নেহাল আহমেদ
Published:2026-02-20 12:54:20 BdST
ভাষা, রাষ্ট্র ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন
ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; ভাষা একটি জাতির স্মৃতি, স্বপ্ন, ক্ষোভ, প্রেম এবং প্রতিবাদের ধারক। যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, তার কাছে ভাষা নিছক যোগাযোগের মাধ্যম হতে পারে না।
কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে—আমাদের ভাষাপ্রেম কি সত্যিই জীবন্ত, নাকি তা কেবল আনুষ্ঠানিক আবেগে সীমাবদ্ধ?
প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের পরও বাংলা ভাষা টিকে আছে। অথচ লাতিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাইরের ভাষার প্রভাবে স্থানীয় ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে কিংবা পরিসর কমে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা ছোট কোনো ভাষায় পরিণত হয়েছে।
বাংলা ভাষার এই শক্তির পেছনে রয়েছে তার হাজার বছরের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও বিপুল ভাষিক জনগোষ্ঠী; কিন্তু এরপরও বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করে।
আমরা চিন্তা করি, এই ভাষা আগামী পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত কি না অর্থাৎ ইংরেজির দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যে বাংলা টিকে থাকবে কি না কিংবা যেভাবে বাংলা ভাষার ‘অশুদ্ধ রূপ’ ও ‘অপপ্রয়োগ’ বিস্তার লাভ করছে, তাতে এই ভাষা ব্যবহারযোগ্যতা হারাবে কি না।
আবার অনেকে এমনও বলেন, বাংলা ভাষা ‘সহজ’ করার জন্য একে সংস্কার করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার সক্ষমতা ও এর ধরন-বৈশিষ্ট্যকে তাঁরা বিবেচনাতেই নেন না।
ভাষা: অস্তিত্বের লড়াই
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছে—ভাষা আত্মমর্যাদার প্রতীক। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্ররা রক্ত দিলেন; তাদের আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। বিশ্বে ভাষার মর্যাদার জন্য সংগঠিতভাবে জীবনদানের এমন ঘটনা বিরল।
এই ইতিহাস আমাদের গর্ব দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বও দেয়। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করছি?
প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি এলে আবেগে ভরে ওঠে দেশ। শহীদ মিনারে ফুল, গান, কবিতা—সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু ভাষা কি কেবল এক দিনের স্মরণে বাঁচে?
ভাষা টিকে থাকে প্রতিদিনের ব্যবহারে। প্রশাসনের ভাষা, উচ্চশিক্ষার ভাষা, বিজ্ঞানের ভাষা, প্রযুক্তির ভাষা—এসব ক্ষেত্রে বাংলা কতটা কার্যকর?
যদি রাষ্ট্রের উচ্চস্তরে অন্য ভাষার ওপর নির্ভরতা থেকেই যায়, তবে বাংলা আবেগের ভাষা হয়ে থাকবে, জ্ঞানের ভাষা নয়।
বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন কানাডার দুজন বাঙালি প্রবাসী রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম। তবে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা বেসরকারি ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি। অনুরোধ/প্রস্তাব একটি সদস্য রাষ্ট্র থেকে জমা দিতে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন এই বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন, তখন খুব বেশি সময় বাকি নেই। হাতে ছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টা। আওয়ামী লীগ সরকার তখন প্রবাসীদের নেতৃত্বাধীন ‘মাতৃভাষা সংরক্ষণ কমিটি’র সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রস্তাবনাটি ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউনেস্কোর কাছে প্রেরণ করে। জরুরি ভিত্তিতে আমাদের মিশনগুলোকে অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, পাশাপাশি এই প্রস্তাবটির জন্য তাদের সমর্থন চাওয়া হয়েছিল। ফলস্বরূপ ’৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে প্রস্তাবটি পাস হয়।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবেই।
এই স্বীকৃতি শুধু বাংলা ভাষার আন্দোলনের জন্য নয়, মায়ের ভাষা, গানের ভাষা, আবেগের ভাষা, সাহিত্যের ভাষা পুনরুদ্ধারের চেষ্টার ফসল।
ভাষার ঐক্য, সম্প্রীতি, ভাষার মৌলিক অধিকার শিক্ষা, মানসিক ও নৈতিক বিকাশ এবং সর্বোপরি মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা- এই দিকগুলোর প্রতি নজর রাখার সময় এসেছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ, কমবেশি অসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, বিহার, ঝাড়খন্ড ও ওড়িশা রাজ্য, মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলা ভাষায় কথা বলেন। আফ্রিকার সিয়েরা লিয়েনে বাংলা হলো দ্বিতীয় সরকারি ভাষা।
ভাষা গবেষণায় অনাগ্রহ
বাংলাদেশে উচ্চতর গবেষণায় বিষয় হিসেবে বাংলা ভাষা একেবারেই অবহেলিত। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতাসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় যথেষ্ট গবেষণা হচ্ছে; কিন্তু বাংলা ভাষা নিয়ে তেমন গবেষণা হচ্ছে না।
তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ-আগ্রহেই চর্যাপদসহ অসংখ্য পুরোনো পুঁথি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছিল। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে ২০ শতকের প্রথম ভাগে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, চন্দ্রকুমার দেসহ বিভিন্ন ব্যক্তির আগ্রহে বাংলা পুরোনো পুঁথি এবং লোকসাহিত্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
২০ শতকের বিভিন্ন পর্যায়ে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ আবদুল হাই প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানী ও ধ্বনিবিজ্ঞানী বিদেশে গিয়ে বাংলা ভাষার ওপর গবেষণা করেছেন।
এখন ভাষা গবেষণায় আগ্রহ বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠানকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগ নতুন প্রকল্প সামনে এনে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে পারে।
প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবতা
ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ভাষা সংরক্ষণ ও গবেষণার উদ্দেশ্যে কাজ করে। এখানে উদ্যোগ আছে, সেমিনার আছে, প্রকল্প আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভাষার উন্নয়নের স্পষ্ট পরিবর্তন কতটা অনুভব করছে?
ভাষাকে শক্তিশালী করতে হলে দরকার—
> মানসম্মত বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পরিভাষা
> উন্নত অভিধান ও ডিজিটাল করপাস
> মেশিন অনুবাদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
> আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলা সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার বিস্তার
শুধু গবেষণাই যথেষ্ট নয়; ফলের দৃশ্যমান প্রয়োগ দরকার।
আঞ্চলিক ভাষা ও প্রমিত রূপ
নাটক, সিনেমা ও সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বেড়েছে। এটি ভাষার বহুত্বের প্রকাশ, যা স্বাভাবিক ও ইতিবাচক। কিন্তু প্রমিত ভাষার ভিত্তি দুর্বল হলে শিক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হয়।
ভাষার শক্তি তার বৈচিত্র্যে, কিন্তু স্থায়িত্ব তার মানদণ্ডে। তাই ভাষার বৈচিত্র্য ও মান—দুটোরই সমন্বয় জরুরি।
গণতন্ত্র ও ভাষার স্বাধীনতা
ভাষা কেবল ব্যাকরণ নয়; এটি চিন্তার স্বাধীনতার বাহন। যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, সেখানে ভাষাও সংকুচিত হয়।
২১ ফেব্রুয়ারি কেবল শহীদ স্মরণের দিন নয়; এটি সত্য বলার সাহসের দিন। ভাষার মর্যাদা রক্ষা মানে নাগরিক অধিকার রক্ষা। যদি মানুষ ভয়ে কথা বলে, তবে ভাষা ধীরে ধীরে প্রাণ হারায়। যদি মানুষ স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করে, তবে ভাষা সমৃদ্ধ হয়।
কী করা প্রয়োজন?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাংলা ভাষার মর্যাদা বাড়ানো। এক্ষেত্রে সাংবিধানিক স্বীকৃতিই শেষ কথা বা চূড়ান্ত কথা নয়। বাংলা ভাষাকে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করে তোলার জন্য এর মর্যাদা পরিকল্পনার পাশাপাশি কাঠামোগত পরিকল্পনায় জোর দেওয়া দরকার।
উচ্চশিক্ষায় মানসম্মত বাংলা পাঠ্য ও গবেষণার বিস্তার প্রয়োজন। একইসঙ্গে দরকার প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করা। বিশ্বভাষায় বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার অনুবাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায়ও কার্যকর বাংলা প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ভাষা দিবসকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এনে নাগরিক চর্চার অংশ করতে হবে। সত্যিকার অর্থে বাংলা ভাষা আজ মৃত নয়, কিন্তু অবহেলিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভাষা বাঁচে স্মৃতিতে নয়, ব্যবহারে। ভাষা বাঁচে দিবসে নয়, নিত্যদিনের চর্চায়।
রাস্তার সাইনবোর্ডের লেখা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়াতে হলে নতুন করে নীতিগত ও আইনগত বিধি প্রণয়ন করতে হবে। শুধু আবেগ আর কথা দিয়ে সত্যিকার অর্থে বাংলা ভাষার মর্যাদা বা প্রয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার স্বার্থেই বহুমুখী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক একজন প্রথিতযশা কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
