February 7, 2026, 3:41 am


আব্দুর রহিম রিপন

Published:
2026-02-07 00:05:13 BdST

পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপরণক্ষেত্রে পরিণত শাহবাগ: ইনকিলাব মঞ্চ ও পে-স্কেল প্রত্যাশীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলা, আহত অর্ধশতাধিক


রণক্ষেত্রে পরিণত শাহবাগ: ইনকিলাব মঞ্চ ও পে-স্কেল প্রত্যাশীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলা, আহত অর্ধশতাধিক
আব্দুর রহিম স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা


রাজধানীর শাহবাগ ও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ সংলগ্ন এলাকা আজ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের পর থেকে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি এবং সরকারি কর্মচারীদের ৯ম পে-স্কেলের দাবিতে আয়োজিত ভুখা মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় পুরো এলাকা ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযানে স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী, সংগঠনের শীর্ষ নেতাসহ অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে খোদ রাজধানীর বুকে এমন সংঘাতময় পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।


যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
আজকের ঘটনার মূল সূত্রপাত হয় দুটি ভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। একদিকে ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। অন্যদিকে, ৯ম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিল নিয়ে যমুনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজের পর থেকেই শাহবাগ মোড়, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এবং মৎস্য ভবন এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, দাঙ্গা দমন বাহিনী ও আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) মোতায়েন করা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা যখন তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে যমুনার দিকে এগোতে চান, তখনই পুলিশের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ অ্যাকশনে যায়।


শাহবাগে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও পুলিশের অ্যাকশন
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই শাহবাগ এলাকা কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নেয়। ইনকিলাব মঞ্চের মিছিলটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ডিঙিয়ে সামনে এগোতে চাইলে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। বিকট শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারপাশ।
এ সময় আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তমাখা শরীর নিয়ে অনেককে দিগ্বিদিক ছুটতে দেখা যায়। পুলিশের ধাওয়ায় আন্দোলনকারীরা শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসি এবং আজিজ সুপার মার্কেটের দিকে পিছু হটে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী মহিউদ্দিন রনির ক্ষেত্রে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশের লাঠিপা থেকে তিনিও রেহাই পাননি। মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত নিয়ে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার সহকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ কোনো উসকানি ছাড়াই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক।


পে-স্কেল আন্দোলনকারীদের ওপর জলকামান ও টিয়ারশেল
একই সময়ে, অর্থাৎ বিকেলের দিকে সরকারি কর্মচারীদের একটি বিশাল মিছিল ৯ম পে-স্কেলের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে রওনা হয়। মিছিলটি যখন হাইকোর্ট মোড় পার হয়ে কদম ফোয়ারার দিকে এগোচ্ছিল, তখন পুলিশ তাদের গতিরোধ করে। আন্দোলনকারীরা বাধা উপেক্ষা করে সামনে এগোতে চাইলে পুলিশ জলকামান (Water Cannon) ব্যবহার করে। শক্তিশালী পানির তোড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান আন্দোলনকারীরা।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতারা অভিযোগ করেছেন, তারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে ‘ভুখা মিছিল’ করছিলেন। তাদের হাতে ছিল থালা ও বাটি, যা তাদের বঞ্চনার প্রতীক। কিন্তু পুলিশ তাদের ওপর এমনভাবে চড়াও হয় যেন তারা কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এই হামলায় বেশ কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মচারী আহত হন এবং কয়েকজনকে আটক করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। পুলিশের টিয়ারশেলের আঘাতে অনেক নারী কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সংগঠনটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আমরা আমাদের বাঁচার দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছিলাম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে ৯ম পে-স্কেল আমাদের বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। কিন্তু সরকার আমাদের আলোচনার বদলে জলকামান ও গরম পানি উপহার দিল।”


হাসপাতালে আহতের ভিড় ও হাহাকার
সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আহতদের ভিড় বাড়তে থাকে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের বেশিরভাই মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত অথবা টিয়ার গ্যাসের কারণে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। ইনকিলাব মঞ্চের বেশ কয়েকজন কর্মীর হাত-পা ভেঙে গেছে বলে জানা গেছে। আহতদের স্বজন ও সহকর্মীদের আহাজারিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। জরুরি বিভাগের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর আহতদের চিৎকারে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
রাকসু (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নেতা সালাউদ্দীন আম্মারও আজকের কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে এসে পুলিশের হামলার শিকার হন। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আন্দোলনকারীদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলার বিচার না হলে তারা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।


নিরাপত্তা জোরদার ও নগরজুড়ে আতঙ্ক
আজকের এই সংঘর্ষের রেশ ধরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও আশেপাশের মিডিয়া হাউজগুলোর সামনেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। শাহবাগ থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত রাস্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে। সংঘর্ষের কারণে শাহবাগ ও এর আশপাশের রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
পুলিশের রমনা জোনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্বাচনের আগে রাজধানীতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আজ যারা যমুনার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার চেষ্টা করেছে এবং পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। জানমাল রক্ষার্থে পুলিশ বাধ্য হয়ে অ্যাকশনে গেছে।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জনমনে উদ্বেগ
আজকের এই হামলা ও সংঘর্ষ এমন এক সময়ে ঘটল যখন দেশ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দোরগোড়ায়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আজই বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যেখানে তারা মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ঠিক সেই দিনেই রাজপথে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এমন সহিংসতা শুভ লক্ষণ নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর আগেও নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। আজকের ঘটনা প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই এবং প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।


বিভিন্ন মহলের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ
আজকের হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের হামলা কোনো গণতান্ত্রিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। তারা অবিলম্বে হামলাকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আজকের হামলার প্রতিবাদে তারা আগামীকাল শনিবার সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে। সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, “শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর খুনিদের বিচার চাইতে গিয়ে যদি আমাদের রক্ত দিতে হয়, আমরা দেব। কিন্তু এই ফ্যাসিবাদী আচরণের কাছে আমরা মাথা নত করব না। রাজপথেই এর ফয়সালা হবে।”
অন্যদিকে, পে-স্কেল বাস্তবায়ন কমিটির নেতারাও জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। তারা বলছেন, “সরকারি কর্মচারীদের গায়ে হাত তুলে প্রশাসন কার স্বার্থ রক্ষা করছে? আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের দাবি মেনে নেওয়ার ও হামলাকারীদের শাস্তির আল্টিমেটাম দিচ্ছি।”


উপসংহার
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ এলাকা কিছুটা শান্ত হলেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশের সাঁজোয়া যান টহল দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ওই এলাকা এড়িয়ে চলছেন। আজকের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সহনশীলতার অভাবে রাজপথ বারবার রক্তাক্ত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় এবং আগামী দিনগুলোতে রাজপথের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.