February 2, 2026, 5:19 pm


মোস্তফা কামাল আকন্দ

Published:
2026-02-02 15:34:07 BdST

সাঁতার জানে না ৯৯ শতাংশ শিশুপানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু: কুতুবদিয়া ও ভোলার বাস্তবতা বলছে প্রতিরোধ এখনই জরুরি


প্রতিবছর ‘‘২ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস‘’। দিবসটি সামনে রেখে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও ভোলার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্র।

বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে উদ্বেগজনক যে তথ্য এবার সামনে এসেছে তা হলো, প্রতি বছর বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর বেশিরভাগই হয় বাড়ির পাশের পুকুরে। এছাড়া, বাংলাদেশে সাঁতার জানে না ৯৯ শতাংশ শিশু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হলেও সময়মতো ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে এসব মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলায় গত ছয় বছরে অন্তত ২৯৪ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক জরিপে। নিহত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশের বয়স ০ থেকে ৫ বছরের মধ্যে।

জরিপে দেখা যায়, উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশেই পুকুর, ডোবা বা জলাশয় রয়েছে, যা শিশুদের জন্য স্থায়ী ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশই বাড়ির পাশের পুকুর বা ডোবায় পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশু সাঁতার জানত না।

অভিভাবকদের সাময়িক অসতর্কতা, শিশুদের একা রেখে দেওয়া এবং কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবকে এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্ষা মৌসুমে জলাশয়ে পানি বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিশেষ করে দুপুর থেকে বিকেল সময়টিকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যখন অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের নজরদারি শিথিল থাকে।

একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে ভোলা জেলাতেও। বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ভোলায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন শিশু এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২ জন শিশুর মৃত্যু ঘটে এই দুর্ঘটনায়।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পানিতে ডুবে যাওয়া বর্তমানে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান দুর্ঘটনাজনিত কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু কোনো অনিবার্য ঘটনা নয়। তাদের মতে, তিনটি উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এগুলো হলো—

১) পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সমাজভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্র

২) ছয় থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ

৩) অভিভাবক ও কমিউনিটির মধ্যে ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি।

সিআইপিআরবি এর সুইমসেফ ও প্রজেক্ট ভাসা'র তথ্য ও কার্যক্রমকে সামনে রেখে ভোলা জেলার ভোলা সদর, লালমোহন ও মনপুরা উপজেলায় ৫০টি সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ২০ হাজারের বেশি শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ৫০০টি সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে কোস্ট ফাউন্ডেশন কুতুবদিয়া উপজেলায় বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস ২০২৫ উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি, সাঁতার শিক্ষার গুরুত্ব এবং অভিভাবকদের করণীয় বিষয়ে আলোচনা ও প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কুতুবদিয়া ও ভোলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় এসব উদ্যোগ টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি এবং অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, প্রতিটি পানিতে ডুবে মৃত্যু একটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু—সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই নীরব সংকট থামাতে।

লেখক একজন উন্নয়ন বিশ্লেষক ও নীতি গবেষক

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.