May 17, 2026, 6:18 am


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-05-16 21:19:13 BdST

নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে কোম্পানি || মিথ্যা ঘোষণায় পন্য আমদানি করে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি || নেপথ্যে বিগত দুই সরকারের শীর্ষব্যক্তিগণদুদকের গাফিলতিতে স্মার্ট টেকনোলজির অর্থপাচারের অভিযোগ হিমঘরে


দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম শীর্ষ আইটি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো: মাজহারুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে 'সনি' ব্র‍্যান্ডের ইলেকট্রনিকস সামগ্রী (এলইডি টিভি, অডিও ভিডিও) আমদানি করে কয়েকশো কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং স্থানীয় সোর্স থেকে বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের লোগো বসিয়ে টিভি, ফ্রীজ, এসিসহ বিভিন্ন পন্য ক্রয়কালে ভ্যাট ফাঁকির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন।

একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ৫ আগশ  স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি, বীমা ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে বরাদ্দের অতিরিক্ত আড়াই কোটি টাকা লোপাট, ৯ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলারের (১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা) একটি প্রকল্পের ২০ শতাংশ কাজ না করেই বিলের পুরো অর্থ তুলে নেয়া এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক ক্রয়াদেশে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেন্ডার বানিজ্য করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থেকে আনুমানিক দশ হাজার কোটি টাকা বিদেশী ৩ রাষ্ট্রে পাচারের অভিযোগ পাওয়া যায়।

স্মার্ট টেকনোলজিসের এসব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অনিয়ম, রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে ২০২৪ সালের ৩১ অগাস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন বাংলাদেশে সনি ব্র‍্যান্ডের ইলেকট্রনিকস পন্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং বৈষম্যবিরোধী সুশীল সমাজের প্রতিনিধি জগলুল হাবিব।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রায় এক বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়েই যাচ্ছে। তদন্তে দীর্ঘ সময় পার হলেও দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি না হওয়ায় জনমনে এনিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

অতীতের যত অভিযোগ

সূত্র মতে, স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ইলেকট্রনিকস পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে বিদেশে অর্থপাচার এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ডেটাসেন্টার স্থাপন প্রকল্প থেকে অন্তত ৮০০কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে অনুসন্ধান করছে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন যে, এই প্রতিষ্ঠানটি তথাকথিত মোবাইল সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থেকে অবৈধভাবে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (NEIR) বা তথ্যভান্ডার ব্যবস্থা কুক্ষিগত করার নেপথ্য পরিকল্পনায় কাজ করছে।

এছাড়াও, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় স্বৈরাচারী সরকারকে অর্থ সহায়তা দেওয়া এবং হত্যাচেষ্টার মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্বেও স্মার্ট টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম কোন দৈব শক্তির আশীর্বাদ ও সহযোগিতায় এখনও মুক্ত অবস্থায় চলাফেরা করছেন; সেই বিষয়েও হতাশা ব্যক্ত করেছেন তারা।

চাঞ্চল্যকর এসব অভিযোগের বিষয়ে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র একটি চৌকস টীম স্মার্ট টেকনোলজি লিমিটেডের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করে। ইতিমধ্যে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী উত্থাপিত অভিযোগসমূহের সারসংক্ষেপ আজ প্রকাশ করা হলো। আগামী পর্বে অভিযুক্তদের অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হবে।

মূল অভিযুক্ত

স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, চেয়ারম্যান মো: মাজহারুল ইসলাম, পরিচালক মো. তানভীর হোসেন এবং মার্কেটিং ও কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স সেকশনের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ জুবায়ের হোসেন।

নেপথ্যের মদতদাতা

বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তৎকালীন সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও তার মেয়ে নাফিসা কামাল, সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ হুমায়ুন, সাবেক প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নজরুল ইসলাম হাজরা (মুন্নু), প্রাক্তন সিনিয়র গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার, সাবেক সিআইডি প্রধান এডিশনাল আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া, এডিশনাল আইজিপি শাহাবুদ্দিন এবং ঢাকা পশ্চিমের কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনার আবুল বাশার মো: শফিকুর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপে সিন্ডিকেট করে স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেড সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বৃহৎ অংশ দুবাই, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কে পাচার করেছে।

সূত্র মতে, উক্ত মদতদাতাদের মধ্যে শুধু নাফিসা কামালের নেতৃত্বেই তারা ৬৭ মিলিয়ন ডলারেরও (৮০০ কোটি টাকা) বেশি অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছেন। বাকীদের বিষয়ে :দ্য ফিন্যান্স টুডে'র বিশেষ অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।

এই অভিযোগগুলো সরকার থেকে প্রাপ্ত নথি, মিডিয়া রিপোর্ট এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্ত থেকে উঠে এসেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং অপরাধের পরিধি বোঝায়।

দেশীয় ব্যবসার আড়ালে বিদেশি প্রতিষ্ঠান

আগারগাঁওয়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটির অন্যতম পুরনো প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিস নব্বইয়ের দশকে কম্পিউটার বিক্রির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা প্রযুক্তি খাত ছাড়িয়ে খাদ্য ও নির্মাণ খাতেও বিস্তৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে অংশীদারিত্বও রয়েছে তাদের।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারের অনুমোদন ছাড়াই ২০০৯ সালে সিঙ্গাপুরে ‘স্টারসিড টেকনোলজি’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন জহিরুল ও মাঝহারুল ইসলাম। কোম্পানিটির প্রাথমিক মূলধন ছিল ছয় মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮ কোটি টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে প্রযুক্তিপণ্য সরবরাহের ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা, যেখানে দুই ভাইয়ের মালিকানা সমান।

সিঙ্গাপুরের সরকারি নথি অনুযায়ী, কোম্পানিটি তুরস্কের নাগরিক পরিচয় ব্যবহার করে নিবন্ধন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধরনের নাগরিক পরিচয় অর্জনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে।

দুবাইয়েও দুই প্রতিষ্ঠান

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়েও ইসলাম ব্রাদার্সের নামে দুটি কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর একটি ‘সিমাল টেকনোলজি মিডল ইস্ট’, যা ২০০২ সালে নিবন্ধিত হয়। এতে জহিরুল ইসলামের মালিকানা ১৫ শতাংশ এবং মাজহারুল ইসলামের মালিকানা ৮৫ শতাংশ। এই কোম্পানিটির ব্যবসা আফ্রিকাসহ তিন মহাদেশে বিস্তৃত বলে জানা গেছে।

এছাড়া ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘টুইনমস টেকনোলজি মিডল ইস্ট’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্রি-জোন এলাকায় অবস্থিত। এই কোম্পানির ব্যবসাও একাধিক দেশে বিস্তৃত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এনবিআরের নথিতে নেই তথ্য

এসব বিদেশি বিনিয়োগ ও আয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের কাছে তথ্য জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জহিরুল ইসলাম বা তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে ব্যবসা পরিচালনার কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি আয়কর নথিতেও এসব কোম্পানি থেকে অর্জিত আয়ের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এই বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও জহিরুল ইসলামের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিদেশি সংস্থার যোগসূত্র

এই সিন্ডিকেটের আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম আলোচিত দিক হলো বিদেশি সফটওয়্যার কোম্পানির সম্পৃক্ততা। চীনা সফটওয়্যার কোম্পানি সিনোসফটের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আড়ালে নাফিসা কামাল ও স্মার্ট টেকনোলজিসের সিন্ডিকেট বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে।

সিনোসফটের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে লেনদেনের আড়ালে দেশের সম্পদ পাচার করে সিন্ডিকেট তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছে।

বীমা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ

সূত্র মতে, স্মার্ট সিন্ডিকেট করে স্মার্ট টেকনোলজিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন প্রকল্পের ৬৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) হাতিয়ে নিয়ে পাচার করেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়ে নাফিসা কামাল।

আওয়ামী আমলে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রায় ১০টি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পেয়েছিল নাফিসা কামালের এনকে সফট, স্মার্ট টেকনোলজি, চীনের সিনোসফট, সিএনএস, ইএসএল, শামীম আহসান ই-জেনারেশন। নাফিসা কামালের সঙ্গে স্মার্ট টেকনোলজির সম্পর্কের কারণে এসব প্রকল্পের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। অর্থমন্ত্রীর মেয়ের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তখন মুখ খোলার সাহস পাননি প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামান। তিনিও কাজ করেছেন সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে।

বরাদ্দের অতিরিক্ত আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ 

নথি বলছে, ২০২২ সালের ৩০ মার্চ আইটি অ্যান্ড সাপোর্টিং নেটওয়ার্ক ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিস্টেম, সার্ভার ও স্টোরেজ সরবরাহের জন্য দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা (এল-ও) হলেও ১০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের কাজ দেওয়া হয় স্মার্ট টেকনোলজিকে। আওয়ামী লীগের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা স্মার্ট টেকনোলজিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত আরও ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেন কামরুজ্জামান।

কাজ না করেই পুরো টাকা উত্তোলন

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), সাধারণ বিমা করপোরেশন এবং জীবন বিমা করপোরেশনের আইটি সাপোর্টিং পাওয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচারের নামে ৯ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলারের আরও একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দেওয়া হয় স্মার্ট টেকনোলজিকে।

এই প্রকল্পের সর্বনিম্ন দ্বিতীয় দরদাতা (এল-২) ছিল স্মার্ট টেকনোলজি। প্রকল্পের ২০ শতাংশ কাজ না করেই বরাদ্দের পুরো ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে স্মার্ট টেকনোলজি।

সূত্র মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ সময়ে গত ২০ জুন তাড়াহুড়ো করে স্মার্ট টেকনোলজির ঠিকানায় এনকে সফট এবং সিনোসফটের জয়েন্ট ভেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ডলার ছাড় করে নাফিসা কামালের নিয়ন্ত্রিত প্রকল্প পরিচালক। ডলারের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২ কোটি ৩১ লাখ টাকাও বরাদ্দ দেওয়া হয় এই প্রতিষ্ঠানকে।

বিতর্কিত সরকারি ক্রয়

দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরও বিতর্কিত স্মার্ট টেকনোলজিস থেকে সরকারি বিভিন্ন ক্রয়ের (যেমন: পুলিশের জন্য বডিওর্ন ক্যামেরা) কাজ নেওয়া হয়েছে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের কোনো কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বা সরকারি প্রকল্প কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে, যা দুদকের মতো স্বাধীন তদন্ত সংস্থার নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকি

স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড' এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভুল তথ্য (মিসডিক্লারেশন) দিয়ে নামে-বেনামে সনি ব্র‍্যান্ডের ইলেকট্রনিকস সামগ্রী (এলইডি টিভি, অডিও ভিডিও) আমদানি করে কয়েকশো কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং স্থানীয় সোর্স থেকে বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের লোগো বসিয়ে টিভি, ফ্রীজ, এসিসহ বিভিন্ন পন্য ক্রয়কালে ভ্যাট ফাঁকির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

নিয়মানুযায়ী, বিদেশ থেকে পণ্য আনার সময় আমদানিকারককে বিস্তারিত বিবরণসহ নানা তথ্য ঘোষণা দিতে হয়। সেই অনুযায়ী পণ্যের শুল্কায়ন আর কায়িক পরীক্ষা করে কাস্টমস। আর যাবতীয় খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিএন্ডএফ এজেন্ট। এক্ষেত্রে দেখা যায়, আমদানিকারকের দেয়া তথ্যের সাথে পণ্যের মিল না থাকার পাশাপাশি এক ধরনের পণ্যের পরিবর্তে ভিন্ন জিনিস। ওজন বা পরিমাণে থাকে হেরফের। আর এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন করা হয় এইচ এস কোড।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কাস্টমস কমিশনার বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা সবসময় রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ খোঁজে। কেউ কেউ লিপ্ত থাকে মূল্য কম দেখিয়ে অর্থ পাচারে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনও না কোনভাবে সম্পৃক্ত থাকে কাষ্টমসেরই কিছু অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাবেক কমিশনার মো. ফখরুল আলম বলেন, আমদানি পর্যায়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকিও কিন্তু এক ধরনের চোরাচালান। এই চোরাচালানকে যদি কঠোর হস্তে দমন করতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন। এদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে পুলিশি ব্যবস্থা নিতে হবে, জেল-জরিমানা করতে হবে। যখন তাদের জেল-জরিমানা করা হবে তখন আস্ত আস্তে এগুলো বন্ধ হবে।

দায় অস্বীকার

স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ পাচার ও প্রকল্প আত্মসাতের অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করেছে এবং এসব অভিযোগের আইনি জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে নাফিসা কামাল এবং স্মার্ট টেকনোলজিসের চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলামের বক্তব্য জানার চেষ্টায় তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও কেউই কল রিসিভ করেননি।

তদন্তে স্থবিরতা

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুমতি ছাড়াই সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হলেও এসব কোম্পানির বিনিয়োগ ও আয়ের কোনো তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথিতেই নেই। এই বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান সাপেক্ষে অদ্যাবধি কোনও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অভিযোগের তদন্তে দুদকের ধীরগতি এবং গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অংশীজনেরা।

অভিযোগ রয়েছে যে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের তদবির এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়াটি স্থবির বা ধীরগতির হয়ে পড়ে

উল্লেখ্য, জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ সহকারী পরিচালক হফিজুর রহমানকে এই অনুসন্ধানের কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি অবসরে চলে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত এই তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিশ্লেষকদের অভিমত

আইডিআরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন বছরের জন্য বিমা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও আর্থিক সুরক্ষা খাতের অবস্থা আগের মতোই রয়েছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সপরিবারে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়েছেন লোটাস কামাল এবং তার মেয়ে নাফিসা কামাল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) এক সাবেক সভাপতি বলেন, বীমা উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের অগ্রগতি না হলেও অর্থ তুলে নেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আরেকটা বিষয় হলো এখানে কয়েকটি বিদেশি সফটওয়্যার কোম্পানির অংশগ্রহণ। ফলে বিদেশের টাকা বিদেশেই চলে গেছে। বীমা উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সাপোর্ট সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ দেশি প্রতিষ্ঠান করলে ৩০ কোটি টাকা সমমানের ডলার সাশ্রয় হতো বলে মনে করেন তিনি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অর্থপাচারের প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াও অব্যাহত রাখতে হবে।”

রাজনীতির প্রভাব এবং সম্পদের লুটপাট

স্মার্ট টেকনোলজিসের ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির পেছনে রাজনীতির একটি গভীর প্রভাব রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্মার্ট টেকনোলজিস এবং নাফিসা কামালের মতো কোম্পানিগুলোর সাথে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তারা সব ধরনের সুবিধা পেয়েছে। ফলে সরকার তাদের কার্যক্রমের ওপর তেমন কোনো নজরদারি করেনি।

প্রতিকারের জন্য করণীয়

এই ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আর্থিক নিরাপত্তার প্রতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারের উচিত দ্রুত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের কেলেঙ্কারি আর না ঘটে। এছাড়া, প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের আরো স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিচার এবং শাস্তির দাবি

দেশের সম্পদ লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে এই ধরনের দুর্নীতি থামানো সম্ভব হবে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে বিচারব্যবস্থা এবং সরকারের দুর্নীতি দমন বিভাগকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় দেশের বাইরে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে।এই কেলেঙ্কারি শুধু একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং এটি দেশের জনগণের প্রতি এক ভয়াবহ প্রতারণা।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.