January 1, 2026, 8:25 am


সালাহউদ্দিন মিঠু

Published:
2025-12-31 23:26:46 BdST

বেগম খালেদা জিয়া: এক আপোষহীন নক্ষত্রের চিরবিদায়


বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গতকাল ৩০শে ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে বার্ধক্য ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে সবার কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

পরপারের অনন্ত যাত্রার মুহুর্তে বেগম জিয়ার এই বিদায়ে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে; যেখানে তাকে একজন 'অকুতোভয় জীবনযোদ্ধা', 'দেশপ্রেমিক' ও 'আপসহীন নেত্রী' হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে। 

আজ বাংলাদেশের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক  অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। দেশনেত্রী, আপসহীন নেত্রী ও মানবতার মা হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সবার মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। শারীরিকভাবে না থাকলেও তিনি সর্বদাই গণতন্ত্র, সংগ্রাম ও সাহসের প্রতীক হয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়সী নারী ১৯৬০ সালে সেনাপ্রধান ও পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফার্স্ট লেডি থেকে শুরু করে দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে তার পদচারণা ছিল। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিন মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এবং বহু শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রামে অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করার মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতন্ত্রের নেপথ্য নায়ক আপোসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বুধবার বিকেলে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে চির বিদায় জানানো হয়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী মরহুম জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই আজ অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন বেগম খালেদা জিয়া।

এর আগে, স্মরণকালের সর্ববৃহৎ এবং রেকর্ডসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আজ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে শুধু বাংলাদেশই নয় বরং মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে এই সংগ্রামী আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সমাজের বিশিষ্টজনসহ দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কুটনৈতিক ব্যক্তিবর্গও বাংলাদেশের অন্যতম অবিসংবাদিত রাজনীতিবিদ বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ করে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্বাক্ষী হয়ে রইলেন।

উল্লেখ্য যে, বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ এক মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। সেসময় যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তারেক রহমান তার মা বেগম জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন।কিন্তু স্বাস্থ্যের চরম অবনতি হওয়ায় কয়েকদফা চেষ্টা করেও খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়া সম্ভবপর হয়নি।

পরে, শেষচেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ বিমানযাত্রার ধকল সামলে খালেদা জিয়ার যুক্তরাজ্য যেতে তার ন্যূনতম শারীরিক উন্নতির প্রয়োজন হয়। এসময় বেগম জিয়াকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিতে দেশের স্বনামধন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডকে সহায়তা করতে আন্তর্জাতিক মানের কয়েকটি হাসপাতালে কর্মরত একাধিক বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে নিয়ে আসা হয় বাংলাদেশে। পরবর্তীতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলেও এক পর্যায়ে আবারও স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে।

এদিকে, দেশী-বিদেশী চিকিৎসকদের নানাবিধ প্রচেষ্টা সত্বেও রাজনীতিতে আপোষহীন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের ক্রমাগত অবনতি কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছিলো না। পরে, চিকিৎসাসেবার সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। এসময়, বেগম জিয়ার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশ্রাম দিতে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হচ্ছিল না। এই পর্যায়ে এসে যেকোনো মূল্যে বেগম জিয়াকে সুস্থ করতে মরিয়া হয়ে উঠেন জিয়া পরিবারের সকল সদস্য। মায়ের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে আপ্রাণ চেষ্টা করেও বেগম জিয়াকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হওয়ার পর তারেক রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নীরব কান্না এবং অসহায়ত্ব মন ছুঁয়ে যায় দেশের আপামর জনগণের।

এদিকে, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবং নানা মহলের তীর্যক সমালোচনা ও ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তারেক রহমান। কিন্তু এখানেও বাধ সাধে অদৃশ্য শত্রুর তৎপরতা। দ্রুত দেশে ফেরার পথে জটিল প্রক্রিয়া এবং নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে থাকায় এক পর্যায়ে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে পড়েন তারেক রহমান। এসময় অদৃশ্য কিছু শক্তির দিকে ইংগিত করে গণমাধ্যমকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিজের হাতে না থাকার কথা বলেন তারেক রহমান।

তারেক রহমানের এই একটি মন্তব্যে সর্বমহলে নিন্দার ঝড় উঠে। অদৃশ্য সেই শক্তিকে রুখে দিতে একজোট হয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। জিয়া পরিবারের এই দুঃসময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপরই দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের সমাপ্তি টেনে তারেক রহমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

তারেক রহমান দেশে ফেরায় চারিদিকে উচ্ছাস যেমন ছড়িয়ে পড়ে ঠিক তেমনি বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ার পর দলমত নির্বিশেষে দেশের মানুষ তার সুস্থতা কামনা করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের মধ্যে থাকা আদর্শিক মতপার্থক্য ভুলে বেগম জিয়ার সুস্থতা কামনায় আল্লাহর দরবারে দোয়া প্রার্থনা করে। অতীতে বাংলাদেশের কোনো নেতা-নেত্রীর ভাগ্যে সর্বমহলের এমন সহমর্মিতা জোটেনি।

শরীর–মনে স্বাস্থ্যগত নানা ধকল আর সহ্য করতে পারছিলেন না বেগম খালেদা জিয়া। কোন কিছুতেই তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এবং সেবা প্রদানের সময় বেগম জিয়ার শরীর আর সাড়া না দেয়ায় কঠিন এবং চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহনে মনস্থির করেন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা। 

জিয়া পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা শুরুর আগেই মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) মধ্যরাত থেকে বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। এসময় তারেক রহমানসহ পরিবারের সকল সদস্য হাসপাতালেই অবস্থান করেন। এদিন, জিয়া পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গোটা জাতি এবং এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে অবস্থানরত দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীরা প্রতিটি মুহুর্ত  চরম উৎকন্ঠায় পার করতে থাকেন। 

অবশেষে, চিকিৎসকদের প্রানান্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

আপসহীন এই নেত্রীর মৃত্যুতে সারাদেশে যেমন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে একটি যুগের অবসান হয়েছে বলে মনে করেন দেশবাসী।

বেগম জিয়ার অসুস্থতা এবং মৃত্যু জাতিকে একই প্লাটফর্মে এনে দাঁড় করিয়েছে। এটা বেগম জিয়ার প্রতি দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসারই নিদর্শন। জাতীয় ঐক্য এবং গণতন্ত্রের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে সর্বস্তরের মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি যে মমত্ববোধ দেখিয়েছেন এটি তারই প্রতিদান।

বিএনপি নিয়ে গবেষণাধর্মী একটি বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বিএনপিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সকক দলের অংশ গ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।

বিএনপির চেয়ারপার্সন এবং ৩ বারের বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবক'টি আসনেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। 

এই নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা তিন জোটের রূপরেখার বদৌলতে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছিল।

সেই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সময়ে অনুষ্ঠতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনের পর বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত পঞ্চম সংসদে বেগম জিয়া নিজেকে সংসদ নেতা হিসাবে উপস্থাপন করেন।

নিজের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও দেশের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুদীর্ঘ সময় ধরে বিরাজমান রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থাকে পাল্টিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তনের জন্য বিল উত্থাপন করেছিলেন।

পরবর্তীতে, ঐকমত্যের ভিত্তিতেই উক্ত বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে মহান জাতীয় সংসদে পাস হয়। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও রাষ্ট্র পরিচালনায় বাংলাদেশে ফিরে আসে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা।

দীর্ঘ সময়ের লড়াই, আন্দোলন এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চলমান এক কঠিন ও বন্ধুর পথের যাত্রাপথে সামান্যতম আপস করলেই তিনি রাজকীয়ভাবে বিদেশ যেতে পারতেন। স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু বারংবার বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা স্বত্বেও তিনি ন্যূনতম আপোষ করেননি। বরং তিনি বহুবার বলেছেন, 'বাংলাদেশের মাটি ও জনগণ ছাড়া আমার কোথাও যাওয়ার কোন জায়গা নেই। এই দেশ এবং দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কখনও কোথাও যাবো না।'

বাংলাদেশের কোনও সরকার বা সংস্থাই হাজারো ভয়, হুমকি বা চাপ প্রয়োগ করেও পৃথিবীর কোন দেশেই তাঁকে পাঠাতে পারেনি। কিন্তু অমোঘ মৃত্যু তাঁকে ডেকে নিয়ে গেলো চিরতরে। তিনি আর ফিরবেন না ধূলি ধরায়। তবে তিনি মানুষের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সর্বদাই নিজ মাতৃভূমি এবং জনগণের কল্যাণে দেশপ্রেম, সততা, একনিষ্ঠতা ও সত্য প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়ার এই ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা এবং আপসহীনতা চির-অম্লান হয়ে থাকবে পৃথিবীর ইতিহাসে।

আজ তাঁর প্রস্থান একটি যুগের অবসান ঘটাল। বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন সাহসী নারী নেত্রী হিসেবে; যিনি কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও একনিষ্ঠভাবে দেশ ও নিজের দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.