May 16, 2026, 10:31 pm


বিশেষ প্রতিবেদক

Published:
2026-05-16 21:19:13 BdST

নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে কোম্পানি || মিথ্যা ঘোষণায় পন্য আমদানি করে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি || নেপথ্যে পতিত সরকারের শীর্ষ নেতৃবৃন্দদুদকের গাফিলতিতে স্মার্ট টেকনোলজির অর্থপাচারের অভিযোগ হিমঘরে (১ম পর্ব)


দুদকের গাফিলতিতে স্মার্ট টেকনোলজির অর্থপাচারের অভিযোগ হিমঘরে

নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে কোম্পানি || মিথ্যা ঘোষণায় পন্য আমদানি করে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি || নেপথ্যে পতিত সরকারের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম শীর্ষ আইটি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো: মাজহারুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) টেবিলে প্রায় এক বছর ধরেই অনুসন্ধানের পর্যায়েই রয়েছে। তদন্তে দীর্ঘ সময় পার হলেও দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি না হওয়ায় জনমনে এনিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

উত্থাপিত অভিযোগ

সূত্র মতে, স্মার্ট টেকনোলজিস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ইলেকট্রনিকস পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে বিদেশে অর্থপাচার এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ডেটাসেন্টার স্থাপন প্রকল্প থেকে অন্তত ৮০০কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে অনুসন্ধান করছে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন যে, এই প্রতিষ্ঠানটি তথাকথিত মোবাইল সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থেকে অবৈধভাবে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (NEIR) বা তথ্যভান্ডার ব্যবস্থা কুক্ষিগত করার নেপথ্য পরিকল্পনায় কাজ করছে।

এছাড়াও, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় স্বৈরাচারী সরকারকে অর্থ সহায়তা দেওয়া এবং হত্যাচেষ্টার মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্বেও স্মার্ট টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম কোন দৈব শক্তির আশীর্বাদ ও সহযোগিতায় এখনও মুক্ত অবস্থায় চলাফেরা করছেন; সেই বিষয়েও হতাশা ব্যক্ত করেছেন তারা।

চাঞ্চল্যকর এসব অভিযোগের বিষয়ে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'র একটি চৌকস টীম স্মার্ট টেকনোলজি লিমিটেডের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করে। ইতিমধ্যে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী উত্থাপিত অভিযোগসমূহের সারসংক্ষেপ দুই পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো।

দেশীয় ব্যবসার আড়ালে বিদেশি প্রতিষ্ঠান

আগারগাঁওয়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটির অন্যতম পুরনো প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিস নব্বইয়ের দশকে কম্পিউটার বিক্রির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা প্রযুক্তি খাত ছাড়িয়ে খাদ্য ও নির্মাণ খাতেও বিস্তৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে অংশীদারিত্বও রয়েছে তাদের।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারের অনুমোদন ছাড়াই ২০০৯ সালে সিঙ্গাপুরে ‘স্টারসিড টেকনোলজি’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন জহিরুল ও মাঝহারুল ইসলাম। কোম্পানিটির প্রাথমিক মূলধন ছিল ছয় মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮ কোটি টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে প্রযুক্তিপণ্য সরবরাহের ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা, যেখানে দুই ভাইয়ের মালিকানা সমান।

সিঙ্গাপুরের সরকারি নথি অনুযায়ী, কোম্পানিটি তুরস্কের নাগরিক পরিচয় ব্যবহার করে নিবন্ধন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধরনের নাগরিক পরিচয় অর্জনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে।

দুবাইয়েও দুই প্রতিষ্ঠান

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়েও ইসলাম ব্রাদার্সের নামে দুটি কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর একটি ‘সিমাল টেকনোলজি মিডল ইস্ট’, যা ২০০২ সালে নিবন্ধিত হয়। এতে জহিরুল ইসলামের মালিকানা ১৫ শতাংশ এবং মাজহারুল ইসলামের মালিকানা ৮৫ শতাংশ। এই কোম্পানিটির ব্যবসা আফ্রিকাসহ তিন মহাদেশে বিস্তৃত বলে জানা গেছে।

এছাড়া ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘টুইনমস টেকনোলজি মিডল ইস্ট’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্রি-জোন এলাকায় অবস্থিত। এই কোম্পানির ব্যবসাও একাধিক দেশে বিস্তৃত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এনবিআরের নথিতে নেই তথ্য

এসব বিদেশি বিনিয়োগ ও আয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের কাছে তথ্য জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জহিরুল ইসলাম বা তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে ব্যবসা পরিচালনার কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি আয়কর নথিতেও এসব কোম্পানি থেকে অর্জিত আয়ের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এই বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও জহিরুল ইসলামের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বীমা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ

সূত্র মতে, স্মার্ট সিন্ডিকেট করে স্মার্ট টেকনোলজিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিমা উন্নয়ন প্রকল্পের ৬৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) হাতিয়ে নিয়ে পাচার করেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়ে নাফিসা কামাল।

আওয়ামী আমলে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রায় ১০টি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পেয়েছিল নাফিসা কামালের এনকে সফট, স্মার্ট টেকনোলজি, চীনের সিনোসফট, সিএনএস, ইএসএল, শামীম আহসান ই-জেনারেশন। নাফিসা কামালের সঙ্গে স্মার্ট টেকনোলজির সম্পর্কের কারণে এসব প্রকল্পের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। অর্থমন্ত্রীর মেয়ের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তখন মুখ খোলার সাহস পাননি প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামান। তিনিও কাজ করেছেন সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে।

বিতর্কিত সরকারি ক্রয়

দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরও বিতর্কিত স্মার্ট টেকনোলজিস থেকে সরকারি বিভিন্ন ক্রয়ের (যেমন: পুলিশের জন্য বডিওর্ন ক্যামেরা) কাজ নেওয়া হয়েছে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের কোনো কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বা সরকারি প্রকল্প কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে, যা দুদকের মতো স্বাধীন তদন্ত সংস্থার নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকি

স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড' এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভুল তথ্য (মিসডিক্লারেশন) দিয়ে নামে-বেনামে সনি ব্র‍্যান্ডের ইলেকট্রনিকস সামগ্রী (এলইডি টিভি, অডিও ভিডিও) আমদানি করে কয়েকশো কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং স্থানীয় সোর্স থেকে টিভি, ফ্রীজ, এসিসহ বিভিন্ন পন্য ক্রয়কালে ভ্যাট ফাঁকির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

নিয়মানুযায়ী, বিদেশ থেকে পণ্য আনার সময় আমদানিকারককে বিস্তারিত বিবরণসহ নানা তথ্য ঘোষণা দিতে হয়। সেই অনুযায়ী পণ্যের শুল্কায়ন আর কায়িক পরীক্ষা করে কাস্টমস। আর যাবতীয় খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিএন্ডএফ এজেন্ট। এক্ষেত্রে দেখা যায়, আমদানিকারকের দেয়া তথ্যের সাথে পণ্যের মিল না থাকার পাশাপাশি এক ধরনের পণ্যের পরিবর্তে ভিন্ন জিনিস। ওজন বা পরিমাণে থাকে হেরফের। আর এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন করা হয় এইচ এস কোড।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কাস্টমস কমিশনার বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা সবসময় রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ খোঁজে। কেউ কেউ লিপ্ত থাকে মূল্য কম দেখিয়ে অর্থ পাচারে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনও না কোনভাবে সম্পৃক্ত থাকে কাষ্টমসেরই কিছু অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাবেক কমিশনার মো. ফখরুল আলম বলেন, আমদানি পর্যায়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকিও কিন্তু এক ধরনের চোরাচালান। এই চোরাচালানকে যদি কঠোর হস্তে দমন করতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন। এদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে পুলিশি ব্যবস্থা নিতে হবে, জেল-জরিমানা করতে হবে। যখন তাদের জেল-জরিমানা করা হবে তখন আস্ত আস্তে এগুলো বন্ধ হবে।

দায় অস্বীকার

স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ পাচার ও প্রকল্প আত্মসাতের অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করেছে এবং এসব অভিযোগের আইনি জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে স্থবিরতা

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুমতি ছাড়াই সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হলেও এসব কোম্পানির বিনিয়োগ ও আয়ের কোনো তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথিতেই নেই। এই বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান সাপেক্ষে অদ্যাবধি কোনও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অভিযোগের তদন্তে দুদকের ধীরগতি এবং গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অংশীজনেরা।

অভিযোগ রয়েছে যে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের তদবির এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়াটি স্থবির বা ধীরগতির হয়ে পড়ে

উল্লেখ্য, জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ সহকারী পরিচালক হফিজুর রহমানকে এই অনুসন্ধানের কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি অবসরে চলে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত এই তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অর্থপাচারের প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াও অব্যাহত রাখতে হবে।”

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.