S M Fatin Shadab
Published:2026-01-18 13:36:45 BdST
৩৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ধরার কাজে স্থবিরতা
সারাদেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রায় ৩৯ হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম-দুর্নীতি, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম ও জাল সনদ শনাক্ত করার দায়িত্ব পালন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। অথচ এই অধিদপ্তরেই দীর্ঘদিনের চর্চা হচ্ছে দায়িত্বে অবহেলার পাশাপাশি নানা অনিয়ম, উঠেছে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ। জানা গেছে, ডিআইএর অধিকাংশ কর্মকর্তারা বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে না গিয়ে অফিসে খোশগল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় গত এক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে অনিয়ম-দুর্নীতি কম ধরা পড়ছে। মাঝেমধ্যে পরিদর্শনে গেলেও ঘুষ গ্রহণ করে, অনিয়ম নেই বলে রিপোর্ট দেন একশ্রেণির কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, জুনিয়র কর্মকর্তাদের দাবিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে একশ্রেণির সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিআইএ। দপ্তরটিতে একজন পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক, চার জন উপপরিচালক, ১২ জন পরিদর্শক ও ১২ জন সহকারী পরিদর্শকসহ মোট ৩০ কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। এছাড়া অডিট দপ্তর থেকে চার জন অডিট অফিসার এবং নিজস্ব জনবল থেকে ৯ জন অডিটর দায়িত্ব পালন করেন। এদের মধ্যে কিছু কর্মকর্তার নেতৃত্বে শক্তিশালী ঘুষ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা অফিসে বসেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন। বিনিময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করেন। এতে জুনিয়র অফিসাররা প্রতিবাদ করতে গেলেই নানা হয়রানির শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, ডিআইএর কর্মকর্তারা অফিসের কাজ না করে সারা দিন ব্যাচমেটদের সঙ্গে আড্ডা, তদবির, পদোন্নতি, পদায়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। যে কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি শনাক্তে ভাটা পড়েছে। তবে ডিআইএ কর্মকর্তারা দাবি করেন, প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সংখ্যা কমলেও সঠিকভাবে প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। এর ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। ডিআইএ কর্মকর্তাদের এই পরিদর্শন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পরিচিত ‘মিনিস্ট্রি অডিট’ নামে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, যাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে শিক্ষা ক্যাডারে। এদিকে ডিআইএর পাঁচ কর্মকর্তার বদলি নিয়েও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ছয় থেকে আট মাস ধরে কর্মরতদের বদলি করা হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন সাত বছর ধরে একজন সহকারী পরিদর্শক। তিনি ২০১৮ সালে ডিআইএতে যোগ দেন। জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে ডিআইএতে কর্মরত পাঁচ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। পরে অবশ্য একজনের বদলি স্থগিত করা হয়। বাকি চার কর্মকর্তার সবাই ছয় থেকে আট মাস ধরে ডিআইএতে কর্মরত ছিলেন।
জানা গেছে, ডিআইএর একাধিক শিক্ষা পরিদর্শক ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গিয়ে নিরীক্ষার নামে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে এক সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়েছে। পরিদর্শনে গিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আরেক শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে। এর বাইরে ডিআইএর আরো কয়েক কর্মকর্তা ও অডিট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নিরীক্ষার নামে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে কয়েক জন কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে সতর্কও করেছেন ডিআইএর পরিচালক। এসব বিষয়ে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।
ডিআইএর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিআইএ কর্মকর্তারা ঘুষ লেনদেন করেন খুব সতর্কভাবে। ২০১৭ সালে ৩ লাখ টাকা ঘুষসহ দুদকের হাতে গ্রেফতার হন মুস্তাফিজুর রহমান নামে একজন শিক্ষা পরিদর্শক। এরপর ঘুষ নেওয়ার ধরন বদলে ফেলেন কর্মকর্তারা। অডিট শুরু পর প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের সঙ্গে রেস্ট হাউজ বা অন্য গোপন স্থানে ঘুষের রেট ঠিক করে ঢাকায় চলে আসেন কর্মকর্তারা। তার আগে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রথমে নিয়োগসহ অন্য প্রশাসনিক দুর্বলতার কথা বলে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করেন। প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে তাদের বার্তা দেন প্রকৃত অডিট হলে বহু শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগে জটিলতা ধরা পড়বে, বেতন বন্ধ হবে, এমনকি চাকরিও চলে যেতে পারে। শিক্ষকরাও ঝামেলা এড়াতে ঘুষ দিতে রাজি হন। বিশেষ করে অধ্যক্ষরা প্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের আর্থিক দুর্নীতিতে যুক্ত থাকায় নিজে বাঁচতে ঘুষের টাকা সংগ্রহ করেন দেন। এরপর সেই টাকা ঢাকা বা আশপাশের কোনো অজ্ঞাত স্থান থেকে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে নেওয়া হয়। এদিকে ডিআইএ নামে পরিচিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে এবার দেওয়া হয়েছে কঠোর বার্তা। কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে যদি কেউ কোনো প্রকার টাকা সংগ্রহ করে তাহলে অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
ডিআইএর একজন কর্মকর্তা বলেন, গত এক বছরে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে ৪০০র বেশি জাল ও ভুয়া সনদ চিহ্নিতকরণ, প্রায় ৩০০র বেশি অগ্রহণযোগ্য সনদ চিহ্নিত ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া ৭৯৩ একর জমি উদ্ধারে সুপারিশ প্রদান, ভুয়া নিয়োগ, অর্থ আত্মসাত্ এবং ভ্যাট ও আইটিসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।
Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.
