June 2, 2026, 1:18 am


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-06-01 11:21:42 BdST

উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে কমেছে পশু কোরবানি


উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব এবার কোরবানির ঈদের বাজারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যে পরিমাণ কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় কম কোরবানির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কোরবানিযোগ্য পশুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই থেকে গেছে উদ্বৃত্ত। এতে লোকসানে পড়েছেন চাষী, খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সরকার কোরবানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় এবার ১০ লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে।

প্রতি বছর ঈদের পর কী পরিমাণ পশু কোরবানি ও উদ্বৃত্ত থাকে সেই পরিসংখ্যান প্রকাশ করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। গতকাল পর্যন্ত তারা পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, জেলা ও বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অফিস, খামারিরা বলছেন, এবার যে পরিমাণ চাহিদা নির্ধারণ হয়েছে তার তুলনায় পশু বিক্রি হয়েছে কম। ফলে কোরবানিও কম হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এই বছর কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে বলে জানিয়েছিল। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এর চেয়েও বেশি উদ্বৃত্ত রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বছর ময়মনসিংহ বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার। বিপরীতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কোরবানির চাহিদা নিরূপণ করে ৪ লাখ ৪০ হাজার। তবে ময়মনসিংহ বিভাগীয় পশুপালন দপ্তরের পরিচালক ডা. মনোরঞ্জন ধর গতকাল জানিয়েছেন, আনুমানিক কোরবানি হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজারটি পশু। যদিও এটি চূড়ান্ত তথ্য নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

গত বছর বিভাগটির চার জেলায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল। অর্থাৎ প্রাথমিক হিসাবে গতবারের চেয়ে ১৩ হাজার কম কোরবানি হয়েছে এবার। ২০২৫ সালে কোরবানির চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার পশু।

ময়মনসিংহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম জানিয়েছেন, এবার জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৮০ হাজার। তাদের প্রাথমিক হিসাবে কোরবানি হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজারটি পশু। বিপরীতে জেলায় কোরবানিযোগ্য পশু উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ২৬ হাজার।

খুলনা বিভাগে এবারের কোরবানিতে পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০ লাখ ৭৯টি। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের প্রাথমিক হিসাবে এই বিভাগে পশু কোরবানি হয়েছে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৫টি পশু। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ হাজার পশু বেশি কোরবানি হলেও প্রাণিসম্পদ অফিস যে চাহিদা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় ২ লাখ ৩৩ হাজার কম। এবার বিভাগটিতে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১৪ লাখ ৪৬ হাজারের কিছু বেশি।

জানতে চাইলে খুলনা বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. গোলাম হায়দার বলেন, ‘গতবারের তুলনায় খুলনা বিভাগে কোরবানি বেড়েছে। প্রাথমিক হিসাবে, এই বিভাগে কোরবানি হয়েছে ৮ লাখ ৪৬ হাজার পশু। এবার ১৪ লাখ ৪৬ হাজার কোরবানিযোগ্য পশু ছিল। তবে এখানের উৎপাদিত পশু বিভাগের বাইরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় কোরবানি হয়েছে। ফলে কী পরিমাণ পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে সে পরিসংখ্যান করতে কিছুটা সময় লাগবে। ’

রংপুর জেলায় এবার কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৬টি। জেলাটিতে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয় ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯১টি। রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহ. নাজমুল হুদা গতকাল জানিয়েছেন, রংপুরে এবার কোরবানি হয়েছে ২ লাখ ৬ হাজারের মতো পশু। অর্থাৎ যে চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল তার তুলনায় ২১ হাজারের মতো পশু কম কোরবানি হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগর ও জেলা মিলিয়ে এবার কোরবানি পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ৮ লাখ ১৬ হাজার। জেলাটিতে কী পরিমাণ পশু কোরবানি হয়েছে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগরী ও উপজেলায় এ পর্যন্ত ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। বিক্রি করতে না পেরে জেলাটিতে বিপুল পরিমাণ কোরবানির পশুর চামড়া অবশ্য সড়ক ও ভাগাড়েও ফেলে দেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তবে স্থানীয় খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার যে পরিমাণ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল তার তুলনায় কোরবানি কমই হয়েছে।

বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। কোরবানির চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০টি, যা গত বছরের তুলনায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮০ কম। বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, এবার কী পরিমাণ পশু কোরবানি হয়েছে সেটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রস্তুত হয়নি।

এই বছর কী পরিমাণ পশু কোরবানি হয়েছে—সে বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, ‘মাঠপর্যায় থেকে এখনো তথ্য সংগ্রহ চলছে। মন্ত্রণালয় এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে। আমাদের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। চলতি সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তালিকা হয়ে যাবে। ’

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে পশুখাদ্যসহ উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কোরবানির পশুর দামও বেড়েছে। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অনেক মানুষ কোরবানি করতে পারেননি। আবার অনেকেই একা ও বড় পশু কোরবানির চেয়ে শরিক বা ভাগে কোরবানি করেছেন। এতে কোরবানিকারী বাড়লেও পশুর হিসাবে সেটি কমেছে।

রাজধানীর ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইঞ্জিনিয়ার মকবুল হোসেন বলেন, ‘এবার ভাগে কোরবানি বেড়েছে। গতবার আমাদের খামার থেকে যে পরিমাণ ভাগে কোরবানি হয়েছিল তার তুলনায় এবার হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। এছাড়া অনেকে কোরবানিও করেননি। আমার খামার থেকে প্রতিবার গরু নেন কিংবা ভাগে কোরবানি করতেন এমন অনেক ক্রেতাকে পেয়েছি যারা এবার কোরবানি করেননি। ’

আর্থিক চাপে অনেকেই এবার কোরবানি দেননি। তেমনই একজন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কৃষক আনিসুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কোরবানি দিলেও গত দুই ঈদে আর কোরবানি দিতে পারেননি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। আগে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় পরিবারের এক সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত। এখন ওই টাকায় চার-পাঁচদিনও চলে না। কোরবানির খরচও অনেক বেড়েছে। ভাগে গরু কোরবানি করতেও ২৫ হাজার টাকার বেশি লাগে। সব মিলিয়ে গত দুই বছর কোরবানি দিতে পারিনি। ’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট। এতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পশুপালনকারীর ব্যয় বেড়েছে। সেটি দামেও প্রভাব ফেলছে। ফলে কোরবানির ব্যয় বেড়েছে। তাতে ক্রয়সক্ষমতাও কমেছে মানুষের।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘লম্বা সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির মন্দা ভাব মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে। যার কারণে মানুষকে কোরবানির পশু কিনতে গিয়েও ভাবতে হয়েছে। গত কয়েক মাসে যে হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সেভাবে মজুরি বাড়েনি, এটি একটি কারণ। আরেকটি কারণ হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘ হবে কিনা সে চিন্তাও ভোক্তাদের মধ্যে আছে। সেজন্য জমানো অর্থ ব্যয়ে হিসাব-নিকাশ করছে মানুষ। এটি এখন মানসিক একটি বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলতে পারি। এখানে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে মধ্যবিত্তদের। সব মিলিয়ে এর একটি প্রভাব কোরবানির বাজারে পড়েছে। ’

অতিরিক্ত খরচের চাপ ও মূল্যস্ফীতির কারণে এবার অনেক পরিবার কোরবানি থেকে বিরত থেকেছে। অন্যদিকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর চাহিদা ও বিক্রি ছিল বেশি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, মূল্যস্ফীতি এবং পশুখাদ্য ও ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে গরু উৎপাদনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে এবার প্রতি কেজি মাংসের জন্য ব্যয় করতে হয়েছে গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অনেকে সেটি করতে না পারায় কোরবানির সংখ্যা কমেছে।

এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘সরকার এই বছর ১ কোটি ১ লাখ পশু কোরবানির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, বাস্তবে তার তুলনায় অন্তত ১০ লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে বলে আমার ধারণা। গত বছর কোরবানির সংখ্যা ছিল ৯১ লাখের কিছু বেশি। ’

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.