April 29, 2026, 12:58 am


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-04-28 21:31:10 BdST

উর্ধতন মহলে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বেনামী চিঠি, সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণ, কার্যালয়ে অনৈতিক কর্মকান্ড, অনিয়ম, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার: পর্ব-১জাতীয় জাদুঘরের উপ-কীপার নাসিরের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ নির্বিকার


নাছির উদ্দিন আহমেদ খান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগে উপ-কীপার (ডেপুটি কীপার) হিসেবে কর্মরত আছেন। আপাদমস্তক নিপাট ভদ্রলোক বলে মনে হলেও পর্দার আড়ালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তার বেপরোয়া আচরণ এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দরুণ কর্মস্থলের সহকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন সহকর্মীরা।

একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, নাসিরের বিরুদ্ধে নিজ কর্মস্থলে নারী সহকর্মীদের সাথে অশ্লীল আচরণ ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার, বেশ কয়েকজন নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানী, উর্ধতন মহলে জাদুঘরের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য সম্বলিত বেনামী চিঠি, উড়ো চিঠি প্রেরণ এবং কর্মস্থলে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

এখানেই শেষ নয়, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এড়ানোর গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

বেনামী চিঠি দিয়ে হয়রানি

সূত্র মতে, নাসির উদ্দিন আহমেদ খান ২০০০ সালের ২৫শে জানুয়ারি চট্রগ্রামের জিয়া জাদুঘরে সহকারী ডিসপ্লে অফিসার পদে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই জাদুঘরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অসত্য ও অবাস্তব তথ্যসম্বলিত বেনামী চিঠি প্রেরণ করতে থাকেন। এমনই এক চিঠির বিষয়ে ২০০৮ সালে জাদুঘরের তৎকালীন সচিব মো: আব্দুল বারী তদন্ত শুরু করেন। তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে নাসির উদ্দিন দোষী সাব্যস্ত হন।

পরবর্তীতে, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ১০৪তম সভায় অভিযুক্ত নাসির উদ্দিরের চাকুরী স্থায়ীকরণ স্থগিত করে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এসময় নাসির উদ্দিনকে কর্মস্থলে আচরণগত ত্রুটি নিরসন সাপেক্ষে চাকুরী স্থায়ী করার আশ্বাস দেয়া হয়।

একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, উর্ধতন কর্তৃপক্ষের এমন নমনীয়তা স্বত্বেও নাসির উদ্দিন খানের আচরণ অদ্যাবধি ঠিক হয়নি। অতীতের ন্যায় এখনও নাসির নামে-বেনামে জাদুঘরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্যসম্বলিত বেনামী চিঠি জাদুঘরের মহাপরিচালক, মন্ত্রণালয় ও পর্ষদ সদস্যদের নিকট প্রায়শই প্রেরণ করে থাকেন। এমনকি অন্য প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অভিযোগপত্র প্রেরণ এবং বিভিন্ন গনমাধ্যমে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে বিতর্কিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, নাসিরের এহেন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সত্বেও এই বিষয়ে বারংবার তাকে শুধু সতর্কই করেছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। মূলত দৃশ্যমান কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় দিন দিন এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন অভিযুক্ত নাসির।

নারী সহকর্মীদের যৌন হয়রানি

বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জাতিতত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগে কর্মরত নাসিরের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণ, অশ্লীল দৃষ্টিভঙ্গি, শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করা ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের মতো ঘৃন্য অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নাসির উদ্দিনের একাধিক নারী সহকর্মী বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাবের নিকট উল্লেখিত বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের আর্জি জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

সূত্রানুযায়ী, অভিযোগকারীরা হচ্ছেন জাদুঘরের সনমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগের সহকারী কীপার সুস্মিতা বিশ্বাস, জাতিতত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের সহকারী কীপার লাকী বিশ্বাস, জাতিতত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের সহকারী কীপার জান্নাতুন নাঈম।

পৃথকভাবে প্রেরিত উক্ত লিখিত অভিযোগে তারা উল্লেখ করেন, জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগে উপ-কীপার (ডেপুটি কীপার) নাসির উদ্দিন আহমেদ খান কর্মস্থলের নারী সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণ, পোশাক নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, গালাগাল এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে থাকেন। তার এমন অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে অনেক নারী সহকর্মী প্রতিনিয়ত কর্মস্থলে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

জাদুঘরের সনমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগের সহকারী কীপার সুস্মিতা বিশ্বাস লিখিত অভিযোগে নাসিরের বিরুদ্ধে পরিধেয় পোষাক নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য এবং কুদৃষ্টিতে তাকানোর অভিযোগ করেছেন। তার কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ইভটিজিং এর শামিল।

নাসিরের এহেন কর্মকাণ্ডের দরুণ তিনি নিজেকে কর্মস্থলে অনিরাপদ মনে করার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে বিব্রতবোধ করছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন সুস্মিতা।

অন্যদিকে, জাতিতত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের দুই সহকারী কীপার লাকী বিশ্বাস ও জান্নাতুন নাঈম দাপ্তরিক কাজে স্টোর বা গ্যালারিতে যাওয়ার সময় নাসির উদ্দিন সচেতনভাবে তাদের শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করে থাকেন বলে অভিযোগ করেছেন।একইরকম ঘটনা আরও বেশ কয়েকজন নারী সহকর্মীর সাথেও ঘটেছে বলে উল্লেখ করেছেন তারা।

এই বিষয়ে প্রতিবাদ করায় নাসির উদ্দিন লাকী বিশ্বাস ও জান্নাতুন নাঈমের সাথে সবার সামনে চরম দুর্ব্যবহার ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগী ঐ দুই নারীকর্মী।

অসদাচরণ ও বাজে মন্তব্য

শুধু তাই নয়, সহকারী কীপার লাকী বিশ্বাসের স্বামী বিধান চন্দ্র হালদারকে উদ্দেশ্য করেও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন নাসির উদ্দিন। তার এই ঘৃন্য আচরণের শিকার হয়েছেন জাদুঘরের সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ বিলকিস সুলতানা সহ একাধিক নারী কর্মকর্তা।

অভিযোগ সূত্রে আরও জানা গেছে, নাসির উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরেই এহেন জঘন্য কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। এতে করে জাতীয় জাদুঘর কার্যালয়ের কর্মপরিবেশ নষ্ট হতে বসেছে। তার এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় জাদুঘরের আরেক উপ-কীপার গোলাম কাউসারকে দিয়ে সহকারী কীপার জান্নাতুন নাঈমকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করান এবং দেখে নেয়ার হুমকিও দেন অভিযুক্ত নাসির।

কর্মস্থলে মাদক সেবন

অভিযোগ সূত্রে আরও জানা গেছে, অফিস চলাকালীন নাসির উদ্দিন তার একাধিক পুরুষ সহকর্মী (ওবায়দুল্লাহ, গোলাম কাউসার, ইকবাল হাসান)-কে নিয়ে ডিসপ্লে কর্মকর্তার কক্ষে বসে ধূমপান ও মদ্যপান করে থাকেন। এরকম একটি মুহুর্তে দাপ্তরিক কাজের অংশ হিসেবে নকশীকাথা নিদর্শনের ছবি তোলার কথা বলাতে নাসির উদ্দিন সবার সামনেই জান্নাতুন নাঈমের সাথে অশোভন আচরণ করেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।

শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ড

সূত্র মতে, নাসির উদ্দিন অফিস চলাকালীন ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না এবং অফিসেও থাকেন না। প্রায়শই তিনি অফিসে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বাইরে চলে যান এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকেন।

এছাড়াও, নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও বেশকিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ও তথ্যসূত্র এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। এই বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান সাপেক্ষে বিস্তারিত পরবর্তীতে প্রকাশিত হবে।

এসব বিষয়ে জানতে জাতীয় জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগে উপ-কীপার (ডেপুটি কীপার) নাসির উদ্দিন আহমেদ খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কর্মস্থলে আমার ক্রমাগত উন্নতি এবং উচ্চমহলের সাথে সুসম্পর্ক থাকায় সহকর্মীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে এসব মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ করছে।

এদিকে, নারী সহকর্মীদের যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের ক্ষেত্রে করনীয় বিষয়ে জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণ, অশালীন আচরণ বা যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়ার পর কালবিলম্ব না করে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অনুসন্ধান শুরু করা উচিৎ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (যেমন- তিরস্কার, পদাবনতি, বা সাময়িক বরখাস্ত) নিতে হবে। আর যদি ভুক্তভোগী আইনগত ব্যবস্থা নিতে চান সেক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারেন।

কর্মস্থলে সহকর্মীদের প্রতি এহেন অসৌজন্যমূলক ও মানহানিকর আচরণ সরকারি কর্মচারীর নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব লঙ্ঘনের শামিল। এই ধরনের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত নাসির উদ্দিন আহমেদ খানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্তপূর্বক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহন এখন সময়ের দাবি।

এদিকে, অভিযুক্ত নাসির উদ্দিন আহমেদ খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে দ্য ফিন্যান্স টুডের একটি চৌকস টীম প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এফটি টীমের সামনে। ইতিমধ্যে নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত অভিযুক্ত নাসির উদ্দিনকে নিয়ে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের আগামী পর্বে প্রকাশ করা হবে।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.