আবু তাহের বাপ্পা

Published:
2019-12-15 14:39:11 BdST

শিল্পের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বয়লার, নজরদারিতে ঘাটতি


এফটি বাংলা

১০ ডিসেম্বর ২০১৯, সকাল ৮টা। আশুলিয়ার গৌরীপুরে রাজু টাওয়ারে স্থাপিত ন্যাচারাল সোয়েটার ভিলেজ লিমিটেডের কারখানায় ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে নিহত হন এক পথচারী। এ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরো পাঁচজন। যে কক্ষে এই বিস্ফোরণ ঘটে, সেখানে বয়লারে গ্যাস সরবরাহ করার যন্ত্র রাখা ছিল।

এর আগে গত বছরের ৬ অক্টোবর বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় স্থাপিত সুতা-কাপড় ধোয়া ও রঙ করার কারখানা আল-নাসির ওয়াশিং অ্যান্ড ডায়িংয়ে। দীর্ঘদিনের পুরনো ওই বয়লার ছিল মানহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়নি এটি। এছাড়া সনদধারী বয়লার পরিচালক ছিলেন না, বয়লারের সেফটি ডিভাইসগুলোও ছিল বিকল।

শুধু এ দুটি কারখানা নয়, এ পর্যন্ত যেসব বয়লার দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় প্রতিটির পেছনেই মূল কারণ ছিল মান ও রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি। শিল্পের প্রাণখ্যাত বয়লারের নজরদারিতে এমন ঘাটতি ঝুঁকি বাড়াচ্ছে শিল্প খাতটিতে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে উৎপাদনমুখী শিল্পের ব্যাপ্তি ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে বয়লারের ব্যবহার। আমদানি করা অথবা দেশের অভ্যন্তরে নির্মিত দুই ধরনের বয়লার শিল্প-কারখানায় স্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু যথাযথভাবে এসব বয়লার পরিচালনায় রয়েছে দক্ষতার ঘাটতি। ফলে সচল বয়লারগুলোয় ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। নজরদারির ঘাটতিতে এসব ত্রুটি সময়মতো শনাক্তও হচ্ছে না। রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সৃষ্ট ত্রুটিপূর্ণ বয়লার শিল্পের নিরাপত্তার বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের পরিদর্শকরা বলছেন, নজরদারির ঘাটতি আছে। তবে স্থানীয় বা আমদানি করা বয়লার একেবারেই নজরদারি হচ্ছে না, তা নয়। বর্তমানে পরিদর্শক দিয়ে বয়লার একবার পরিদর্শনের পর ক্ষেত্রবিশেষে হয়তো আবার এক বছর পর পরিদর্শন করা সম্ভব হয়। যদিও এ নজরদারি যথেষ্ট নয়। তবে নজরদারির চেয়েও বড় সমস্যা বয়লার পরিচালনা।

পরিদর্শনকালীন অভিজ্ঞতা থেকে তারা বলেন, বয়লারের ক্ষেত্রে যে অবহেলাটি সবচেয়ে বেশি হয়, তা পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে। সমস্যা হলো পানির ধরন এবং পানি ব্যবহারের মাত্রা কত হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক নন। এ অসতর্কতা ও অসচেতনতাই বেশির ভাগ শিল্প ও কারখানার প্রধান সমস্যা। সবকিছু ছাপিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ নজরদারির ঘাটতি ও মালিকপক্ষের অসচেতনতা শিল্পে বয়লার দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রধান বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের নজরদারি বাড়ানো দরকার এটা ঠিক। বর্তমান তিনজন থেকে বাড়িয়ে ৪৮ জন পরিদর্শক নিয়োগের অনুমোদন আমরা পেয়েছি। এরা নিয়োগ পেলে শতভাগ না হলেও ৮০ শতাংশ নজরদারি করার সক্ষমতা অর্জিত হবে। তার পরও দুই বছরের মধ্যে আমাদের আরো পরিদর্শকের প্রয়োজন পড়বে। চলমান এ প্রক্রিয়ায় আমাদের সক্ষমতা বাড়তে শুরু করেছে।

প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে নতুন বয়লার নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল ৪১৫। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি ১০৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮৬৯টি। আবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বয়লার পরিদর্শনপূর্বক ব্যবহারের প্রত্যয়নপত্র প্রদান করা হয়েছিল ৪ হাজার ৪৫০টি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রত্যয়নপত্র প্রদান ২৩ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৪৮৬টিতে উন্নীত হয়।

বয়লারের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনাও বেড়ে চলেছে। প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বয়লার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন ৬৫ জন।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির ২০১০-১৬ সাল পর্যন্ত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই সাত বছরে বয়লার বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন ৬০ জন। এর পরের দুই বছর অর্থাৎ ২০১৭ ও ২০১৮ সালে মারা গেছেন ৪৩ জন। এ হিসেবে ১০ বছরে বয়লার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন ১০৩ জন।

বয়লার দুর্ঘটনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এর নিরাপত্তার বিষয়ে তৎপর হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও। পোশাক শিল্পের কর্মক্ষেত্র ও শ্রম পরিস্থিতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এবার বয়লারে নজর দিয়েছে ইউরোপভিত্তিক ক্রেতা ও শ্রম অধিকার সংস্থার জোট অ্যাকর্ড অন বিল্ডিং অ্যান্ড ফায়ার সেফটি (অ্যাকর্ড)।

ক্রেতা জোটটি তাদের চলমান পরিদর্শন কর্মসূচির আওতায় বয়লারও অন্তর্ভুক্ত করেছে। আরএমজি সাসটেইনেবল কাউন্সিলের আওতায় ২০২০ সালের মে মাসের শেষে তারা বয়লার পরিদর্শন শুরু করবে বলে ১৩ ডিসেম্বর ঘোষণা দিয়েছে।

চূড়ান্ত ঘোষণার আগে পরীক্ষামূলকভাবে ১৭টি কারখানার ৩৫টি বয়লার পরিদর্শন করে নিরাপত্তাহীনতার ঘাটতি ও ঝুঁকিপূর্ণ বেশকিছু ত্রুটি শনাক্ত করেছে অ্যাকর্ড। শনাক্ত করা ঝুঁকির মধ্যে বয়লার কাঠামোতে ক্যালসিয়াম আবরণ জমা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এতে বয়লার কাঠামোটি দুর্বল হয় ও সক্ষমতা কমিয়ে ছেদ তৈরি করে বয়লারে।

অ্যাকর্ডের শনাক্ত করা ত্রুটির মধ্যে আরো আছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকা, বয়লার সনদ না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার এবং অসম্পূর্ণ তথ্য বা কারিগরি তথ্যের ঘাটতি। পোশাক কারখানার বয়লারে এ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ায় আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে অ্যাকর্ডভুক্ত কারখানাগুলোতে পরিদর্শন শুরু হবে বলে চলতি মাসে প্রকাশিত প্রান্তিক প্রতিবেদনে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বয়লারভিত্তিক শিল্প-কারখানায় বয়লার একটি প্রধান যন্ত্র বা প্রাণ হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত সব শিল্প-কারখানায় বয়লার ব্যবহার হয়। তবে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, কেমিক্যাল, সার কারখানা, কাগজকল, চিনিকল, ওষুধ, জুট মিল, কটন মিলস, টেক্সটাইল মিল ও গার্মেন্টস কারখানায় বয়লারের ব্যবহার বেশি।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.


Popular Article from FT বাংলা