Siyam Hoque

Published:
2020-06-03 10:38:20 BdST

মাস্ক কেলেঙ্কারির একতরফা তদন্ত


NEWS DESK

দেশে করোনাভাইরাস রোধে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পিপিই ও এন-৯৫ মাস্ক কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এ মাস্ক কেনা নিয়ে নয়-ছয়ের অভিযোগ উঠলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

জানা গেছে, এন-৯৫ মাস্ক কেনার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। সরবরাহের জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয় জেএমআই নামক একটি সিরিঞ্জ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান শুরুতেই বড় ধরনের অনিয়ম করে বসে। তারা ভুয়া এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করলে চিকিৎসরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিষয়টি লিখিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত মাসে মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন

দাখিল করে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সিএমএসডির পরিচালককে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয় বলে জানা গেছে। তবে জেএমআইয়ের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে সে সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।

এদিকে দুদক পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য যুগান্তরকে জানান, ওই তদন্ত রিপোর্ট চেয়ে কমিশন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেবে। তাদের প্রতিবেদনে কী কী গোপন করা হয়েছে দুদকের তদন্তে তা বেরিয়ে আসবে।

এদিকে, অভিযোগ পাওয়া গেছে, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় স্বাস্থ্য সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় সিন্ডিকেটের স্বার্থ বাস্তবায়ন না করার কারণে সরে যেতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সিএমএসডির পরিচালককে। তিনি নিজেও এই দাবি করে বলেছেন, ‘এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপের কাছে ব্যাখ্যা না চেয়ে একপাক্ষিকভাবে সিএমএসডির ওপর দোষ চাপানো হয়েছে।

এমনকি এন-৯৫ মাস্কসহ সরঞ্জাম ক্রয়ে সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা না করায় সিএমএসডি থেকে তাকে সরানো হয়েছে।’ তদন্তে এককভাবে তার প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপানো হয়। এ অভিযোগ করে সদ্য বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ বলেন, অনেকেই বলেছিলেন এখানে অনেক সিন্ডিকেট আছে।

সেই সিন্ডিকেটের কারণেই একতরফাভাবে তাকে সরানো হয়। তিনি জানান, অভিযোগ ওঠার পরপরই জেএমআইকে চিঠি দিয়ে জানতে চান, তারা কেন এ ধরনের নকল মাস্ক সরবরাহ করেছে? প্রতিষ্ঠানটি তখন ভুল স্বীকার করে। ফলে এর দায় সম্পূর্ণ ওই প্রতিষ্ঠানের (জেএমআই) ওপর বর্তায়।

তিনি বলেন, যখন এ বিষয়টি আমাদের নজরে আসে হাসপাতাল থেকে আমরা সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটি (এন-৯৫ মাস্ক) সরিয়ে নেই। একই সঙ্গে বিষয়টি জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেই। জেএমআইয়ের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যও অনুরোধ করি।

জানা গেছে, প্রথা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের ওই পরিচালককে সরিয়ে সিএমএসডির পরিচালক হিসেবে বসানো হয় একজন অতিরিক্ত সচিবকে। যার বিরোধিতা করেন চিকিৎসক ফোরামের নেতারাও। এ বিষয়ে স্বাচিপ সভাপতি ডা. ইকবাল আরসলান একজনকে সরিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের একজনকে দেয়ার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না বলে এই প্রতিবেদককে জানান।

যদিও আইন মেনেই পরিচালককে বদলি করা হয়েছে বলে জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, আমরা যদি মনে করি, নতুন কারো নেতৃত্বে কাজটি ভালোভাবে পরিচালিত হবে সেটা তো করতেই পারি।

এদিকে, কোভিড-১৯ মাস্ক ও যন্ত্রপাতি সরবরাহে সিন্ডিকেটের কথা তুলে ধরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেন ব্রি. জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ। তার অনুলিপি দেন একাধিক দফতরে। চিঠিতে কেনাকাটার ক্ষেত্রে একজন মন্ত্রী ও তার ছেলের সুপারিশের বিষয়ে একজন অতিরিক্ত সচিব মৌখিকভাবে তাকে অনুরোধ করেছিলেন বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রশ্নই আসে না। আর তিনি যদি আমাকে কপি না দেন তবে এটা কনফার্ম করে না। আমাকে কপি দিলে অবশ্যই আমি অবজেকশন দিতাম। যাওয়ার সময় কত কথাই বলতে পারেন।

স্বাস্থ্য খাতের সেই পুরনো নাম উল্লেখ করে ব্রি. জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ বলেন, মিঠু গ্রুপ ও তার বিভিন্ন কোম্পানি রয়েছে নামে বেনামে। প্রতি বছরই তারা কোম্পানির নামও প্রয়োজনে পরিবর্তন করে। যেমন জহির গ্রুপ আছে। বিভিন্ন গ্রুপ এখনও সক্রিয়। আমি স্বাভাবিকভাবেই ক্রয় প্রক্রিয়ার মধ্যে তাদের তদবির আমলে নেইনি। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মধ্যে সমন্বহীনতার অভিযোগও করেন তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদুল্লাহ তার লিখিত অভিযোগে বলেন, ‘জনৈক অতিরিক্ত সচিব সম্প্রতি মৌখিকভাবে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক শহীদউল্লাকে একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার ছেলের অনুরোধ রয়েছে। তাদের পাঠানো তালিকা ও মূল্য অনুযায়ী দ্রব্যাদি কেনাকাটা করতে হবে।

যাতে মেডিটেক ইমেজিং লিঃ নামের প্রতিষ্ঠানটিসহ এর সহযোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পায়। যে প্রতিষ্ঠানটি পণ্য না দিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ঠিকাদার মিঠুর মালিকানাধীন।’ ৩০ মে জনপ্রশাসন সচিবকে প্রেরিত এক স্মারকে এসব তথ্য জানান সিএমএসডি থেকে সদস্য অপসারিত পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘আমি এর প্রস্তাবের বিরোধিতা করি এবং তাদের ‘ক্রয় তালিকায় সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করিনি। এতে মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ সহযোগী ঠিকাদাররা ক্ষিপ্ত হন। অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোভিড হাসপাতালের আইসিইউর জন্য ডিপিএম পদ্ধতিতে কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চাহিদা দেয়।

মৌখিকভাবে ক্রয়ের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, মেডিটেক ইমেজিংয়ের কাছে সব সরঞ্জাম আছে। তাই তাদের কাছ থেকে যথাসম্ভব নেয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু মেডিটেক ইমেজিংয়ের যন্ত্রপাতি ছিল নিুমানের এবং দাম উচ্চমূল্যের। ফলে তারা বাদ পড়ে। এতে মিঠু বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অভ্যাস অনুযায়ী সিএমএসডির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে অপপ্রচার চালাতে থাকে।

এরই প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক হিসেবে নিষ্ঠা আর সততার সঙ্গে কাজ করার পরও অনাকাক্সিক্ষত, অন্যায়ভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রেষণ প্রত্যাহারপূর্বক বদলির আদেশ জারি করা হয়। এ পদে একজন অতিরিক্ত সচিবকে বদলিপূর্বক পদায়ন করা হয়। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই কোভিড-১৯ এর সব ধরনের ক্রয় পদ্ধতি আমি দ্রুততা, সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদন করেছি।

তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সঙ্গে মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বাজেট সংগ্রহসহ প্রকিউরমেন্ট প্ল্যান তৈরি করা হয়। এই সিন্ডেকেট সিএমএসডিতে দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এতে সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নিুমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্রয়প্রক্রিয়া এই সিন্ডিকেটের মনোপূত না হলে ক্রয় বাতিল বা দীর্ঘায়িত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রয়োজনে কর্মকর্তার বদলিসহ বিভিন্ন হুমকি প্রদান করে।’

তিনি ঠিকাদার মিঠু চক্রের উল্লেখ করে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তা ঠিকাদার মিঠুর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। মিঠু বাহিনীর রয়েছে বিভিন্ন নামে-বেনামে সাপ্লাই কোম্পানি। লুটপাট করতে প্রতি বছর তারা একটি করে নতুন কোম্পানি খোলে। তাদের সাম্প্র্রতিক একটি কোম্পানির নাম Meditech Imaging Ltd. যার পরিচালক মো. হুমায়ন কবির (পিন্টু)। পূর্বে এই ব্যক্তি লেক্সিকন নামে মিঠুর একটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। মিঠু বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছে।

সম্প্র্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনৈক অতিরিক্ত সচিব মিঠু চক্রের নির্দেশে তাদের পছন্দনীয় বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রের ক্রয়ের তালিকা পাঠিয়েছেন এবং অদ্যাবধি বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছেন, যাতে ক্রয় পরিকল্পনা তাদের ইচ্ছামাফিক বাস্তবায়িত হয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) সিরাজুল ইসলাম সিএমএসডির ক্রয় কমিটির সদস্য ও কোনো কোনো কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি উচ্চমূল্যে দাখিল করে নিু মানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার জন্য প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। বিগত সময়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেও ৪৫০ কোটি টাকার বিল তুলে নেয়।

কোভিড-১৯ সংক্রমণে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের কোভিড সংক্রমণ মোকাবেলায় কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং সিএমএসডি কর্তৃক কি কি দ্রব্যাদি ক্রয় করতে হবে তার কোনো সঠিক পরিকল্পনা ছিল না। তবে এ ক্ষেত্রে নিজস্ব উদ্যোগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক সিডিসির সঙ্গে কথোপকথনে পিপিইসহ অন্যান্য সামগ্রী স্টক করার অনুরোধ জানালে সে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

মার্চের প্রথম সপ্তাহে অধিদফতর থেকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পিপিই পাঠানোর নির্দেশ আশে। পরবর্তীতে ১০ মার্চ ২০২০ পরিচালক সিডিসি স্বাস্থ্য অধিদফতর সংক্রমণের জন্য আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার একটি চাহিদা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ্যারিস্টোকার্ট, এসিআই, আরএফএল, গ্রেটওয়াল জেএমআই আর কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, যারা পিপিই প্রস্তুত করতে পারে। এরই মধ্যে লকডাউন শুরু হয়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে কেনাকাটায় কী পদ্ধতি অনুসরণ হবে, অর্থের সংস্থান আছে কিনা, স্পেসিফিকেশন কী হবে, কী পরিমাণ ক্রয় করতে হবে তার সঠিক কোনো পরিকল্পনা দিকনির্দেশনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতর থেকে দেয়া হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিএমএসডি কিছু সংখ্যক জনবল নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হতে বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী মৌখিকভাবে পর্যায়ক্রমে ক্রয় শুরু করে।

বারবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের এসব সামগ্রী কী পরিমাণ কেনা হবে, তার অর্থের উৎস কী হবে ইত্যাদি নির্দেশনা চাওয়া হলেও পাওয়া যায়নি। ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বাজেট) এর মৌখিক নির্দেশনায় সরবরাহ সামগ্রী পিপিইসহ অন্যান্য আইটেমের আনুমানিক প্রয়োজন উল্লেখ করে ১০০ কোটি টাকার চাহিদা দেয়া হলে মার্চের শেষের দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রেরণ করেন।

পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াও কেন্দ্রীয় ঔষধাগার আনুমানিক ২০টি নতুন পিসিআর মেশিন কিনে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপন করে। এ পর্যন্ত আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার ক্রয় সম্পাদিত হলেও মাত্র ১০০ কোটি টাকার সংস্থান হয়েছে।

 
 

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.


Popular Article from FT বাংলা