June 17, 2024, 4:09 pm


বিশেষ প্রতিবেদক:

Published:
2023-10-04 11:45:11 BdST

প্রানিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন ৪২৮০ কোটি টাকার এলডিডিপি প্রকল্পে হরিলুট


• তদন্তে নামছে মন্ত্রণালয় ও দুদক
• ৫ বছরের প্রকল্পের মেয়াদ আছে মাত্র তিন মাস, অগ্রগতি ৩৫ শতাংশেরও কম
• করোনাকে দুষছেন কর্মকর্তারা

বিশেষ প্রতিবেদক:
বিশ্বব্যাংক ও সরকারের অর্থায়নে ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা ব্যায়ের প্রানিসম্পদ ও ডেইরী উন্নয়ন প্রকল্পে (এলডিডিপি) হরিরলুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৫ বছর মেয়াদী প্রকল্পটির মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে আসলেও লক্ষ্যমাত্রার ৩৫ শতাংশও অর্জিত হয়নি। প্রকল্পের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মৎস ও প্রানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। তবে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের দাবি প্রকল্পে কোন অনিয়ম হয়নি। কোভিড-১৯ মহামারিজনিত কারনে যথাসময়ে ক্রয় কার্যক্রম সম্পাদন ও মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে।
প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে ২০১৯ সালে ৫ বছর মেয়াদে ৪ হাজার ২৮০ কোটি ৩৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকার এলডিডিপি প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এরমধ্যে আভ্যন্তরীণ উৎস (জিওবি) অর্থায়ন ৩৯৪ কোটি ৬৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা ও বিশ্বব্যাংক থেকে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৭৩ লাখ ৭ হাজার টাকা অর্থায়ণ করা হয়। এই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দেশের পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া সকল জেলা, উপজেলা, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা প্রকল্পের আওতাভুক্ত। প্রকল্পের বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রানিজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, মার্কেট লিংকেজ ও ভেলু চেইন সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ প্রানিজ খাদ্য উৎপাদন, গবাদি পশুর উৎপাদন ২০ শতাংশ বৃদ্ধি, প্রাণিবীমা চালুকরণসহ নানা কর্মসুচি। প্রকল্পটির মেয়াদ আছে তিন মাসেরও কম। সংশ্লিষ্টরা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে এফএমডি, পিপিআর ভ্যাকসিনক্রয়, স্কুল ফিডিং ও পশুখাদ্য এবং যন্ত্রপাতিক্রয়সহ বেশকিছু ভুয়া কিছু আইটেম সংযোজনের প্রস্তাব দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রাপ্ত নথি থেকে জানা গেছে, গবাদি পশুর ক্ষুরা রোগ বা এফএমডি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা ব্যায়ে অপর একটি প্রকল্প আছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকার এফএমডি ভ্যাকসিন ক্রয় করা হয়েছে। আরও ১০০ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এলডিডিপি প্রকল্পের অধীনে এমএফডি ও ছাগলের পেস্টি ডেস পেটিটস ইন রুমিন্যন্ট বা পিপিআর ভ্যাকসিন কিংবা সংক্রান্ত কোন আইটেন রাখার প্রয়োজন ছিল না। শুধু লুটপাটের উদ্দেশ্যে এমএফডি ও পিপিআর ভ্যাকসিন ক্রয়ের প্যাকেজ রাখা হয়েছে।
সংশ্লিস্ট নথি বলছে, প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হওয়ার মূল কারণ যথাযথ পরিকল্পনা হাতে না নেওয়া। যাদেরকে এ্ই প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ দেওযা হয়েছে তাদের অধিকাংশই গ্রহনযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. আব্দুর রহিম প্রশাসন ক্যাডারের লোক। তাকে ভুল বুঝিয়ে প্রকল্পের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেন চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. গোলাম রব্বানী। তার সঙ্গে আছেন ড. এবিএম মুস্তানুর রহমানসহ একাধিক দুর্নীতিবাজ ডিপিডি। প্রকল্পের টাকায় চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. গোলাম রব্বানী ৪ বার ইউরোপ সফর করেছেন। স্থানীয় প্রশিক্ষনের নামে ব্যয় করা হয়েছে প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা। বাস্তবে এসব প্রশিক্ষণ কোন কাজে আসেনি। প্রশিক্ষণার্থীদেরও ৮০ শতাংশ টাকা মেরে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে রব্বানীর বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় উপজেলা, জেলা, খামার বা বিভাগীয় দপ্তরে আনুসঙ্গিক ঘাসচাষ, জ্বালানী ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকা অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ ওইসব খাতে রাজস্ব বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এলডিডিপির মাধ্যমে ঘাষ চাষের প্রমাণও পাওয়া যায় না। এলডিডিপির অসাধু কর্মকর্তাদের একটি অংশ চুক্তি করেই পঞ্চাশ শতাংশ নিয়ে আসে। স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) থেকে প্রকল্পে একজন প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ চার বছরে তাকে কোন কমিটিতে রাখা হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে দেওয়া দরপত্রের কয়েকটির নমুনা থেকে বিপুল অনিয়ম ও হরির লুটের প্রমাণ পাওয়া যায়। ডিজি-৫২ নং প্যাকেজে এফএমডি ভ্যাকসিনেশন পোগ্রাম বাস্তাবায়নের জন্য সিরিঞ্জ, নিডেল, কুলবক্স ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য ২০২১ সালৈর ৭ অক্টোবর দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৫ জন ঠিকাদার দরপত্র ক্রয় করে ২ জন দাখিল করে। সেখানে পূর্বনির্ধারিত একজনকে রেসপন্সিভ করা হয়। প্যাকেজ জি ৬৬-২ এর মাধ্যমে ২৪১ মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকের জন্য ছোট ফ্রিজ ও সার্জিক্যাল কিটে ক্রয়ের দরপত্রে ৬ জন অংশ নিলেও একজনকে রেসপন্সিভ করে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়। ৫০ লিটারের ফ্রিজ নেওয়ার আদেশ হলেও সরবরাহ করা হয় ৪৫ লিটারের। যেসব সার্জিক্যাল কিট নেওয়া হয় সেগুলোও ছিল নিম্নমানের।
প্যাকেজ জি ২৮-২৯ এ ফিড কমপ্লিমেন্টারি ক্রয়ের জন্য ৬ জন দরপত্র কিনে ৪ জন অংশ নেয়। পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানকে রেসপন্সিভ করে প্রায় ৫ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্যাকেজ জি-১১৪ এর প্যাকেজ ফিড, মেডিসিন ও ভ্যাকনিস ক্রয়ের জন্য দরপত্রে ৪ প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। পছন্দের ঠিকাদারকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই প্যাকেজেও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
প্যাকেজ জি ১২১ এ সিঙ্গেল ইউনিট মিল্কিং মেশিন ক্রয়ের দরপত্রে ৫ প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও গোলাম রাব্বানীর আত্মীয়কে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তাকে প্রকল্প মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত পণ্য সরবাহের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্যাকেজ জি-৭০-এ কনজুমাবেলস আইটেম ক্রয়ে দরপত্র দাখিল করা দুই জনের মধ্যে পূর্ব নির্ধারিত একজনকে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। জি-৮০-৮১তে ৪৬ ইউনিট লিকুইড সেপারেটর বা গ্যাস জেনারেটর ক্রয়ের জন্যও একইভাবে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। গত ২ আগস্ট মালামাল সরবরাহের মেয়াদ থাকলেও গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাটি মালামাল সরবাহ করেনি। প্যাকেজ জি-৪২ এ ল্যাবরেটরির জন্য কনজুমাবলস আইটেম ক্রয়ের দরপত্র দেওয়া হয়। মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান সেখানে অংশ নেয়। তাদেরকে প্রায় এক কোটি ৬৭ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্যাকেজ ডি-৬২ তে ৬ প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। পছেন্দর প্রতিষ্ঠানকে রেসপন্সিভ দেখিয়ে প্রায় ১২ কোটি টাকার পণ্য সরবরাহের আদেশ দেওয়া হয়। ওই প্রতিষ্ঠানকে ৩ মাসের পরিবর্তে ৫ মাস সময় দেওয়া হয়।
প্যাকেজ জি-১৫-এর দরপত্রে অংশ নেওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটিকে রেসপন্সিভ দেখিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ঠিকাদার জনৈক ডিপিডির আত্মীয়। তাকে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ২৫ দিন পরে পর্যন্ত পণ্য সরবরাহের সময় সীমা দেওয়া হয়। যা বিধি সম্মত নয়।
নথি থেকে জানা যায়, ডিপিপির ব্যর্থয় ঘটিয়ে ক্রয় কমিটির অনুমোদন না নেওয়ার কৌশল হিসেবে একই আইটেমের জন্য ৩টি প্যাকেজ করা হয়েছে। প্যাকজ নং ৯৮, ৯৮-এ ও ৯৯; যা আর্থিক বিধির সুষ্পষ্টলংঘন। প্রতিটি প্যাকেরজ মূল্য ৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা করে ৩ প্যাকেজে ১১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার কাজ দেওয়া হয়। অথচ এই পরিমান কার্যাদেশের জন্য মন্ত্রী পরিষদের ক্রয় কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। প্যাকেজ জি-৬২ এ উপজেলা মিনি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ল্যাবের জন্য কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়ের আদেশ দেওয়া হয়। গত এপ্রিলে আহ্বান করা দরপত্রে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। কয়েকটি বাদে অধিকাংশ ল্যাব ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় কোটি কোটি টাকার দরপত্র বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। প্যাকেজ ৬৬ (২)-এর মাধ্যমে যেসব কার্যাদেশ দেওয়া হয় সেখান সংগ্রহ করার পণ্য স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী হয়নি। প্রায় ২০ কোটি টাকার মিল্ক সেফারেটর মেশিন ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ক্রয় ও সরবরাহ করা করা হয়েছে। মেশিনগুলো ব্যবহারের অনুপোযোগী। স্টিকার মারা মেশিনগুলো খুবই নিম্নমানের। গোলাম রব্বানী গংরা ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ আদায় করেছন। প্রকল্পের প্রতিটি কাজেই ওভার স্টেমেট করা হয়েছে। কোন ধরনের সুপারভিশন ছাড়াই কোন ক্ষেত্রে নির্মাণ কাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, চিফ ট্যাকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. গোলাম রব্বানীসহ সংশ্লিষ্টর প্রকল্পে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে ‘আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ’ হয়েছে। তাদের অনেকেই নামে বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছ। তাদের ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব নিলেই বিষয়গুলোর প্রমাণ পাওয়া যাবে।
প্রকল্পে দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এই প্রকল্পে কোন অনিয়ম হয়নি। করোনার লকডাউনজনিত কারনে ক্রয় সম্পাদক ও মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যম ৫ হাজার ২৯৩টি খামারি গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৬ লাখ খামারিকে ৬৯৮ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা প্রনোদনা দেওয়া হয়েছ। ৩৬০টি মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক বা এমভিসি ক্রয় করা হয়েছে। ২৩৮ উপজেলায় প্রশিক্ষণ কক্ষ নির্মাণ ও ৬টি সরকারি খামার সংস্কার করা হয়েছে। ২০২২ এর হিসেবে প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি ছিল ৩০ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও বর্তমানে তা ৩৫ শতাংশর মতো।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.


Popular Article from FT বাংলা