April 16, 2024, 10:29 pm


বিশেষ প্রতিবেদন

Published:
2023-01-27 05:31:48 BdST

বিকাশ প্রতারক চক্রের তীর্থস্থান ভাঙ্গা থানার আজিমনগর ও কালামৃধা অঞ্চলবিকাশ প্রতারকচক্রের মাষ্টারমাইন্ড আজিমনগর ইউনিয়নের বিএনপির সাধারন সম্পাদক মোবারক মীর


দেশের জনপ্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ। সারাদেশে সাধারন জনগনের প্রতিদিনের মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে ভয়ংকর একটি সঙ্গবদ্ধ প্রতারক চক্র গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যাদেরকে বিকাশ প্রতারক চক্র হিসেবে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মোবাইল ব্যাংকিং এর বিভিন্ন পর্যায়ে সাধারন গ্রাহকদের সাথে প্রতারনা করে যে চক্রটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তার মূল মাষ্টারমাইন্ড ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের জাঙ্গাল পাশা গ্রামের বিএনপি নেতা মোবারক মীর @  মিজানুর রহমান। জঙ্গলপাশা গ্রামের মৃত মনিরউদ্দিনের ছেলে মোবারক মীর। সারাদেশের বিকাশ প্রতারক চক্রের সিংহভাগ অংশ বসবাস করে ফরিদপুরে ভাঙ্গা থানার জাঙ্গাল পাশা গ্রামে। বর্তমানে ঐ অঞ্চলটি বিকাশ প্রতারকদের তীর্থস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইন্ডিপেনডেন্ট এর তালাশ নামক একটি জনপ্রিয় ও তথ্য নির্ভর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিকাশ প্রতারকদের উপর একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদন প্রচার হওয়ার পরে সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নড়ে চড়ে বসে। একই সাথে ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ও কালামৃধা অঞ্চলটি বিকাশ প্রতারকদের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়। উক্ত গ্রামের সাধারন বাসিন্দাদের মাঝে এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঐ এলাকায় এখন আর পার্শবর্তী অঞ্চলের লোকজন আত্মীয়তা করতে ও আত্মীয় পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। কিন্তু বিকাশ প্রতারনার সিরিয়াল প্রতারক বিএনপি নেতা মোবারক- যিনি মাষ্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিত, মোটেই লজ্জিতবোধ করেন না বরং দিনদিন তার প্রতারনার জাল আরও সুদৃঢ় করতে ব্যাপক মহা-পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সু-নির্দিষ্ট কোনো পেশা না থাকলেও তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। তার এ অবৈধ সম্পদের আয়ের উৎস বিকাশ প্রতারনা। তিনি ও তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যই প্রতারনার সাথে জড়িত এমন তথ্য প্রমান আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। স্ত্রী নয়ন তারা, মেয়ে সনিয়া, মেয়ের জামাতা ফারুক চোকদার তার অন্যতম সহযোগী। এদের প্রত্যেকেই এ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য এবং বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। নামে বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে এদের রয়েছে কোটি কোটি টাকা। মালিগ্রাম শাখা অগ্রনী ব্যাংকে স্ত্রী নয়ন তারার নামে ব্যাপক অর্থ জমা আছে। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর ও ডিপিএস রয়েছে।

গ্রামের বাড়ির জাঙ্গাল পাশায় মোবারক মীর গড়ে তুলছেন আলিশান বাড়ি। এছাড়াও রয়েছে কয়েক কোটি টাকার জমি। স্থানীয় বাজারে রয়েছে কয়েকটি দোকানঘর। প্রতিদিনের চলাফেরার জন্য তিনি একটি চোরাই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে যার কোনো কাগজপত্র নেই। এছাড়াও জনগনের কাছ থেকে জানা গেছে, তিনি একজন ইয়াবা ডিলার। মোবারক মীর মূলত পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে থাকেন। গনমাধ্যমের অনুসন্ধানে মোবারক মীরের সিরিয়াল প্রতারনার একাধিক তথ্য প্রমান উঠে এসেছে।

প্রতারনার কৌশলঃ

  • মোবারক মীর পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করার সুবাদে স্থানীয় থানার কিছু অসাধু পুলিশের সাথে তার রয়েছে বিশেষ সখ্যতা। বিকাশ প্রতারনার অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ আসলে তিনি মূলত প্রতারকদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করে থাকে। এর বিনিময়ে তিনি সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে যে, তার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা।
  • এলাকায় কোনো একটি ঘটনা ঘটলে তিনি টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করে। পরবর্তীতে বিপুল সংখ্যক সাধারন জনগনকে উক্ত মামলায় প্রাথমিক আসামী হিসেবে নাম লিখিয়ে দেন। পরবর্তীতে প্রতিটি সাধারন নিরীহ জনগনের নিকট থেকে (যাদের আসামী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন) মামলা থেকে রেহাই করিয়ে দেওয়ার নাম করে বিপুল অংকের অর্থ  হাতিয়ে নেন।
  • কোনো কারনে মোবারক মীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার অথবা জেলে গেলে সারাদেশে প্রতারক চক্র সদস্যদের নিকট থেকে তার গুনধর স্ত্রী নয়ন তারা টাকা আদায় করে থাকে।

কেস স্টাডি ১:

ঘটনার তারিখ ১৯৯৮, মামলা নম্বরঃ ভাঙ্গা জি. আর ৮৯/৯৮ ধারা ৪৫৭/৩৮০/৪১১ দণ্ডবিধি ধারায় মোবারক মীরের বিরুদ্ধে চুরির অপরাধ সংঘটনের দায়ে অপরাধ প্রমানিত হওয়ায় কারাবিধি ২৪৫ এর (২) ধারা মোতাবেক ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু মোবারক মীরের পরিবর্তে তার বড়ভাই মীর মোশারফ হোসেনকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং কারাভোগ করেন। পরবর্তীতে আদালতে মীর মোশারফ স্থানীয় চেয়ারম্যানের প্রত্যায়নপত্র দাখিলে তিনি সাজামুক্ত হন। আপন বড়ভাইকেও প্রতারক মোবারক জেল খাটাতে কুন্ঠাবোধ করেন নাই।   

কেস স্টাডি ২:

ঘটনার তারিখ ১৬ই জানুয়ারি, ২০২২ ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী দাদাভাইয়ের রড চুরির মামলা। মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার (এফআরআই নং-১১) তারিখ ১৬ই জানুয়ারি, ২০২২- জি.আর নং-২১/২২ ধারা (৩৭৯) পেনাল কোড/ ১৮৬০।

শিবচর থানাধীন সূর্যনগর বাজার এলাকার মরহুম ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী দাদাভাই এর স্মরনে তোরন নির্মান উপলক্ষে ব্যাপারী এন্টারপ্রাইজ নামক দোকান হইতে (ASRM) কোম্পানীর ১০-১২ মি.লি ২৯৬৫ কেজি রড ক্রয় করা হয়। এর মধ্য থেকে ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী কলেজের মেইন গেটের ভিতর বাম পাশে বাউন্ডারির মধ্যে আনুমানিক ১ টন রড রেখে দেয়। এছাড়াও সেখানে আরও ২,৫০০ কেজি রড ছিলো। সর্বমোট ৩,৫০০ কেজি রড চুরি হয়ে যায়। উক্ত রড শিমুল বাজারের ২য় তলা বিল্ডিং এর নিচ তলা হতে উদ্ধার করা হয়। চুরি যাওয়া রডের মধ্যে থেকে ১১৬৫ কেজি রড উদ্ধার করা হয়। উক্ত মামলায় মোহাম্মদ মোবারক মীরের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তদন্তকারী কর্মকর্তা তার তদন্তে মোবারক মীরকে ৪ নং আসামী হিসেবে চিহ্নিত করে ধারা ৩৮৯/৪১১/৪১৩ পেনাল কোড দাখিল করে। উক্ত মামলায় মোবারক মীর কারাভোগ করেন।

কেস স্টাডি ৩:

তারিখ ১৬ই অক্টোবর, ২০২২- ডিএমপি, ঢাকা ধারা দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪২০/৪০৬ বিকাশ প্রতারনা। সর্বমোট আসামী সংখ্যা ৫৪ জন। বিএনপি নেতা মোবারক মীর @  মিজানুর রহমান আসামী নং (৬), পিতা- মনির উদ্দিন, সাং- জাঙ্গালপাশা, থানা-ভাঙ্গা, জেলা-ফরিদপুর।

উক্ত প্রতারক চক্র জনৈক মাহবুবা আক্তার- নিমসার জুনাব আলী কলেজে পড়াশুনা করে, উক্ত মাহবুবা আক্তারকে উপবৃত্তি পেয়েছে এই মর্মে অবহিত করে করোনার কারনে ২টি সেমিস্টারের অতিরিক্ত টাকা বাবদ ১৫,৩০০/- পরিশোধ করবে মর্মে তার নিকট থেকে তার বিকাশ নাম্বার নেয়। উক্ত টাকা বিকাশে প্রদান করবে বলে তার বিকাশ নাম্বার আপডেট করতে হবে এই কথা বলে তার ফোনের ক্যালকুলেটর ওপেন করতে বলে এবং ২০২০ লিখে (+প্লাস) চিহ্ন দিয়ে ১৫,৩০০ টাকা লিখতে বলে এবং বিকাশের পিন নম্বর উঠাতে বলে। তারপর যোগফল কত হয়েছে তা জানাতে বলে। পরে ভিকটিম সরল বিশ্বাসে যোগফল কত হয়েছে তা বলে দেয়। তারপর প্রতারক চক্র ভিকটিমকে জানিয়ে দেয় যে কানেকশনে সমস্যা হচ্ছে পরে ফোন দিবে। পরে আর কোন কল দেয়নি। ভিকটিমের বিকাশে উক্ত সময়ে ৩৩,০০০/- টাকা ব্যালেন্স ছিলো। প্রতারক চক্র তার বিকাশে থাকা ৩৩ হাজার টাকা তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মাহবুবা আক্তার যে অজ্ঞাতনামা ৩টি নাম্বার থেকে ফোন দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে নিজে বাদি হয়ে কোতয়ালি থানা, ডিএমপি তে মামলা দায়ের করেন। মামলা রজুর পর উর্ধবতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী এস. আই উজ্জ্বল বিশ্বাস তদন্ত করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালত মামলাটির তদন্তভার ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ, সিটিটিসি ডিএমপি, ঢাকা। স্মারক নংঃ ডিসি (সিটি-সাইবার)/ সিটিটিসি/ ডিএমপি/ আইওনিয়োগ/ ০২/২০২০/১১৭১, তারিখ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাঃ মোহাম্মদ গোলাম রসূল, ৬-১০-২০২২ ইং তারিখে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে ৫৪ জন আসামীকে দোষী সাব্যস্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। উক্ত প্রতিবেদনে সারা বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক প্রতারক চক্রের সন্ধান পায়। যার মধ্যে মোবারক মীর ওরফে মিজানুর রহমানকে ৬নং আসামী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মূলত মোবারক মীর উক্ত বিকাশ চক্রের মাষ্টারমাইন্ড।

ভাঙ্গা থানার আজিমনগর ইউনিয়নের বিএনপির সাধারন সম্পাদক মোবারক মীর প্রতারক চক্রের মূল হোতা। যার নিজস্ব কোন পেশা নেই। অথচ তিনি ও তার পরিবার এবং তার নিকট আত্মীয়দের রয়েছে বিপুলবিত্ত বৈভব। এ টাকার উৎস কোথায়? রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ ছাড়া এ বিশাল প্রতারক চক্রের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করা কঠিন। এই চক্রকে আইনের আওতায় এনে এলাকাবাসীকে কলুষ মুক্ত করার দাবি অত্র এলাকার সর্ব-সাধারনের। এছাড়াও এ চক্রকে নির্মূল করতে না পারলে দেশের সাধারন জনগনের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা মুখ থুবড়ে পরবে।

দেশব্যাপী বিকাশ প্রতারক চক্র ও দুষ্কৃতিকারীদের নিয়ে আমাদের অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্বে আরও বিস্তারিত প্রকাশিত হবে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.


Popular Article from National