April 8, 2026, 10:55 pm


কূটনৈতিক প্রতিবেদক

Published:
2026-04-08 20:06:19 BdST

ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতিকে হাসল শেষ হাসি, তেহরান নাকি ট্রাম্প


পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কেবল সংঘাতের সাময়িক অবসান নয়, বরং এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের এক নতুন সমীকরণ উন্মোচন করেছে। যদিও এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল, কিন্তু যুদ্ধবিরতির রূপরেখা তৈরি হয়েছে অন্যদের মাধ্যমে।

এই সংঘাতের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে পক্ষগুলোর লাভ-ক্ষতির খতিয়ান ভিন্ন।

যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের স্কোরকার্ড

ইরান: নিরঙ্কুশ বিজয়ী

যেকোনো মানদণ্ডেই ইরান এই সংঘাতের প্রধান বিজয়ী। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ড্র বা সমাবস্থায় থাকাই তেহরানের জন্য বড় জয়। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী এখনো কার্যকর এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নাতীত। এ ছাড়া ইরানের ছায়া বাহিনী বা ‌‌‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স' (হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকি গোষ্ঠীগুলো) আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প: দ্বিমুখী ফলাফল

এটি অনস্বীকার্য যে, কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। একটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা মিত্রদের কাছে ভুল বার্তা দেবে। তবে, এই যুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প লাভবান হয়েছেন। তিনি নিজেকে ‘শান্তিপ্রজাত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন এবং কোনো মার্কিন সেনার কফিন ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করার কৃতিত্ব নিতে পারছেন। প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।

নেতানিয়াহু: রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট

ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায়। বিজয় ছাড়া এই যুদ্ধবিরতি তার কট্টরপন্থী মিত্রদের ক্ষুব্ধ করেছে। জিম্মি পরিবারের ক্ষোভ এবং আইনি জটিলতা মিলে নেতানিয়াহু এখন অভ্যন্তরীণভাবে চরম দুর্বল ও কোণঠাসা।

উপসাগরীয় দেশসমূহ: নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে সৌদি আরব। যুদ্ধের সময় তাদের অবকাঠামোয় ইরানি হামলা প্রমাণ করেছে যে রিয়াদ কতটা অরক্ষিত।

অন্যদিকে, আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে বাজি ধরেছিল, তার ফল আশাব্যঞ্জক হয়নি। পুরো অঞ্চল এখন বুঝতে পারছে যে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

মধ্যস্থতাকারী ও পর্দার অন্তরালের জয়ী: পাকিস্তান ও চীন

পাকিস্তান এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের গুরুত্ব পুনরায় প্রমাণ করেছে। ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’ তাদের কূটনৈতিক বড় সাফল্য। অন্যদিকে চীন কোনো সামরিক সংঘাতে না জড়িয়েও ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে বিশ্বজুড়ে দায়িত্বশীল পরাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।

ফিলিস্তিন: অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ইরানের শক্তি বৃদ্ধি ফিলিস্তিনিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য বিপজ্জনক। অপমানিত ও কোণঠাসা ইসরায়েল তার ক্ষোভ গাজার ওপর ঝাড়তে পারে, যা ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধবিরতি সংঘাতের চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং শক্তির নতুন বিন্যাস। ইরান তার শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে, সৌদি আরব নিজের দুর্বলতা টের পেয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র তার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েছে। এই বাস্তবতাকে সঙ্গী করেই এগোবে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের রাজনীতি।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.