আব্দুর রহিম
Published:2026-02-28 13:02:28 BdST
ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে ১এক্সবেট জুয়ার ফাঁদ কক্সবাজারে ‘তাজ বুকিং বিডি’র মাধ্যমে কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ !
কক্সবাজারে ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে ১এক্সবেট (1xBet) জুয়ার ফাঁদ পেতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র। চক্রটি 'তাজ বুকিং বিডি ডট কম' নামক অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জুয়ার টাকা দেশের বাইরে পাচার করছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
এই চক্রের প্রধান হোতা আকরামুল বাশার চৌধুরীর কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর না দিয়ে উল্টো এই প্রতিবেদককে আইসিটি আইনে মামলার হুমকি দেন। পরবর্তীতে যাবতীয় প্রমাণাদি কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
জানা যায়, লোভনীয় সব বিজ্ঞাপনে মোহিত হয়ে অনেকেই ঘর-বাড়ী বিক্রি করেও এই জুয়ার খেলায় টাকা লাগাচ্ছেন। প্রথমে কিছু টাকা লাভ হলেও পরবর্তীতে শুন্য হাতে ফিরতে হয়। চলমান অনুসন্ধানের এটি একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সামনে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে।
যেভাবে চলছে জুয়া ও পাচার
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশব্যাপী অনলাইনে চলছে ১এক্সবেট জুয়ার রমরমা ব্যবসা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অতি লোভে পড়ে টাকা খোয়াচ্ছেন। দেখতে পরিপাটি একটি ট্রাভেল ও ট্যুরিজম এজেন্সির ওয়েবসাইট 'তাজ বুকিং বিডি ডট কম', যাদের প্রধান কার্যালয় দাবি করা হচ্ছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের কলাতলীতে। দেশ-বিদেশের এয়ার টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের লোভনীয় সব অফার দিয়ে সাজানো হয়েছে ওয়েবসাইটটি। কিন্তু বাস্তবে সাইটটিতে কোনো বুকিং করা যায় না, এমনকি তাদের ফেসবুক পেজে ফলোয়ার রয়েছে মাত্র দুই জন!
দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এটি কোনো ট্রাভেল এজেন্সি নয়; বরং এর আড়ালে চলছে আন্তর্জাতিক নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম '১এক্সবেট'-এর রমরমা ব্যবসা। জুয়ার সাইট ১এক্সবেটে টাকা ডিপোজিট করতে গিয়েই আকরামুলের এই প্রতারণার ফাঁদ ধরা পড়ে। জুয়াড়িরা যখন ১এক্সবেটে টাকা ঢোকাতে মোবাইল ব্যাংকিং 'নগদ' (Nagad) নির্বাচন করেন, তখন পেমেন্ট কনফার্ম করার সময় গ্রাহকের স্ক্রিনে মার্চেন্ট হিসেবে ভেসে ওঠে "TAZ BOOKING BD DOT COM"-এর নাম।
মূলত প্রশাসনকে ধোঁকা দিতেই ভুয়া ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে ট্রাভেল এজেন্সির নাম ব্যবহার করে বিকাশ, নগদ, রকেট ও কয়েকটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হচ্ছে।
সাংবাদিকের জেরার মুখে হোতা আকরামুলের আস্ফালন
অকাট্য প্রমাণ হাতে আসার পর চক্রের হোতা আকরামুল বাশার চৌধুরীর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করে 'দৈনিক বর্তমানদিন' পত্রিকা। এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে জুয়ার লেনদেনের স্ক্রিনশট ও প্রমাণাদি পাঠালে তিনি চরম অসংলগ্ন আচরণ শুরু করেন।
প্রথমে তিনি পেজ ও সাইটের মালিকানা স্বীকার করলেও, জুয়ার প্রমাণ দেখার পর তা অস্বীকার করেন। নিজেকে বাঁচাতে নিত্যনতুন গল্প ফেঁদে একবার বলেন, "আমার স্টাফরা জড়িত থাকতে পারে", পরক্ষণেই বলেন, "আমার শত্রুপক্ষরা কেউ এই কাজ করেছে।" নিজের আসল ব্যবসা হিসেবে তিনি "দূরবীন ডট কম" নামের একটি সাইটের কথা বলেন, যা অনুসন্ধানে দেখা যায় সার্ভার থেকে সম্পূর্ণ সাসপেন্ডেড।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে 'দৈনিক বর্তমানদিন'-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে নিজের অফিসিয়াল ভিজিটিং কার্ড পাঠালেও আকরামুল বাশার চরম ঔদ্ধত্য দেখান। দাম্ভিকতার সাথে তিনি বলেন, "আমি তো আপনাকে চিনি না, এটা তো ভিজিটিং কার্ড, আগে আইডি কার্ড দেন।" উল্টো নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি প্রতিবেদককে আইসিটি আইনে মামলার হুমকি দিয়ে বলেন, "রবিবার আইসিটি অ্যাক্টে মামলা করে দিচ্ছি, আমার লইয়ার সব ব্যবস্থা নিচ্ছে।"
শেষ প্রশ্নের উত্তর দেননি, জুয়ার সাইট থেকে সরালেন নম্বর!
সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠ নিয়ম অনুযায়ী সংবাদ প্রকাশের আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অভিযুক্ত আকরামুল বাশারকে শেষবারের মতো লিখিতভাবে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। কেন জুয়ার সাইটে তার প্রতিষ্ঠানের নাম দেখাচ্ছে এবং কক্সবাজারের কলাতলীতে অফিসের কোনো অস্তিত্ব না থাকায় তার কাছে অফিসের সঠিক ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়।
কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তর দেননি। বরং হোয়াটসঅ্যাপে উত্তেজিত হয়ে লেখেন, "আপনার কি মাথা খারাপ হলো নাকি... শুধু শুধু আমাকে হুমকি দিচ্ছেন কেন।"
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সাংবাদিকের এই জেরার পরপরই ১এক্সবেট সাইটের ডিপোজিট অপশন থেকে 'তাজ বুকিং বিডি'র নগদ মার্চেন্ট নম্বরটি রাতারাতি উধাও হয়ে যায়!
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং প্রমাণ নষ্ট করতেই তড়িঘড়ি করে জুয়ার সাইট থেকে পেমেন্ট গেটওয়েটি সরিয়ে নিয়েছেন এই জুয়ার এজেন্ট। যা তার অপরাধের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করে।
প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি
যেহেতু তিনি কক্সবাজারের ঠিকানা ব্যবহার করছেন, তাই বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইলিয়াস খান-এর সাথে যোগাযোগ করা হয়। জুয়া ও যাবতীয় ডকুমেন্টস, ডিজিটাল প্রমাণাদি ওসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচারের ঘটনায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল এবং সিআইডি-র দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশব্যাপী চলমান অনুসন্ধানের ক্ষুদ্র অংশ
'তাজ বুকিং বিডি'র নামে ১এক্সবেটের জুয়ার লেনদেনের স্ক্রিনশট, আকরামুল বাশারের সাথে কথোপকথনের রেকর্ড এবং যাবতীয় ডিজিটাল প্রমাণাদি 'দৈনিক বর্তমানদিন'-এর সম্পাদকীয় দপ্তরে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশব্যাপী অনলাইন জুয়া ও মানি লন্ডারিংয়ের বিশাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। কক্সবাজারের এই ভুয়া ট্রাভেল এজেন্সির ঘটনাটি আমাদের অনুসন্ধানের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। জুয়ার আড়ালে কোটি টাকা পাচারকারী রাঘববোয়ালদের মুখোশ উন্মোচনে আমাদের এই অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
বি:দ্র: 'দ্য ফিন্যান্স টুডে' এবং 'দৈনিক বর্তমানদিন' সহযোগী প্রতিষ্ঠান
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
