March 16, 2026, 4:34 am


নেহাল আহমেদ

Published:
2026-03-15 22:55:29 BdST

কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে ঈদকার্ডের আনন্দ


পবিত্র ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, নববর্ষসহ উৎসবের দিনগুলোতে কার্ড বিতরণের রীতি বহু পুরনো। তবে এখন নানান দিবসে ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমেই শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মানুষ। ঈদকে কেন্দ্র করে নেই সেই ‘ঈদ কার্ড’ বিতরণের চিরায়িত রীতি। ফলে প্রযুক্তির যুগে হারিয়ে যাচ্ছে ছাপা কার্ডে শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রচলন।

একসময় ঈদ মানেই ছিল নতুন পোশাক, সেমাইয়ের ঘ্রাণ আর প্রিয়জনের জন্য 'ঈদকার্ড' পাঠানোর আনন্দ। আজকের প্রজন্মের কাছে ‘ঈদ কার্ড’ শব্দটি হয়তো ততোটা পরিচিত নয়, কিন্তু আগের প্রজন্মের মানুষের কাছে এটি ছিল ঈদ উৎসবের এক বিশেষ আবেগ।

বাংলার মুসলিম সমাজে ঈদ কার্ড ছিল একসময়কার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। ঈদের আগমনী আবহ শুরু হলেই শহরের দোকানগুলো ভরে উঠত নানা রঙের, নকশার ও বর্ণিল ঈদ কার্ডে। কার্ডের গায়ে সোনালি বা রঙিন অক্ষরে লেখা থাকত—‘ঈদ মোবারক’। প্রিয়জনের জন্য সেই কার্ড বেছে নেওয়া এবং নিজের হাতে শুভেচ্ছা লিখে পাঠানো ছিল এক বিশেষ আনন্দের ব্যাপার। কেউ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরলে তাকে বিশেষভাবে বলা হতো—ঈদ কার্ড নিয়ে আসতে। সেই কার্ড হাতে পাওয়ার আনন্দ ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি।

নব্বইয়ের দশকে রাজধানীর পল্টনের দোকানগুলোতে ঈদ কার্ড কিনতে মানুষের ভিড় লেগে থাকত। সেসময় 'আজাদ প্রোডাক্টস ও আইডিয়াল প্রোডাক্টস' এর মতো প্রতিষ্ঠানের তৈরিকৃত কার্ড ছিল বেশ জনপ্রিয়। শুধু বড় দোকানেই নয়, অনেক সময় পাড়ার তরুণরা শামিয়ানা টাঙিয়ে ও টেবিল সাজিয়ে বসত ঈদ কার্ড বিক্রির জন্য।

রমজান মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথেই পাড়ার অলিগলিতে দেখা যেত ছোট ছোট ঈদ কার্ডের দোকান। সাধারণত এলাকার কিশোর-তরুণরা নিজেরা চাঁদা সংগ্রহ করে অল্প পুঁজিতে অস্থায়ী এসব দোকান তৈরি করত। যেখানে সুলভ মূল্যে পাওয়া যেত বর্ণিল সব ঈদ কার্ড।

এসব কার্ডে মনের মতন করে শুভেচ্ছো বার্তা লিখে প্রিয়জনদের মাঝে বিতরণ করা হতো, দেওয়া হতো ঈদের দাওয়াত। এছাড়াও হাতে বানানো ঈদ কার্ডেরও প্রচলন ছিল সেই সময়। রং-বেরং এর কাগজ ও রং দিয়ে নিজ হাতে কার্ড বানিয়ে প্রিয়জনদের ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে পছন্দ করতেন অনেকেই। ঈদকে ঘিরে তখন যেন ছোট্ট এক উৎসবের আবহ তৈরি হতো। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই ছিল ঈদ কার্ডের রমরমা ব্যবসা।

শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি না বলা মনের কথাও লিখে জানানো হতো ঈদ কার্ডে। ঈদ কার্ডের মাধ্যমে কেউ পেয়েছেন নতুন বন্ধুর খোঁজ, কেউবা আবার পেয়েছেন প্রেমের প্রস্তাব। বছরের পর বছর কার্ড বিনিময়ের মধ্য দিয়ে টিকে থেকেছে কত প্রেম, বন্ধুত্ব আর সৌহার্দ্য।

দেশে ঠিক কীভাবে আর কবে থেকে এর প্রচলন শুরু হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়েও এ রীতি প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ৮০ ও ৯০ এর দশকে ঈদ কার্ড বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে ২০০০ সাল পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে কমতে থাকে এর জনপ্রিয়তা।

কার্ড ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০১৫-১৬ সালের দিকেও ছাপা কার্ড বিতরণের হিরিক থাকলেও এখন প্রযুক্তির যুগে এসে ছাপা কার্ড বিতরণে আগ্রহ হারিয়েছে মানুষ। এখন ডিজিটাল মাধ্যমে কার্ড বানিয়ে ই-মেইল কিংবা ফেসবুকে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন মানুষ। ফলে ঈদ কার্ডের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়ার যে কালচার সেটি হারিয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা নববর্ষের ক্ষেত্রেও।

পুরানা পল্টনে বহু পুরনো কার্ডের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, ঈদকে কেন্দ্রে করে নেই কোনো বাড়ছি ব্যস্ততা। উল্টো অন্য সময়ের তুলনায় ফাঁকা দোকানগুলো। কয়েকজন কার্ডের কাজ করলেও তা বিয়ের কার্ড। ঈদের কার্ডের অর্ডার নেই বললেই চলে। তাই ঈদ কার্ড কেন্দ্রিক ব্যবসা এখন আর নেই আজাদ প্রোডাক্ট, আইডিয়াল প্রোডাক্টসসহ স্বনামধন্য কার্ডের দোকানগুলোতে।

আজাদ প্রোডাক্টসের একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এখন তো ঈদ কার্ড বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কম। রমজানের আগেই প্রস্তুতি নিতাম ঈদ কার্ড ছাপানো জন্য। শত শত ডিজাইন থাকতো আমাদের ঈদ কার্ডের জন্য। তখন সবচেয়ে বেশি চলতো ঈদ কার্ড, বাচ্চাদের কার্ড ছিল। এগুলো এখন জিরোতে নেমে আসছে। এবছর তো কোনো কার্ডই চলছে না।"

তিনি আরও বলেন, "অতীতে আমাদের কার্ড বিক্রির দু’টি সিজন ছিল, নববর্ষ আর ঈদ। এখন তো কিছুই নেই। আমাদের আগে চাঁদরাত পর্যন্ত শোরুম খোলা রাখতে হতো, লাখ লাখ কার্ড বিক্রি হতো।’

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এই সুন্দর ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হয় এসএমএস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ই-কার্ডের মাধ্যমে। মুহূর্তের মধ্যেই বার্তা পৌঁছে যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে থাকে না হাতে লেখা অনুভূতির উষ্ণতা কিংবা অপেক্ষার সেই মধুর আনন্দ।

আসলে একটি হাতে লেখা ঈদ কার্ড কেবল শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যম নয়; এর প্রতিটি শব্দে মিশে থাকে আন্তরিকতা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা। ছোট্ট একটি কার্ড অনেক সময় হয়ে ওঠে স্মৃতির অমূল্য দলিল, যা বছরের পর বছর ধরে মানুষের মনে রয়ে যায়।

প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে হয়তো ঈদ কার্ডের ব্যবহার কমে গেছে, কিন্তু এর আবেগ ও সৌন্দর্য কখনোই মুছে যায়নি। আমরা যদি সচেতনভাবে আবার এই সংস্কৃতির চর্চা শুরু করি, তবে প্রযুক্তির ভিড়েও হয়তো ফিরে আসতে পারে সেই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির দিনগুলো। কারণ প্রযুক্তি যতোই এগিয়ে যাক, মানুষের হৃদয়ের স্পর্শে লেখা কয়েকটি শব্দের আবেগ কোনো যন্ত্রই প্রতিস্থাপন করতে পারে না। তাই হারিয়ে যাওয়া ঈদ কার্ডের সেই আনন্দ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদের হাতেই।

লেখক একজন কবি ও সাংবাদিক

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.