January 29, 2026, 4:12 pm


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-01-29 13:48:25 BdST

থাইল্যান্ড ও ফ্রান্সে বসে মানবপাচারে নেতৃত্ব দিচ্ছে দুই বাংলাদেশীলন্ডন থেকে লরিতে ফ্রান্সে পাচার: ২৩ বাংলাদেশি উদ্ধার


লন্ডন থেকে লরিতে করে ফ্রান্সে পাচারের চেষ্টাকালে ২৩ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করেছে ব্রিটিশ ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। ডোভার বন্দরে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে এই উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়। একই সঙ্গে পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয়েছে।

বুধবার ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসির সংবাদে বলা হয়েছে, ডোভার সীমান্তের ফেরি বন্দরের কাছে এনসিএর একটি বিশেষ অভিযানে মানবপাচার চক্রের এই কৌশল ফাঁস হয়। এসময় একটি লরি তল্লাশি করে ২৩ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২২ জনই যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাস করছিলেন, তবে ফ্রান্সের কঠোর প্রবেশ বিধিনিষেধ এড়াতে তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। অভিযানে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হিসেবে নিউ ক্রসের ৪৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার কাছ থেকে ৩০ হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করা হয়।

এনসিএর কর্মকর্তারা বলেছেন, এই চক্রটি দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে অভিবাসী পাচারে জড়িত ছিল এবং বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছিল।

তদন্তে আরও জানা গেছে, মানব পাচার চক্রটির শিকড় টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মহলের ভেতরে গভীরভাবে বিস্তৃত। চক্রের একাধিক সদস্য কাগজে-কলমে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করলেও বাস্তবে তারা স্ত্রী ও নিকট আত্মীয়দের নামে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

এই ব্যবসাগুলোর আড়ালে মানব পাচারের অর্থ লন্ডারিং করে তারা গত ১৫ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হন। একটা সময় সাধারণ দোকানদার হিসেবে পরিচিত এসব ব্যক্তি এখন তদন্তকারীদের কাছে ‘ছদ্মবেশী কোটিপতি’ হিসেবে পরিচিত।

এই পাচার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল লন্ডনের একদল প্রাইভেট ট্যাক্সি চালক। সম্প্রতি এক অভিযানে ৪৩ থেকে ৫৫ বছর বয়সী তিনজন ট্যাক্সি চালককে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের কাজ ছিল লন্ডনের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিবাসীদের সংগ্রহ করে কেন্টের হুইটস্টেবল এলাকার একটি গোপন স্থানে পৌঁছে দেওয়া। সেখান থেকে অভিবাসীদের লরিতে তুলে ডোভারে নেওয়া হতো। প্রাইভেট ট্যাক্সি ব্যবহারের মাধ্যমে চক্রটি দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়।

এনসিএ বর্তমানে প্রায় ১০০টি গুরুতর অভিবাসন সংক্রান্ত অপরাধের তদন্ত চালাচ্ছে। তবে টাওয়ার হ্যামলেটসকেন্দ্রিক এই মানব পাচার চক্রটি সংস্থাটির জন্য সবচেয়ে বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে, লন্ডনভিত্তিক এই চক্রকে ফ্রান্সে বসবাসরত ইউনুস নামে এক বাংলাদেশী সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের মতে, ইউনুস নিজেকে জাতিসংঘের মানবাধিকারকর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তিনি মূলত অবৈধভাবে ফ্রান্সে আসা ব্যক্তিদের শরনার্থী কোটায় বৈধভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়ার বিনিময়ে বিপুল অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন। আর এই কাজে তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে আসছে থাইল্যান্ডে অবস্থানরত এক বাংলাদেশী নাগরিক।

সূত্র মতে, থাইল্যান্ডে বসবাসরত ঐ ব্যক্তি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম সদস্য। এই ব্যক্তি তার আপন সহোদরের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অনেক যুবককে ইউরোপে উচ্চ বেতনে কাজের লোভ দেখিয়ে পাচারের উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ফ্রান্স, স্পেন, আলবেনিয়া সহ একাধিক দেশের জাল ভিসা ও ভুয়া টিকিট করে তাদের ব্যাংকক বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত পাকিস্তানি একটি চক্রের সাথে যোগসাজশ করে বাংলাদেশী নাগরিকদের পাচারের চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে প্রায়শই তারা ইমিগ্রেশন পার হতে ব্যর্থ হয়। সেক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের বিমানবন্দরে ফেলে রেখেই সটকে পটে এই চক্র। আর কেউ যে কোন উপায়ে ইমিগ্রেশন পার হতে সক্ষম হলে উল্লেখিত দেশগুলোতে অবস্থানরত সহযোগীদের মাধ্যমে তাদেরকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। নিজেদের আস্তানায় রেখে পাচারকৃতদের কোন রকম একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিয়ে হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের অর্থ।

এই চক্রের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন যে, ইউনুস এবং তার কয়েকজন সহযোগী থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নেপাল ও  শ্রীলঙ্কায় বসে ল্যাটিন আমেরিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং থাইল্যান্ড থেকে ইউরোপের সেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে  মানব পাচার করে আসছে। এক্ষেত্রে, অধিকাংশ ব্যক্তিকে পাচার করতে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে থাকে তারা।

বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে এই চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম পরিচয় ইতিমধ্যে এফটি টীমের হাতে এসেছে। ভুক্তভোগী কয়েকজন এরইমধ্যে এই প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করেছেন। তাদের কাছ থেকে জানা গেছে এই চক্রটি অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর নাম করে অনেকের কাছ থেকে কয়েক শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই বিষয়ে 'দ্যা ফিন্যান্স টুডে'র বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আগামী পর্বে প্রকাশিত হবে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.