বিশেষ প্রতিবেদক
Published:2026-03-19 00:32:50 BdST
গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগসংসদে ‘৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার’ সাউন্ড সিস্টেম অচল, হেডফোনে শব্দ বিভ্রাট
দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনেই ঘটে গেল প্রযুক্তিগত বিপর্যয়। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা নতুন সাউন্ড সিস্টেম এবং হেডফোন ব্যবস্থায় মারাত্মক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অধিবেশন চলাকালে মাইক কাজ করেনি, স্পিকারকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়েছে আর সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেছেন নিম্নমানের হেডফোন ব্যবহারের ফলে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা শুরু হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ করেই সাউন্ড সিস্টেমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। স্পিকার মাইকে কথা বললেও তা স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সংসদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হন স্পিকার। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে অধিবেশন পরিচালনা করতে হয়। এ সময় প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়। বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উপস্থিত সংসদ সদস্যদের
এই ঘটনার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন এমন বিপর্যয় ঘটলো।
“হেডফোনে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা”: সংসদ সদস্যদের অভিযোগ
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাশেম (ব্যারিস্টার আরমান) সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান এতটাই খারাপ যে এটি ব্যবহার করতে গিয়ে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা শুরু হয়েছে। সাউন্ড কোয়ালিটিও অত্যন্ত নিম্নমানের।”
তিনি আরও দাবি করেন, সংসদের পুরোনো ডিভাইসগুলোও সম্ভবত এর চেয়ে পরিষ্কার অডিও দিত। বিষয়টি তাকে হতাশ করেছে বলেও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘হেডফোনের জন্য মনে হয় একটা বাজেট করেছিল, আর ওখান থেকে লুটপাট বাহিনীরা একটা বিল করে খাওয়ার জন্য এ ব্যবস্থা করেছেন। সাউন্ড সিস্টেমটা সুন্দর করার জন্য একটি সাধারণ হেডফোন দিলে আমরা শুনতে পাব। কিন্তু এত বড় বোঝার দরকার নেই। হেডফোন ছাড়াও সংসদের সাউন্ড সিস্টেমটা আধুনিকায়ন করলে খুশি হব’।
১৫ই মার্চ (মঙ্গলবার) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত (পয়েন্ট অব অর্ডার) আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন। এ সময় স্পিকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আমরা তো আরও দুবার সংসদে এসেছি, আপনিও এসেছেন। কিন্তু এত বড় একটা (হেডফোন দেখিয়ে) বোঝা মাথার ওপর দিয়ে এক-দুই ঘণ্টা বসা সবার জন্য কষ্টকর হচ্ছে।
এছাড়া, অধিবেশন চলাকালে আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, তাদের ব্যবহৃত হেডফোন ঠিকভাবে কাজ করছিল না। স্পিকারের মাইকও বন্ধ! ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ করেই মূল সাউন্ড সিস্টেমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়।
নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দিতে গিয়ে দেখেন মাইক কাজ করছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেও শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তাকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়। স্পিকার তখন বলেন, “যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কথাবার্তা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না। সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।” পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। বিরতির পর আবার অধিবেশন শুরু হয়।
পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গাফিলতির চরম অভিযোগ
সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলী—অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশরাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সংসদ অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সাউন্ড সিস্টেম চালুর আগে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ দিন নিবিড় পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়া ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকৌশলীরাই সাউন্ড সিস্টেম কেনা ও স্থাপনের পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করেছেন।
উল্লেখ্য, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক এর আগেও ২০১৮ সালে সংসদ ভবনের দায়িত্বে ছিলেন। তখন অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটেছিল।
অনভিজ্ঞ ঠিকাদারকে কাজ!
সংসদের হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপনের কাজ পেয়েছে আমানত এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
সূত্র বলছে, এই প্রতিষ্ঠানের আগে সংসদ ভবনে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন সংসদের অডিও সিস্টেমের কাজ করা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডকে বাদ দিয়ে নতুন এই ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান জোয়ারদার বলেন, “আমরা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে সিস্টেম পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। কিন্তু সুকৌশলে আমাদের বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।”
কোটি টাকার কাজ, দায় নিতে কেউ রাজি নয়
গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, সংসদে এসি, আলো, মাইক্রোফোন ও অডিও সিস্টেমসহ প্রায় ১২ কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। গুজনেক মাইক্রোফোনের দাম ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং হেডফোনের দাম প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।”
এদিকে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় স্বীকার করতে রাজি নন কেউই। এই বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “হেডফোন ও মাইক্রোফোন কাজ করেনি—এটা শুনেছি। কিন্তু বিস্তারিত জানি না। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এই বিষয়ে জানেন।”
অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা সরাসরি বলেন, “এর দায় আমার না। তাই এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না।”
প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ’?
এই বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরেকটি ঘটনা। সংসদে প্রযুক্তিগত ত্রুটির অভিযোগ যেসকল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উঠেছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (HVAC) রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণে আটজন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হক, উপসচিব মো. নাজমুল আলম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান, প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাজু আহমেদ, নির্বাহী স্থপতি সিদ্দিকা নাসরিন সুলতানা এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রিসালত বারী। এই সফরের সব ব্যয় বহন করবে ‘ডানহাম–বুশ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, “এই সফরের সব ব্যয় বহন করবে ‘ডানহাম–বুশ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের টাকায় বিদেশ যাওয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই।”
এটি স্বার্থের দ্বন্দ্ব: টিআইবি
এউ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কোম্পানির টাকায় বিদেশ যাওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সমস্যা। এতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।”
তার মতে, বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমেই প্রযুক্তিগত অনেক তথ্য জানা সম্ভব। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব সফর বাস্তবে প্রশিক্ষণের চেয়ে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
সচেতন মহলের প্রশ্ন
জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোটি টাকার নতুন সাউন্ড সিস্টেম প্রথম অধিবেশনেই অচল হয়ে পড়ার ঘটনা সামনে আসার পর থেকে প্রশাসনিক মহল, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে এমন প্রযুক্তিগত বিপর্যয়কে অনেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম বসিয়েও উদ্বোধনী অধিবেশনেই মাইক অচল, হেডফোনে অভিযোগ, অধিবেশন স্থগিত— এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো ?
সচেতন মহলের প্রশ্ন— এটি কি শুধুই প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নাকি কমিশন–নির্ভর ঠিকাদারি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফল? নাকি সুনিপুণ কোনো দুরভিসন্ধী?
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
