অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
Published:2024-01-24 12:44:07 BdST
গনপূর্ত অধিদপ্তরে ৫ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি দুদকের সুপারিশমালাএকই চেয়ারে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করছে প্রকৌশলীগন
গণপূর্ত অধিদপ্তরে ভিতরে বিএনপি জামাতের আর্শীবাদ পুষ্ট গ্রুপটি রূপ বদলিয়ে বর্তমান সরকারের সাথে মিলে মিশে শত শত কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নিলেও ভিতরে ভিতরে গ্রুপটি সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছে। মূলত অধিদপ্তরের ভিতরেই এক শ্রেনীর কর্মকর্তারা তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে । দীর্ঘদিন যাবৎ একই চেয়ার বা বিভাগে কর্মরত থাকার কারণে অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়। গ্রুপটি এতটাই শক্তিশালী যে পুরো অধিদপ্তরকে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করে থাকে । সরকারের বর্তমান মেয়াদে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করার পর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আতঙ্কে রয়েছে। উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি সিন্ডিকেট মূলত ঠিকাদারদের সাথে যৌথভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরোক্ষভাবে লিপ্ত রয়েছে এমন একাধিক তথ্য প্রমাণ “ফিন্যান্স টুডে” অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয় । এ পর্যন্ত যতজন প্রধান প্রকৌশলী এসেছে প্রত্যেকেই তার নিজস্ব একটি বলয় তৈরী করেছে।বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হলেও স্বার্থন্বেষী একটি সিন্ডিকেট (ঠিকাদার ও প্রকৌশলী) একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করেছে । এর ফলে অধিদপ্তরে মেধাবী অনেক কর্মকর্তা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভালো জায়গায় পোস্টিং পাচ্ছে না । আবার অনেকে সিন্ডিকেট করে ভালো ভালো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছে। এমনও অভিযোগ আছে যে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকার পরেও তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী ব্যবস্থা না নিয়ে বরং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টিং এ বসিয়েছে । সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের ক্যাশিয়ার খ্যাত ও দুর্নীতি পরায়ন অনেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঢাকার বাইরে থেকে এনে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বসিয়েছে এমন প্রমান রয়েছে ।দ্য ফিন্যান্স টুডে অনুসন্ধানে গনপূর্ত অধিদপ্তরের চিহ্নিত সুবিধাভোগী কিছু কালো বিড়ালকে চিহ্নিত করেছে। যাহারা যখন যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসে তার হয়ে যায় । গণপূর্ত অধিদপ্তর সুশাসন ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালে তৎকালীন সচিব মোহাম্মদ দেলোয়ার বখ্ত স্বাক্ষরিত এক পত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক গঠিত দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে - গণপূর্ত অধিদপ্তর সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম, এর অনুসন্ধানকালে একটি সুপারিশমালা বাস্তবায়নে মন্ত্রীপরিষদ সচিব ,মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ সচিবালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরন করা হয়। যার স্মারক নং- দুদক/বি.অনু.ও তদন্ত-২/প্রাতিঃ/০১-২০১৭/অংশ-১৩। উক্ত সুপারিশমালায় দুর্নীতির কয়েকটি উৎসকে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
(‘ক’) দুর্নীতির উৎস
১/ টেন্ডার প্রক্তিয়ায় বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতি (ক) যথাযথ প্রক্রিয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করা, (খ) অপছন্দের ঠিকাদারকে নন রেসপন্সিভ করা, (গ) স্বাভাবিক মূল্যে প্রাক্কালন তৈরি, (ঘ) ছোট ছোট প্যাকেজে প্রকল্প প্রণয়ন, (ঙ) টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বাস্তবায়ন না করা।
২/ নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার,
৩/ প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কাজে ধীরগতি।
৪/ প্রয়োজনীয় তুলনায় বরাদ্দ কম।
৫/ অনাবশ্যক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি।
৬/ স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশার চুড়ান্ত করনে বিলম্ব।
৭/ প্রত্যাশী সংস্থার প্রয়োজন মতো জরুরী ভিত্তিতে কার্যসম্পাদন না করা।
৮/ সেবা প্রদানের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের অসহযোগিতা।
৯/ সময় মতো ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ না করা।
১০/ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করা।
(‘খ’) দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০টি সুপারিশমালা প্রেরন করা হয়েছিল- যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
দ্য ফিন্যান্স টুডে’র অনুসন্ধানী টিম দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক প্রেরিত দুর্নীতির উৎস সমূহ চিহ্নিতকরন ও সুপারিশমালা বাস্তবায়নে কতটুকু যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় যে সুপারিশমালা শুধু কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবিক অর্থে এর প্রয়োগ হয়নি বললেই চলে। উপরোন্ত একটি বিশেষ সুবিধাবাদী গোষ্ঠী প্রকৌশলী মধ্যে একটি অলিখিত সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে অধিদপ্তরের কাজকর্মকেই বিঘ্নিত করেই ক্ষ্রান্ত হয়নি বরঞ্চ শীর্ষ কর্মকর্তাদের চরিত্র হরনেও এরা সরব ছিল। যা এখনো চলমান রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক প্রেরিত প্রতিবেদন যদি মাঠ পর্যায়ে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতো তাহলে আজ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে অহিনুকুল সম্পর্ক তৈরি হওয়ার মতো ৩য় একটি পক্ষ তৈরি হতে পারতো না। সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচি ও পরিকল্পিত নগরায়ন ও সরকারি অবকাঠামো বিনির্মানে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে তাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিশেষ সিন্ডিকেট ‘’লাভের গুড় পিপড়ায় খায়’’- প্রবাদের সাথে মিল রেখে নিজেদের আখের গুছাতে গিয়ে দেশের প্রয়োজনীয় ক্ষতি করে যাচ্ছে। উক্ত সিন্ডিকেটটি বিশেষ একটি অঞ্চলের নামিদামি কিছু ব্যক্তিদের নাম ভাঙ্গিয়ে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। মন্ত্রনালয় ও অধিদপ্তর যদি এখনই উক্ত চক্রের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন না করে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো সৃজনশীল একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন ও ব্যাহত হবে।
দ্য ফিন্যান্স টুডে গণপূর্তের অনুসন্ধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গণপূর্ত বিভাগের অনিয়ম ও দুর্নীতির কিছু তথ্য পেয়েছে। তা হলো খোদ নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আজমুল হকের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ২ বছর যাবৎ তিনি তার বিভাগকে একটি নির্দিষ্ট কমিশনের আওতায় প্রতিষ্ঠা করেছে। অভিযোগ রয়েছে যে আজমল হোক ২০% কমিশনের বিনিময়ে কাজ করে থাকে। ঠিকাদারদের সাথে এটা তার অলিখিত চুক্তি । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার তাকে মিষ্টার ২০% হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের গণপূর্ত বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ। শত শত কোটি টাকার কাজ হয় এ বিভাগে । বর্তমান তার অধীনে হাজার কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। এপিপি থেকে প্রকল্প বরাদ্দ পাশের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কমিশন খাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। কাজ না করে বিল পরিশোধ করার অভিযোগ ও রয়েছে তার বিরুদ্ধে ।
অদৃশ্য হাতের ইশারায় এদের কোন বদলি করা হয় না । এদের সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে পুরো অধিদপ্তরকে এরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে সিভিল শাখায় সুর্নিদিষ্ট একটি শক্তিশালী গ্রুপ পোস্টিং নিয়ে আসছে। এরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যে অটুট তাই তাদের সিন্ডিকেটের বাইরে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালনে নানা ভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্ট করেছে।এমন একাধিক তথ্য প্রমান অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
ই-এম শাখার ও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে একই চেয়ারে ৪ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছে একেকজন নির্বাহী প্রকৌশলী । এদের অবৈধ সম্পদের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী একজন মেধাবী ও সজ্জন ব্যক্তি। তিনি যেহেতু একজন সাবেক সফল আমলা ছিলেন তিনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন একজন সরকারী কর্মকর্তা কতদিন পর্যন্ত এক চেয়ারে থাকতে পারেন। ই-এম শাখার বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের কর্মকান্ড ও মেয়াদকাল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে ঘুরে ফিরে ৫/৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলী পুরো ঢাকা শহর ও তার আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ৪/৭ বছর যাবত দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:-
(১) সমীরণ মিস্ত্রি (২)জাহাঙ্গীর আলম (৩)পবিত্র কুমার দাস (৪) ড: মোঃ আশরাফুল ইসলাম (৫) মোঃ আবুল কালাম আজাদ (৬)মোঃ মহিবুল ইসলাম (৭) মোঃ আজমুল হক প্রমুখ।
নিয়োগ,বদলী ও পদোন্নতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাহলে কেন একই চেয়ারে ঘুরে ফিরে সুনিদিষ্ট কিছু মুখ? সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত কল্পে নতুন সরকারকে এখনই পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।একই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.