May 17, 2026, 5:00 pm


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-05-17 14:35:20 BdST

"গণপূর্তের ই/এম বিভাগে দুর্নীতির ভুত"; নেপথ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকঅবসরের ৫ বছর পরও বহাল তবিয়তে অফিস করছেন জসিম উদ্দিন


দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কর্মরত-দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেশনের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক নির্বাহী, উপ-সহকারী, সহকারী, উপ- বিভাগীয় প্রকৌশলীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে কোনও না কোনভাবে একজন শীর্ষ প্রকৌশলীর নামই বারংবার সামনে আসছে। তিনি আর কেউ নন; গণপূর্ত অধিদপ্তরে মাফিয়া সিন্ডিকেটের গডফাদার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক। স্বভাবতই প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে যে, আর কত অনিয়ম ও দুর্নীতি করে ক্ষান্ত হবেন গণপূর্তের ইএম শাখার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ঢাকায় পোস্টিং ধরে রেখে এসব কর্মকর্তা বিভিন্ন সিন্ডিকেটে বিভক্ত হয়ে নিম্নমানের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করছেন। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি এবং জনগণের করের টাকার অপচয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে সরকারি কাজের মানও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ হলেও টনক নড়ছে না গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের।

এবারের প্রেক্ষাপট

চাকরি থেকে অবসরের ছয় বছর অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি নিয়মিত অফিস করছেন গনপূর্তে দুর্নীতির আরেক 'কালো বিড়াল' খ্যাত কম্পিউটার অপারেটর জসীম উদ্দীন। বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল) বিভাগের কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে তিনি স্বপদে বহাল থেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মূলত প্রশাসনিক নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে অবসরে যাওয়ার পরও দপ্তরটিতে অবৈধভাবে তিনি কাজ করে আসছিলেন। তবে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চুক্তিভিত্তিক ও অবসরের পরও পুনর্নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এসব বিষয় এখন প্রকাশ্যে আসছে।

উল্লেখ্য যে, সরকারি চাকরিতে অবসর গ্রহণের পর নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো পদে বহাল থাকা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই ধরনের জালিয়াতি বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।

গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গণপূর্ত অধিদপ্তরে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কর্মরত বিবেকবান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বহুল আলোচিত অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম 'দ্য ফিনান্স টুডে' এই বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধান শুরু করে।

দ্য ফিন্যান্স টুডে আজকের এই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গনপূর্তের অতিশয় ধূর্ত এবং দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী আশরাফুল হকের বিশ্বস্ত সহযোগী জসিম উদ্দিনের দ্বারা সংগঠিত অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হলো।

আমলনামা

গণপূর্তের ইএম শাখার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের বিশ্বস্ত অনুচর মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ১৯৮১ সালে মুদ্রাক্ষরিক পদে চাকরিতে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের কর্মজীবন শেষে ২০২১ সালে উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত অবস্থায় তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

এই পর্যন্ত সব ঠিক আছে মনে হলেও পরের কাহিনী শুনলে যে কারো চক্ষু চড়কগাছ হওয়াই স্বাভাবিক বলে মনে করে দ্য ফিন্যান্স টুডে। কারণ, কাগজ-কলমে সব ঠিক থাকলেও গনপূর্তের ই/এম বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি দপ্তরে সদ্য অবসরে যাওয়া জসিম উদ্দিনের বিনা বেতনে কম্পিউটার অপারেটর পদে ৬ বছর যাবৎ বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালনের তথ্য সামনে আসতেই প্রশাসনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র মতে, ২০২১ থেকে ২৬ সাল পর্যন্ত তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম বিভাগে নিয়মিত কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। আর এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার নেপথ্যে আছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক। সম্প্রতি, তারই অধীনস্থ ই/এম দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের তালিকায় মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলেও পরবর্তীতে বিনা বেতনে ও বিনা নিয়োগে দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর দায়িত্ব পালনের এমন নজির সত্যিই বিরল। এমন নজিরবিহীন অনিয়ম এর আগে কখনোই দেখা যায়নি বাংলাদেশে।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন বলেন, আমি সময় কাটাতে অফিসে যাই। অফিসে দাপ্তরিক কোনও কাজ করেন কি না; জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করে বলেন স্যাররা আমাকে ডাকে।

মাঝে মাঝে যাওয়া আসা আর নিয়মিত দাপ্তরিক চেয়ার টেবিল নিয়ে কাজ করা এক কথা নয়। অভিযোগ উঠেছে, ই/এম বিভাগের সকল টেন্ডার জালিয়াতি, প্রকল্পের প্রাক্যলন ব্যয় কাঠামো গঠন, দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ এবং ঠিকাদারের সাথে নগদ লেনদেন- এসব কিছুই জসীমউদ্দীনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। ই/এম বিভাগে 'দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন এই জসীমউদ্দিন।

এই ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রবীণ প্রকৌশলী আশরাফুল হক ও তার স্টাফ অফিসার মোঃ তরিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও কেউই ফোন রিসিভ করেননি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত বিভাগ তার মধ্যে অন্যতম।এই সংস্থাটিতে সংঘটিত যাবতীয় দুর্নীতি, অনিয়ম, সিন্ডিকেশন ও অবৈধ অর্থ উপার্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ শুধু বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, শুধু গণপূর্তই নয়, প্রশাসনের যে কোনও স্তরে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনেরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা উচিৎ। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দুদক তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের কঠোর হওয়া এখন সময়ের দাবি।"

শুধু যে গনপূর্তের জসিম উদ্দিনই এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত, তা কিন্তু নয়। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়তই ঘটেছে। যা হয়তো অনেকেরই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। তবে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে' তার সম্মানিত পাঠকদের জন্য ঠিকই এসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সচিত্র প্রতিবেদন পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করবে।

পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: বরিশাল সওজ

সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগ বরিশালের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কার্যালয়ে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অবসরে যাওয়ার পরও অন্তত পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারী বহাল তবিয়তে অফিস করছেন, সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করছেন এবং কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াও পরিশোধ করছেন না। এমনকি এক কর্মকর্তা খোদ অফিস কক্ষেই বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি জানার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দ্য ফিন্যান্স টুডের পরবর্তী পর্বে প্রকাশিত হবে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.