March 27, 2026, 4:07 pm


নেহাল আহমেদ

Published:
2026-03-27 13:11:00 BdST

নদীর ঘাটে নিরাপত্তা: দায় কার কতটুকু?


নদীতে যানবাহন পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাকে শুধুমাত্র “চালকের ভুল” বলে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতার একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ।নদীমাতৃক বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় ফেরিঘাট ও পন্টুন কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি প্রতিদিনের জীবনের অনিবার্য অংশ। হাজার হাজার মানুষ, শত শত বাস-ট্রাক প্রতিদিন এই ঘাটগুলোর ওপর নির্ভরশীল। অথচ প্রায়ই শোনা যায় একই মর্মান্তিক সংবাদ—যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেছে। আর ঘটনার পরপরই দায় চাপানো হয় একটি পরিচিত বাক্যে: “চালকের ভুল”। প্রশ্ন হলো—এই ব্যাখ্যা কি যথেষ্ট, নাকি এটি একটি বৃহত্তর ব্যর্থতাকে আড়াল করার সহজ অজুহাত?

নিশ্চয়ই চালকের ভুল একটি বাস্তব কারণ। অতিরিক্ত গতি, ক্লান্তি, অসতর্কতা বা অভিজ্ঞতার ঘাটতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু আধুনিক নিরাপত্তা দর্শন আমাদের ভিন্ন এক শিক্ষা দেয়: একটি সিস্টেম এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে একজন মানুষের ভুল বড় বিপর্যয়ে রূপ না নেয়। অর্থাৎ, “মানবসৃষ্ট ভুল” যেন কখনোই “সিস্টেম ফেইলিউর”-এ পরিণত না হয়। উন্নত ব্যবস্থার মূল দর্শন এখানেই।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, অধিকাংশ ফেরিঘাট এখনও পুরনো ও দুর্বল কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। অনেক পন্টুন পর্যাপ্ত স্থিতিশীল নয়, র‌্যাম্পের ঢাল নিয়ন্ত্রিত নয়, কিংবা লকিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করে না। কোথাও পিচ্ছিল পৃষ্ঠ, কোথাও পর্যাপ্ত আলোর অভাব, আবার কোথাও সুনির্দিষ্ট লেন বা সংকেতের অনুপস্থিতি। ফলে একটি ছোট ভুল—একটু ব্রেক মিস, সামান্য ভারসাম্যহীনতা—মুহূর্তেই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ নেয়।

অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলোতে ফেরিঘাট একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। সেখানে পন্টুন নির্মাণে শক্তিশালী স্টিল বা কংক্রিট ব্যবহার করা হয়, র‌্যাম্প থাকে হাইড্রোলিক নিয়ন্ত্রণে, এবং ফেরি-পন্টুন সংযোগে থাকে অটোমেটিক লকিং সিস্টেম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—পন্টুনের শেষ প্রান্তে বাধ্যতামূলক সেফটি ব্যারিয়ার ও স্টপার থাকে, যাতে কোনো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারালেও সরাসরি পানিতে পড়ে না যায়। অর্থাৎ, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা শূন্য করা না গেলেও তার ভয়াবহতা কমিয়ে আনা হয় পরিকল্পনার মাধ্যমে।

এই সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো ঘাট পরিচালনার দুর্বলতা। অনেক সময় দেখা যায়, একসাথে অতিরিক্ত যানবাহন ওঠানোর চেষ্টা, কোনো সুনির্দিষ্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা নেই, কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বদলে বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। দুর্ঘটনার পর যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহির অভাব থাকায় একই ভুল বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এভাবে “চালকের ভুল” একটি কাঠামোগত ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার। প্রথমত, পন্টুন ও র‌্যাম্পকে আধুনিক ও মানসম্মত করতে হবে—শক্তিশালী নির্মাণ, নিয়ন্ত্রিত ঢাল এবং নির্ভরযোগ্য লকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ঘাটে বাধ্যতামূলক সেফটি ব্যারিয়ার ও হুইল স্টপার বসাতে হবে, যাতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারালেও নদীতে পড়ে না যায়। তৃতীয়ত, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে—সিগন্যাল লাইট, নির্দিষ্ট লেন এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর মাধ্যমে সুশৃঙ্খল ওঠানামা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, সিসিটিভি ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি কার্যক্রম নজরদারিতে আনতে হবে, যাতে দায় নির্ধারণ স্পষ্ট হয় এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়।

এছাড়া চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ক্লান্তি ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে ঘাট এলাকায় “স্মার্ট কিউ ম্যানেজমেন্ট” চালু করা যেতে পারে—ডিজিটাল সিরিয়াল, আলাদা লেন এবং সময়ভিত্তিক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা কমানো সম্ভব। এতে চাপ কমবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

দীর্ঘমেয়াদে ব্যস্ত নৌপথগুলোতে সেতু নির্মাণ একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে—যেমন Padma Bridge আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে যেখানে ফেরিঘাট অনিবার্য, সেখানে আধুনিক ও নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

নদীতে যানবাহন পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাকে শুধুমাত্র “চালকের ভুল” বলে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতার একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ। এটি আসলে একটি সমষ্টিগত ব্যর্থতা—চালক, অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার। আর যে রাষ্ট্র একটি ঘাটকে নিরাপদ করতে পারে না, তার কাছে “চালকের ভুল” শেষ পর্যন্ত একটি অজুহাতই হয়ে দাঁড়ায়।

একটি সত্যিকারের নিরাপদ ঘাট মানে শুধু দক্ষ চালক নয়, বরং এমন একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা—যেখানে মানুষের ভুল আর প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে না।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, কবি ও সাংবাদিক

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.