি, সিটি কর্পোরেশনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

তাই আসুন, আমরা সচেতন হই এবং সবাই মিলে প্রিয় শহরকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি। আপনাদের সকলের সহযোগিতা ও সচেতনতায় আমরা গড়ব একটি সুন্দর শহর ও সুস্থ পরিবেশ।

লেখক একজন উন্নয়নকর্মী, নীতি বিশ্লেষক, সফল ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক। তিনি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ও ধর্মপ্রাণ রাজনৈতিক ব্যক্তি। আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী।


Editor & Publisher : Md. Motiur Rahman

Pritam-Zaman Tower, Level 03, Suite No: 401/A, 37/2 Bir Protik Gazi Dastagir Road, Purana Palton, Dhaka-1000
Cell : (+88) 01706 666 716, (+88) 01711 145 898, Phone: +88 02-41051180-81