May 4, 2026, 2:42 am


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-04-14 21:56:12 BdST

৩ কোটি টাকা দিয়ে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি, ২০ কোটি টাকার সম্পদসাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের এত সম্পদের উৎস কি?


সাভারের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অস্বাভাবিক পরিমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, মাত্র ৯ বছরের চাকরি জীবনে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে।

সূত্র মতে, টাঙ্গাইল জেলার মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান জাকির হোসেন ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তীতে লক্ষীপুরের কমলনগর, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এবং হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় দায়িত্ব পালন শেষে তিনি সাভারে পদায়ন পান। সব মিলিয়ে মাত্র ৯ বছরের চাকরি জীবন। অথচ এই অল্প সময়েই দুর্নীতির সংজ্ঞাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।

৩ কোটি টাকায় বদলী

আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বদলি হতে জাকির হোসেন তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগত সহকারী শামসুদ্দিন মাসুমকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দেন। যদিও এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাভারে আসার আগে জাকির হোসেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এক অদৃশ্য জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তিনি সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ (দুর্নীতির আখড়া হিসেবে পরিচিত) একটি স্টেশনে বদলি হন।

অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন আইন উপদেষ্টার পিএস শামসুদ্দিন মাসুমকে ৩ কোটি টাকা দিয়ে এই বদলি নিশ্চিত করেন তিনি। শামসুদ্দিন মাসুমের বাড়ি বানিয়াচং হওয়ায় সেখানে কর্মরত থাকাকালীনই মাসুমের পরিবারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন জাকির। সেই ‘ঘনিষ্ঠতা’ এবং ‘বিনিময়’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সাব-রেজিস্ট্রার সমিতির নেতাদের অবাক করে দিয়ে সাভারে পদায়ন পান তিনি।

অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন

সাভারের বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়া এবং পাহাড়সম অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাসিক ৫০ হাজার টাকার কম বেতনে চাকুরীরত এই কর্মকর্তা গত এক বছরে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ২০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ গড়েছেন।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনুসন্ধানী গনমাধ্যম 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র একটি চৌকস টীম এই বিষয়ে নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়ে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী মনিরা সুলতানার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। এছাড়া, রাজধানীর পাশাপাশি নিজের গ্রামের বাড়িতে জাকির হোসেন কয়েক দাগে নিজের নামে এবং অন্য নামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। সূত্র মতে, এসব সম্পদের একটি অংশ নিজের আত্মীয়স্বজনের নামেও কিনেছেন চতুর জাকির।

জাকিরের হোসেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাহমহল রোডে প্রায় ২৫০০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা) ক্রয় করেন। পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ৫ কাঠা জমি ক্রয় করে সেখানে ১০ তলা একটি ভবন নির্মাণ করছেন, যার সম্ভাব্য মূল্য ৬ কোটি টাকারও বেশী।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলখ্যাত তেলিনা এলাকায় জাকির হোসেনের ৫৪ শতাংশ জমি রয়েছে। সরকারি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে যার মূল্য দলিলে দেখানো হয়েছে ৩০ লক্ষ ৫৫ লাখ টাকা। অথচ উক্ত জমির বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য কয়েক কোটি টাকারও বেশি।

এছাড়া, তেলিনা এলাকায় তিনি দোতলা একটি মার্কেটসহ ১১ শতাংশ জমি ক্রয় করেন যেখানে ৩০ থেকে ৪০টি দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের জমি দখল করে এই মার্কেট ও একটি বাংলো বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।

তেলিনা এলাকার অন্যত্র তিনি সাড়ে ৮ শতাংশ জমি কিনেছেন যার মূল্য দলিলে ৩ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হলেও বর্তমান মূল্য আরও বেশী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

জাকির হোসেন মির্জাপুর উপজেলার বাওয়ার কুমারজানি মৌজার পৌর মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় কিনেছেন ১ বিঘা জমি ৫ কোটি টাকা দিয়ে। পাশাপাশি প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পোল্ট্রি খামার গড়ে তোলা হয়েছে।

এছাড়াও, শ্বশুরবাড়িতে নিজের স্ত্রী, শ্বশুর ও শাশুড়ীর নামে জাকির কয়েক একর জমি কিনেছেন যার মধ্যে ৩ একর জমিতে একটি মাছের ঘেরও করেছেন এবং অন্যত্র গবাদিপশুর একটি খামার তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও, জাকির হোসেনের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য প্রায় ১ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল গাড়ি (ঢাকা মেট্রো- জিএ ২৫-২১২৭) এবং তার স্ত্রীর জন্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের আরেকটি গাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।

দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে প্রশ্ন

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেও কোনও অগ্রগতি না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিছু মহলের দাবি, জাকির হোসেনের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য দ্য ফিন্যান্স টুডে সহ একাধিক গনমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সত্বেও দুদকের তদন্ত প্রক্রিয়া রহস্যজনক কারনে থমকে আছে। যদিও দুদকের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে কথা বলতে সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে, সাভারের এই বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র নিবিড় অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এনিয়ে বিস্তারিত আগামী পর্বে প্রকাশিত হবে।

সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনরত একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে এত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগেরর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকার দিকে এখন নজর সবার।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.