January 23, 2022, 3:44 pm


নেহাল আহমেদ

Published:
2022-01-14 16:09:52 BdST

আজ পৌষ সংক্রান্তি


আজ পৌষ মাসের শেষ দিন। আর পৌষের শেষ দিন মানেই বাঙালীর ঐতিহ্যবাহী পৌষ সংক্রান্তি। এই দিনে পুরান ঢাকা মাতবে সাকরাইন উৎসবে।

পৌষ সংক্রান্তি বাঙালীর একেবারে প্রাচীন উৎসবগুলোর একটি। এক সময় বেশ ঘটা করে উদযাপন করা হতো। বিশেষ করে গ্রাম বাংলায় এই বিশেষ দিন উপলক্ষে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালনের রীতি প্রচলিত ছিল। এখন যে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে এমন নয়। বরং ঐতিহ্যপ্রেমী শহুরে মানুষও উদ্যাপন করে পৌষ সংক্রান্তি।

পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উৎসব পালন করা হয়। এই দিন বাঙালিরা বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। তার মধ্যে পিঠা খাওয়া, ঘুড়ি উড়ানো অন্যতম। সারাদিন ঘুড়ি উড়ানোব পরে সন্ধ্যায় পটকা ফুটিয়ে ফানুস উড়িয়ে উৎসব করে।

বর্তমানে ব্যস্ত জীবনে পিঠে তৈরির সময় বার করা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে পড়েছে । তাই পিঠের স্বাদ নেওয়ার জন্য শরণাপন্ন হতে হয় নামী রেস্তোরাঁ বা মিষ্টির দোকানের।

কিন্তু এই পিৎজা বার্গারের যুগেও পিঠে পুলি আছে সেই পিঠে পুলিতেই। মায়ের হাতের তৈরি পিঠে পুলি আজও আদি ও অকৃত্রিম, কারণ তাতে মেশানো থাকে আদর, স্নেহ, ভালোবাসার স্পর্শ।

বর্তমানে এ উৎসবে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এদিন সন্ধ্যার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে যায় আতশবাজি ও ফানুস উড়ানো। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব এলাকায় চলে আতশবাজির খেলা। সংক্রান্তিতে কোথাও কোথাও আবার শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো একটি রেওয়াজ। শ্বশুরবাড়ি থেকে ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হয় আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়ার লোকদের মধ্যে।

মূলত জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি ক্ষণ 'মকরসংক্রান্তি' শব্দটি দিয়ে নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়ে থাকে। ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী 'সংক্রান্তি' একটি সংস্কৃত শব্দ। এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। ১২টি রাশি অনুযায়ী এরকম সর্বমোট ১২টি সংক্রান্তি রয়েছে।

পৌষসংক্রান্তি-তে মূলত নতুন ফসলের উৎসব 'পৌষ পার্বণ' উদযাপিত হয়। নতুন ধান, খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় চালের গুঁড়া, নারিকেল, দুধ আর খেজুরের গুড়। মকরসংক্রান্তি নতুন ফসলের উৎসব ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে 'উত্তরায়ণের সূচনা' হিসেবে পরিচিত।

আউনি বাউনি (বানানান্তরে আওনি বাওনি) বা আগলওয়া পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে পালিত একটি শস্যোৎসব। এই উৎসব ক্ষেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে তোলা উপলক্ষে কৃষক পরিবারে পালনীয় অনুষ্ঠানবিশেষ। হেমন্তকালে আমন ধান ঘরে প্রথম তোলার প্রতীক হিসেবে কয়েকটি পাকা ধানের শিষ ঘরে এনে কিছু নির্দিষ্ট আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গে পৌষ সংক্রান্তির দিন দু-তিনটি ধানের শিষ বিনুনি করে 'আউনি বাউনি' তৈরি করা হয়। শিষের অভাবে দু-তিনটি খড় একত্রে লম্বা করে পাকিয়ে তার সঙ্গে ধানের শিষ, মুলোর ফুল, সরষে-ফুল, আমপাতা ইত্যাদি গেঁথে 'আউনি বাউনি' তৈরি করারও রেওয়াজ রয়েছে। এই আউনি বাউনি ধানের গোলা, ঢেঁকি, বাক্স-পেটরা-তোরঙ্গ ইত্যাদির উপর এবং খড়ের চালে গুঁজে দেওয়া হয়। বছরের প্রথম ফসলকে অতিপবিত্র ও সৌভাগ্যদায়ক মনে করে একটি পবিত্র ঘটে সারা বছর ধরে সংরক্ষণ করা হয়। এই আচারটিকেই 'আউনি বাউনি' বলা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় এই দিবস বা ক্ষণকে ঘিরে উদযাপিত হয় উৎসব।

নেপালে এই দিবসটি মাঘি নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে উদযাপিত হয়। প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতেও এই দিনের তাৎপর্য সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। তাই সামাজিক এবং ভৌগোলিক গুরুত্ব ছাড়াও এই দিনটি ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে।

বাংলাদেশের পুরান ঢাকায় পৌষসংক্রান্তি সাকরাইন নামে পরিচিত। ভারতবর্ষের মতো একটি উষ্ণ অঞ্চলে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামপ্রদ সময় শীতকাল। এখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার এবং অন্যান্য উপহার ছাড়াও পৌষমেলার মাধ্যমে পৌষসংক্রান্তি উদ্যাপিত হয়। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বাউল গানের আসর বসে।

ঘুড়ি উড়ানোর জন্য সূতায় মাঞ্জা দিতে সুতা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই দিনটি হিন্দু পঞ্জিকায় ‘মকর সংক্রান্তি’ বা ‘উত্তরায়ণ সংক্রান্তি’ নামেও পরিচিত। প্রাচীন হিন্দুরা এই দিনটিতে পিতৃপুরুষ অথবা বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে তিল কিংবা খেজুড় গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া এবং নতুন ধান থেকে উৎপন্ন চাল থেকে তৈরি পিঠের অর্ঘ্য প্রদান করতেন। এই কারণে পৌষ সংক্রান্তির অপর নাম তিলুয়া সংক্রান্তি বা পিঠে সংক্রান্তি। এই প্রাচীন উৎসবের একটি রূপ অদ্যাবধি পিঠেপার্বণের আকারে বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রচলিত।

মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্যে নানাপ্রকার পিঠে ও পিঠে গড়ার বিচিত্র সব উপাখ্যানের উল্লেখ রয়েছে।

পৌষ সংক্রান্তি ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেও ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ ধারণায় বেড়ে ওঠা বাঙালি জাতির কাছে আজ এটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.


Popular Article from FT বাংলা