March 20, 2026, 3:30 am


রেজাউল করিম চৌধুরী

Published:
2026-03-20 01:22:52 BdST

আবারও খাদ্য সহায়তার বরাদ্দ হ্রাসরোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষা এবং স্থানীয়করণকে সমর্থন করুন


বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কক্সবাজারে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে সাত বছর ধরে প্রায় এক মিলিয়ন (১০ লক্ষ) রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে এই দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এককথায় তারা বাংলাদেশে নির্বাসনে রয়েছে। এদের মধ্যে অর্ধেকই আবার শিশু। এসব শিশুর মধ্যে অনেকের জন্ম হয়েছে এই আশ্রয়কেন্দ্রে। এখানকার শরণার্থী শিবিরে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করে।

অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা এবং ভূমিধবসের মতো আবহাওয় ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এর ফলে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পুষ্টির অবস্থাগত অবনতি হয়েছে। শরণার্থীদের জীবিকা নির্বাহের জন্য শুধুমাত্র মানবিক সহায়তার উপর নির্ভর করতে হয়। কারণ, তাদের জীবিকা নির্বাহের তেমন কোনো উৎস নেই বললেই চলে।

সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের মধ্যে ১৫.১শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির হয়। এর অর্থ হলো উচ্চতা অনুযায়ী তারা বেশ পাতলা হয় যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ইউনিসেফের জরুরি অবস্থার জন্য বরাদ্দসীমার চেয়ে বেশি। রোহিঙ্গা শিবিরে এমন অনেক শিশু রয়েছে যারা দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভূগছে। গত কয়েক বছরে এই বিষয়ে তেমন কোন বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১০ জনের মধ্যে চারজন শিশু দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভূগছে। 

সহায়তার বরাদ্দ হ্রাস

এদিকে, আজ একটি সংবাদ দেখলাম যেখানে বলা হয়েছে যে, আগামী এপ্রিল মাস থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য খাদ্য সহায়তা আবারও কমিয়ে দেওয়া হবে। এই দাতা সংস্থাগুলো মূলত মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, যা সাধারণত এককালীন বড় আকারে আসে। গত কয়েক বছরে এই সহায়তা ৭০ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৫০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র মতে, ২০২৫ সালের ন্যায় এই বছরও জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা 'বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি' (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মাসিক খাবারের বরাদ্দ আরও একদফা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আগামী এপ্রিল মাস থেকেই ফের কার্যকর হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন গত বছরের শেষ নাগাদ ইউএসএআইডির অর্থায়ন বাতিল করার পর বিশ্বজুড়ে যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তার পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতির পথে; ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অসম যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আর ঠিক এমন একটি সময়েই ''বিশ্ব?! খাদ্য কর্মসূচি' সহায়তা কমানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে

কৃচ্ছতা সাধনের নামে বিলাসিতা

উদ্ভুদ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের সংস্থাগুলো তাদের ব্যবস্থাপনা খরচ কমিয়ে আনছে বলে দাবি করলেও তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, এই সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা অত্যন্ত বিলাসী, কক্সবাজার শহরে তাদের অফিসগুলো দেখতে অনেকটা রিসোর্টের মতো এবং বিলাসবহুল ল্যান্ডরোভার জিপ ছাড়া তারা চলাচল করতে পারে না। এই সংস্থাগুলোতে মধ্যম ও উচ্চ পর্যায়ের পদের জন্য এখনও তারা বিদেশিদের নিয়োগ দিয়ে থাকে।

এনজিও নির্ধারণে পক্ষপাতিত্ব

ইদানীং কক্সবাজারে একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেটি হলো স্থানীয় এনজিওগুলোকে বাদ দিয়ে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো অ্যাকশন এইড, অ্যাক্টেড ও টিডিএইচ এর মতো আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব করছে। এসব আন্তর্জাতিক এনজিও তাদের নিজ দেশ থেকে খুব কম টাকাই এদেশে নিয়ে আসে। বরং তারা কক্সবাজারে শক্তিশালী লবিং করে, বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয় এবং নামি-দামি ডিনার, ইফতার পার্টি কিংবা সমুদ্রতীরবর্তী বারগুলোতে সান্ধ্যকালীন মদ্যপান পার্টির আয়োজন করে।

দেশীয় এনজিও বাছাইয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সংস্থাগুলোর প্রথম পছন্দ হলো ব্র্যাক। যদিও ব্র্যাক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, কিন্তু এর চরিত্র পুরোপুরি আন্তর্জাতিক এনজিওর মতো। সবকিছু সেখানে প্রমিত, কিন্তু স্থানীয় সাধারণ মানুষ বা নাগরিক সমাজের সাথে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ক্ষীণ।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সামাজিক সংহতি

কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান স্থানীয় বাংলাদেশীদের সাথে সামাজিক সংহতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের তুলনায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যাধিক্য, শ্রমবাজার ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ (যেমন- অপরাধ বৃদ্ধি, মাদক ব্যবসা) উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও অবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।

সরকার এবং বিভিন্ন সাহায্যকারী সংস্থা যেমন ইউএনএইচসিয়ার ও ইউনিসেফ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় তরুণদের জন্য যৌথ দক্ষতা উন্নয়ন, টেকসই পরিবেশ গড়ার লক্ষ্যে জ্বালানি সহায়তা এবং একসাথে কাজের পরিবেশ তৈরি করে সামাজিক সংহতি ফেরানোর চেষ্টা করছে। এছাড়া, স্থানীয়দের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও অতীব জরুরি।

দুই ভিন্ন জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সামাজিক সংহতির জন্য এই জনপদের স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় সরকারের সাথে নিবিড় সংযোগ থাকা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতো ব্র্যাকও স্থানীয় দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাগুলোর ব্যাপারে অন্ধ। যেমন, আসন্ন সুপেয় পানির সংকট কিংবা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দুর্বলতার কারণে নষ্ট হওয়া কৃষি জমি উদ্ধারে ব্যর্থতা নিরসনে ব্র‍্যাকের দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেই।

আমি এখনও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অর্থায়নের আবেদনকে সমর্থন করি, তবে এটি জাতিসংঘ সংস্থা, আন্তর্জাতিক এনজিও বা ব্র্যাকের মাধ্যমে না হয়ে স্থানীয় এনজিওগুলোর একটি কনসোর্টিয়াম বা জোটের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত। দেশীয় এনজিওগুলোর মধ্যে কোস্ট, জেএনইউএস, শেড, মুক্তি, অগ্রযাত্রা, পালস, ফালস এবং অন্যান্য স্থানীয় এনজিওগুলো ইতিমধ্যে মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অতীতের ন্যায় এখনও সফলভাবে পরিচালনা করছে।

এদিকে, রোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষা এবং স্থানীয়করণ হলো টেকসই মানবিক সহায়তার মূলভিত্তি। আড়াই (২.৫) লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশুর জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখা, তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের পাথেয়। স্থানীয় ও জাতীয় এনজিওগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা (স্থানীয়করণ) করলে এই সহায়তা অধিক কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ হয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার গুরুত্ব ও সমর্থন

জরুরি শিক্ষা সেবা: ইউনিসেফ এবং সেভ দ্য চিলড্রেন-এর মতো সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা ও স্থানীয় শিশুদের জন্য যৌথভাবে কাজ করছে, যা শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে।

মানসম্মত শিক্ষা: রোহিঙ্গা এবং বার্মিজ ভাষায় শিক্ষার পাশাপাশি জীবনের দক্ষতা ও মনঃসামাজিক সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করবে।

শিক্ষায় বিনিয়োগ: তহবিল সংকটের কারণে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য জরুরি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।

স্থানীয়করণের মাধ্যমে সহায়তার রূপরেখা

স্থানীয় এনজিওর ভূমিকা: স্থানীয় ও বাংলাদেশী এনজিওগুলোকে সরাসরি অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা প্রয়োজন। রেফিউজি স্টাডিজ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, দেশীয় এনজিওগুলোকে সরাসরি অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা গেলে এই সহায়তার কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

স্থানীয় কর্মীদের ক্ষমতায়ন: কক্সবাজারের স্থানীয় জনশক্তি ও সংস্থাসমূহকে কারিগরি ও নেতৃত্ব প্রদানের প্রশিক্ষণ দিয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

কমিউনিটির অংশগ্রহণ: রোহিঙ্গা নারীদের জন্য উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড (যেমন—ভাসানচরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা) আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এই কর্মসূচি রোহিঙ্গা নারীদের আরও আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শিক্ষা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করলে তা তাদের মর্যাদা ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করেন শরনার্থী বিষয়ক অধিকাংশ বিশেষজ্ঞগন।

পরিশেষে, আমি একটি বিষয়ে জোর দিতে চাই। কেবল খাদ্য সহায়তার জন্য নয়, শিক্ষা সহায়তা এবং নারী ও কিশোরীদের সহিংসতা থেকে রক্ষার জন্যও আবেদন করা উচিত। আমি অনেক রোহিঙ্গা যুবককে চিনি যাদের শক্তিশালী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি রয়েছে; তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।

লেখক একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী, কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক। তিনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য  এনজিও প্রতিষ্ঠান কোস্ট  ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। 

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.