May 8, 2026, 7:35 am


শাহীন আবদুল বারী

Published:
2026-05-08 06:15:15 BdST

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমএসআর দরপত্রে নজিরবিহীন দুর্নীতি!পরিচালক কুদ্দুস সাধু সন্ন্যাসী


৫০০-শয্যা বিশিষ্ট টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মোঃ আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে আওয়ামী দোসর এই পরিচালক নিজেকে পরিচ্ছন্ন মানুষ দাবি করলেও এই হাসপাতালে সেবা প্রদানে নিয়োজিত অধিকাংশ চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী এবং হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকার অধিকাংশ মানুষ তাকে দুর্নীতির বরপুত্র বলেই আখ্যায়িত করে।

বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মোঃ আব্দুল কুদ্দুসের ডান হাত হচ্ছে স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক এবং বাম হাত হিসাবরক্ষক মজনু। এই দুইজন ছাড়াও কুদ্দুসের নেতৃত্বাধীন এই সিন্ডিকেটের আরও সদস্য রয়েছে।

মোটকথা, সেবার নামে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলছে হরিলুট কারবার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই ব্যাপারে উদাসীনতা এবং নীরবতা দেখানোর কারণে দুর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তারা পাহাড়সম অপরাধ করেও রয়েছেন বহাল তবিয়তে। কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকির অভাবে সরকারি এই হাসপাতালে সেবার মান ক্রমেই নিম্নমুখী আকার ধারণ করছে। এ যেন দেখার কেউ নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক পদে যোগদান করেন ডাঃ মোঃ আব্দুল কুদ্দুস। অদম্য এই পরিচালকের নেতৃত্বেই হাসপাতালটিতে আওয়ামী চক্রের স্বার্থ হাসিলে গড়ে ওঠে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।কুদ্দুসের যোগদানের পর ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য বিভিন্ন সামগ্রী, যন্ত্রপাতি এবং ঔষধ (মেডিকেল, সার্জিক্যাল এবং রিজেন্টস -- এমএসআর) সংগ্রহে একটি পাতানো দরপত্রের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের মনোনীত ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার অভিযোগ উঠে।

যদিও নিয়মানুযায়ী, পিপিএ ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ (সংশোধিত ২০২১) অনুসরণ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (OTM) বা কোটেশনের মাধ্যমে এই দরপত্র আহ্বান এবং যাচাই-বাছাই করে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে সেটি করা হয়নি। তবে পরিচালকের দাবি, দরপত্র হয় ইজিবির মাধ্যমে। তাই অনিয়মের সুযোগ নেই। 

কিন্তু ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরেও একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন গুণধর এই পরিচালক। ২০২৫-২০২৬ সালে এমএসআর দরপত্র নিয়ে ঘটে বড় ধরনের এক জালিয়াতি। টেন্ডার জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগে ৪টি মামলা করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এরমধ্যে তদারকির অভাবে দুইটি মামলা হাইকোর্ট থেকে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এসব সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সরকার। বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীরা। হয়রানির শিকার হচ্ছেন রোগিদের স্বজনরা। অন্যদিকে মেধাবী, সৎ,যোগ্য ও নিষ্ঠাবান ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীরা দুর্নীতিবাজদের প্রভাবে ক্রমেই পেশার মর্যাদা থেকে ছিটকে পড়ছেন।

পরিচালক ডাঃ মোঃ আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে আইন ও বিধিবহির্ভূতভাবে উন্মুক্ত দরপত্র বাতিল করে মাছরাঙ্গা এন্টারপ্রাইজকে হাসপাতালের জন্য আউটসোর্সিংয়ে জনবল সরবরাহের দায়িত্ব দেয়া হয়। এছাড়া,খাবার সংক্রান্ত দরপত্র থেকে ৫ লাখ, ল্যমরোজ কপি (মেশিন ক্রয়) বাবদ প্রায় দুই কোটি টাকা বাণিজ্য করেছেন মেসার্স তুষী এন্টারপ্রাইজ থেকে। মেশিন ক্রয় দেখানো হয় ২৬ জুন। আর একমাস পর ২৮ জুলাই সার্ভিসিং করা হয়। হালে এই মেশিনটি দিয়েছেন কোন এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এছাড়াও, হাসপাতালের জন্য স্টেশনারি ও কম্পিউটার ক্রয়ে ৪০ লাখ টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পরিচালকের বিরুদ্ধে। অফিসের জন্য নিম্নমানের ফার্নিচার ক্রয় করার অভিযোগটিও সামনে এসেছে।

কথিত আছে যে, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ডিসি অফিসের এক কর্মকর্তাকে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রফাদফা করা হয়। এসব বিষয়ে হাসপাতাল পরিচালক ডাঃ মোঃ আব্দুল কুদ্দুসের বক্তব্য স্পষ্ট। এসব কিছু দেখার দায়িত্ব তার নয়, এগুলো প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পই এর দায়-দায়িত্ব বহন করবে।

পরিচালকের নেতৃত্বে হাসপাতালের 66>অডিট রিপোর্টে বড় ধরনের কারচুপি ও ঘাবলা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অডিট অফিসার নূরে আলম ও পার্থকে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারের রাজস্ব ঠকিয়ে নিজেদের আখের গোছানো হয় বলে ওই সময় অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এই বিষয়ে সঠিক তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের কতিপয় কর্মকর্তা দাবি করেন।

তাদের মতে, নিয়ম অনুযায়ী একজন পরিচালকের ৫ লাখ টাকার কেনাকাটার সক্ষমতা রয়েছে। এই ৫ লাখ টাকার কেনাকাটা (আরএফকিউ) টেন্ডার বিহীন হয়। এখানেও হয়েছে প্রচুর অনিয়ম এবং দুর্নীতি। তাছাড়া বছরে ২৫ লাখ টাকা কেনাকাটার সক্ষমতা রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। সেখানে এক কোটি ৮৮ লাখ টাকা কেনাকাটা করা হয়েছে। ব্লাড ব্যাংকে টেন্ডার নিয়ে করা হয়েছে পুকুর চুরি। যেখানে একটি ফ্রীজের মূল্য ত্রিশ হাজার টাকা। আর ধরা হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। এভাবে প্রতিটি সেক্টরে অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে পরিচালকের নেতৃত্বে।।

কে এই স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু?

ডাঃ মোঃ আব্দুল কুদ্দুসের অন্যতম হাতিয়ার স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল হক ফারুককে ৮ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে দেলদুয়ার উপজেলা কমপ্লেক্স হসপিটালে চাকরি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সেতুর বিরুদ্ধে। চাকরিতে নিয়োগের পর তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হসপিটালের দায়িত্বপ্রাপ্ত এইচ এন এফ পিও ড. প্রবীর কুমারের নেতৃত্বে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন মোজাম্মেল হক। সেখানে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার   পর ২০২১ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন অর্থলোভী এই সেতু।

এরপর ২০২১ সালেই টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি হোন মোজাম্মেল হক। সেখানেও আওয়ামী লীগের এক নেতার তদবিরে দায়িত্ব পান স্টোর কিপারের। জয়েন্ট করেই হাসপাতালে আধিপত্য বিস্তার করেন মোজাম্মেল হক। তিনি দেলদুয়ার উপজেলা কমপ্লেক্স হসপিটালে থাকা অবস্থায় সম্পর্ক করেন তায়েফ এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্বাধিকারী জুবেলের সাথে। জুবেলকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কোটেশনের মাধ্যমে কাজ দিতেন সেতু। দু'জন মিলে হাসপাতালের বিপুল অর্থ লোপাট করলেও এখনো রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরবর্তীতে দু'জনের অর্থ কোন্দলে জুবেলের সেফওয়ে সার্জিক্যাল প্রতিষ্ঠান টি চক্রান্ত করে ব্লাকলিস্ট করা হয়।

স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু ঘুষের টাকায় ক্রয় করেছেন টাঙ্গাইলের রেজিস্ট্রি পাড়ায় একটি ফ্ল্যাট। আছে এফডিআর সহ ব্যাংক ব্যালেন্স। গড়েছেন নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়। চলাফেরা করেন "একজিও" গাড়িতে। অবশ্য গাড়ির কাগজ-পত্র তার পিতার নামে করেছেন। সেতুর পিতা টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন এর অফিস সহকারী ছিলেন। তার বিরুদ্ধেও চাকরিকালীন সময়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতুর বিরুদ্ধে মাদক সেবন, গাঁজা,ইয়াবা, মদ সহ সব ধরনের নেশায় অভ্যস্থ। হাসপাতালের মহিলা কর্মচারীরাও তার উপর অতিষ্ঠ। কিন্তু চাকরি হারানো কিংবা বদলির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেনা। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন ক্লাব সহ জুয়ার আসরগুলোতেও মোজাম্মেল হক সেতু "জুয়ারি" হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেছেন। সেতু প্রতিদিনের অবৈধ উপার্জনের টাকা দিয়ে জুয়া খেলেন বলে ঠিকাদারদের অভিযোগ।

ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা এই প্রতিবেদককে জানান, টেন্ডারে সব ধরনের লিয়াজো করেন স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক। তার হাত দিয়েই বিভিন্ন স্তরে টাকার ভাগভাটোয়ার চলে যায়। টাকা না দিলে ঠিকাদারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। যারা সেতুকে ম্যানেজ করেন, তারাই শুধু কাজ পান। নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার কাজ পেলেও অধিকাংশ ঠিকাদার কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বর্তমানে অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টিয়েছে সেতু। সরকারি দলের শেল্টার নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে পরিচালক কুদ্দুস ও স্টোর কিপার সেতু। অনেকটা সামলিয়েও উঠেছেন পরিচালক সিন্ডিকেট।

ওয়াকিবহাল সূত্রমতে, সাবেক মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক ভোলার আত্নীয়-স্বজন পতিত সরকার আমলে হাসপাতালটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সাবেক মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক ভোলা ছিলেন হাসপাতালের সভাপতি। হাসপাতালের ৪ হাজার স্কয়ার ফিট ক্যান্টিন অনেক কম মূল্যে ভাড়া দেয়া হয়েছিল। এখন শুধু হাত বদল হয়েছে। উক্ত সঙ্গবদ্ধ চক্র পরিচালক, স্টোর কিপার ও হিসাব রক্ষককে ম্যানেজ করে প্রতিদিন দুইশত রোগির খাবারের বিল অতিরিক্ত করেন। তাদের এই শুক্ক কারচুপির খবর সর্বত্র প্রচার থাকলেও সরকারি ভাবে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।

কে এই হিসাবরক্ষক মুহাম্মদ মজনু মিয়া?

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি  টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মুহাম্মদ মজনু মিয়াকে সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিচালকের বিরুদ্ধে। পরিচালকের সহায়তায় গত এক বছরের বেশি সময় নিয়মিত বেতন  তুলছেন মজনু। 'আত্মগোপনে' থাকলেও ভ্রমণে রয়েছেন জানিয়ে ছুটি নিয়ে তুলেছেন ভ্রমণ ভাতাও। এই হিসাবরক্ষক কর্মকর্তার প্রভাবের কারণে খোদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তাকে 'সব ব্যবস্থা' করে দিয়েছে। ওই কর্মকর্তার বিভিন্ন নথি ঘেঁটে মিলেছে এ সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

হাসপাতালটির স্বয়ংক্রিয় হাজিরা যন্ত্রের তথ্য, বেতন ও ভ্রমণ ভাতা নেওয়ার ফর্দ ও অফিস আদেশের কপি যাচাই করে দেখা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক দিনও হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেননি হিসাবরক্ষক মজনু মিয়া। ওই সময়ের মধ্যে তিনি দুই দফায় তিন মাস ও চার মাস করে সাত মাস ছুটি কাটিয়েছেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে দুই দফায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তথা  ছুটির আবেদন মঞ্জুর করেছে। মামলার আসামি হওয়ার পর তিনি তাবলিগ জামাতে অংশ নেওয়ার জন্য ছুটির দরখাস্ত দিলেও কর্তৃপক্ষ তার অসুস্থতাজনিত ধারায় অর্জিত ছুটি মঞ্জুর করে। হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা মজনু এ ছুটিকেই আবার ভ্রমণ ছুটি দেখিয়ে তুলেছেন ৭২ হাজার ২০০ টাকার ভাতা! সেইসঙ্গে নিয়মিত বেতন-ভাতা হিসেবে তুলেছেন আরও ৫ লাখ ৯৫ হাজর ৯৯৭ টাকা।

নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সরকারি চাকরি বিধিমালার বাইরে গিয়ে মজনু এসব সুবিধা ভোগ করছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল কুদ্দুসের সহায়তায়।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমএসআর টেন্ডারে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি; টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। আওয়ামী রাজত্বকালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মান, ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় ও জনবল নিয়োগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন দুর্নীতির মহোৎসব চলে। যা এখনো চলামান রয়েছে। সর্বশেষ মেডিকেল, সার্জিকেল এন্ড রিকোজিট (এমএসআর) টেন্ডারে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সরকারের গচ্ছা গেছে পৌনে চার কোটি টাকা। টেন্ডার নিয়ন্ত্রনে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট কোটি টাকার কার্যাদেশ দিয়েছে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগে আদালতে মামলাও করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। এসব কারনে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ কম এসেছে প্রায় চার কোটি টাকা। ফলে বিপুল ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জেলাবাসী।

জানা গেছে, চলতি অর্থ বছরের জন্য গত অক্টোবরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কতৃপক্ষ এমএসআর (মেডিকেল, সার্জিকেল ও রিকোজিট) টেন্ডার আহবান করে। এতে ওষুধ, যন্ত্রপাতি, গজ ব্যান্ডেজ তুলা, লিলেন, কেমিকেল রিএজেন্ট ও আসবাবপত্র গ্রুপে একাধিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ওষুধ গ্রুপে শামছুল হক এন্টারপ্রাইজ ৭৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা এবং যন্ত্রপাতি গ্রুপে ৭১ লাখ ৪১ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। কিন্তু কার্যাদেশ দেয়া হয় ৫ম দরদাতা মক্কা টেডার্স নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ১৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকায়। এতে সরকারের গচ্ছা গেছে ৪২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। গজ ব্যান্ডেজ তুলা গ্রুপে শামছুল হক ফার্মেসি ৫৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও কার্যাদেশ দেয়া হয় ২য় দরদাতা মেডি স্কয়ারকে ৬২ লাখ ৩৮ হাজার টাকায়। ফলে সরকারের ক্ষতি হয় ৮ লাখ টাকা। মেডিস্কয়ার কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার কারনে মালামাল সরবরাহ করেও এখনো পর্যন্ত কোন বিল পায়নি। কেমিকেল রিএজেন্ট গ্রুপে ইমারত হোসাইন খান ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা হয়। তবে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৪নং দরদাতা সিমাক ইন্টারন্যাশনালকে ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকায়। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ১৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে টেন্ডারে অনিয়মের কারনে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৬৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।

এদিকে, নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এমএসআর টেন্ডারে। এবছর ওষুধ গ্রুপে সর্বনিন্ম সাঈদ মেডিকেল হল এক কোটি ১৭ লাখ ৯১ হাজার টাকার টেন্ডার দাখিল করে সর্বনিন্ম দরদাতা হয়। কিন্তু কার্যাদেশ দেয়া হয় ৪নং দরদাতা জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালকে দুই কোটি ১৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকায়। ফলে ওষুধ ক্রয়েয় গচ্ছা যায় ৯৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। যন্ত্রপাতি গ্রুপে এক কোটি ৬৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয় শামছুল হক ফার্মাসি। তবে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৩য় দরদাতা জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালকে দুই কোটি ৩১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায়। এর ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৬৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। গজ ব্যান্ডেজ তুলা গ্রুপে ৭০ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয় শামছুল হক ফার্মেসি। কার্যাদেশ দেয়া হয় ৩য় দরদাতা কালো তালিকাভুক্ত মেডি স্কয়ার প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ৪৩ লাখ ৫১ হাজার টাকায়। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৭৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

একইভাবে লিলেন গ্রুপে শামছুল হক ফার্মেসী ৬৬ লাখ ২১ হাজার টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা হলেও কার্যাদেশ পায় জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনাল এক কোটি ৪০ লাখ ৮ হাজার টাকায়। অর্থাৎ লিলেন গ্রুপে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। আর আসবাবপত্র গ্রুপে শামছুল হক ফার্মেসি ৬৪ লাখ ১২ হাজার টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা হলে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৫ম দরদাতা জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালকে ৭৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকায়। ফলে আসবাবপত্রে সরকারের গচ্ছা যায় ১৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টেন্ডারে অনিয়মের কারনে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় তিন কোটি ২৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকার বেশী। ক্ষতিগ্রস্থ ঠিকাদারদের অভিযোগ, টেন্ডারের কাগজপত্রে ত্রুটি ছিল- এমন ভুয়া অভিযোগে তাদেরকে কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ এনে অবশেষে আদালতে মামলা দায়ের করেন তারা।

এদিকে, অর্থ লোপাটের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে গজ ব্যান্ডেজ তুলার ক্ষেত্রে। এক পরিসংখানে দেখা যায়, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিগত চারটি অর্থবছরে গজ ব্যান্ডেজ তুলার জন্য পাঁচ কোটি ৭৯ লাখ ৩১ হাজার টাকার টেন্ডার আহবান ও কার্যাদেশ প্রদান করে। যা মোট দরপত্রের ৮ শতাংশ। একই সময়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশেই অবস্থিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল এক কোটি ৯১ লাখ ৬৬ হাজার টাকার গজ ব্যান্ডেজ তুলার দরপত্র আহবান ও কার্যাদেশ দেয়। গত চার বছরে দুই হাসপাতালের রোগীর পরিসংখানে দেখা যায়, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল প্রায় চার কোটি টাকা কম বরাদ্দ পেয়ে ১৩ লাখ ৮১ হাজার ৩২১ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়।

অপরদিকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সেবা প্রদান করে ১১ লাখ ৮ হাজার ১৯ জন রোগীকে। উল্লেখ্য গজ ব্যান্ডেজ তুলার সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়ে থাকে অর্থপেডিক বিভাগে। কিন্তু এ হাসপাতালে এখনো পর্যন্ত বিভাগটি চালুই হয়নি। এক্ষেত্রে সচেতন মহলের প্রশ্ন- বরাদ্দের এই বিপুল অর্থ কোথায় কিভাবে ব্যয় হলো।

এদিকে, হাসপাতালের হিসাব বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেমিকেল রিএজেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। চলতি অর্থবছরে কেমিকেল রিএজেন্টের ৯৩ লাখ ৬২ হাজার টাকার মালামাল ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে। কেমিকেল কেনাকাটা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজেদের মত বিল ভাউচার তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ লোপাট করা হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টেন্ডারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্থ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান শামসুল হক এন্টারপ্রাইজ, শামছুল হক ফার্মেসি ও সাঈদ মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী বাদি হয়ে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জোয়ারিয়ার কয়েক কোটি টাকার বিল আটকে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টেন্ডারে দুর্নীতির আশ্রয় না নিলেও চলতি অর্থবছরে পুরোনো কায়দায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রন করে সিন্ডিকেট সদস্যরা। এতে সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বরাদ্দ কমেছে প্রায় চার কোটি টাকা। ফলে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হয়েছে টাঙ্গাইলবাসী। 

টেন্ডারে দুর্নীতি, অনিয়ম আর আদালতে মামলার বিষয়ে শামছুল হক ফার্মেসি ও শামছুল হক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোঃ আমিনুর রহমান প্রতিবেদককে জানান, দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ মানের নমুনা সিলগালা অবস্থায় জমা দিয়েছিলাম। অথচ নিন্মমানের নমুনার কারন দেখিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। এই ব্যপারে কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে কোন কিছু জানায়নি। উপায় না পেয়ে আদালতে মামলা করি।

ক্ষতিগ্রস্থ অপর ঠিকাদার আবু সাঈদ চৌধুরী জানান, কেমিকেল রিএজেন্ট টেন্ডারে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় প্রথম দরদাতা কার্যাদেশ থেকে বাদ পড়ে। দ্বিতীয় দরদাতা হিসেবে আমার সকল কাগজপত্র বৈধ থাকার পরেও অনিয়মের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৪র্থ দরদাতাকে।

ওয়াকিবহাল সুত্র জানায়, হাসপাতালের টেন্ডারসহ সকল কিছুই নিয়ন্ত্রন করছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের সমন্বয়ের ভুমিকা পালন করছেন হাসপাতালের স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কালো তালিকাভুক্ত মেডি স্কয়ারকে এখনো পর্যন্ত কোন বিল পরিশোধ করা হয়নি।

এই বিষয়ে মেডি স্কয়ারের স্বত্বাধিকারী রাশেদুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের মালিক বলে স্বীকার করলেও সাংবাদিক পরিচয় জানার পর নিজেকে মেডি স্কয়ারের কর্মচারী বলে পরিচয় দেন। আর জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী হারুন অর রশীদ জানান, আদালতে মামলার কারনে ফান্ড চলে যায়। ফলে বিল ছাড় করানো যায়নি।  এতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে জানান তিনি। 

টেন্ডারে অনয়িম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আবদুল কুদ্দুস এ প্রতিবেদককে বলেন, টেন্ডারের সকল প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করেই কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। ইচ্ছেমত কাউকে কাজ দেয়ার সুযোগ নেই। কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, টেন্ডারের সময়ে ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটি তালিকাভুক্ত ছিল। তবে  প্রতিষ্ঠানটি মালামাল সরবরাহ করলেও বিল পরিশোধ করা হয়নি। আদালতের মামলাগুলো নিস্পত্তি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। পরিচালক আব্দুল কুদ্দুস এ প্রতিবেদককে আরো বলেন, আপনি যে সব বিষয়ে জানতে চেয়েছেন এগুলো খন্ড খন্ড বিষয়। মেশিন ক্রয় সহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম হয়েছে। এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এগুলো প্রকল্পের অধিনে কেনাকাটা হয়। হাসপাতাল নির্মাণ,ভারি যন্ত্রপাতি ক্রয় ও জনবল নিয়োগের বিষয়েও একই কথা জানান। পরিচালকের দাবি টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোন অনিয়ম ও দুর্নীতি করার সুযোগ নেই।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল রোগী কল্যান সমিতির আজীবন সদস্য মমিনুল হক খান নিক্সন গনিমাদ বলেন, বরাদ্দ কম আসায় হাসপাতলের ডাক্তার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোন ক্ষতি হয়নি। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে রোগীরা। এ ব্যপারে তদন্তপুর্বক ব্যবস্থার দাবি জানান তিনি। । 

জানা গেছে, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, স্টোর কিপার, হিসাবরক্ষক  ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরো কিছু গুরুতর দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.