February 21, 2026, 4:48 pm


সামিউর রহমান লিপু

Published:
2026-02-19 01:49:58 BdST

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনএবার লড়াই হবে মেয়র পদে


সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হতেই আলোচনা শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একমাত্র চট্টগ্রাম বাদে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন চলছে প্রশাসক দিয়ে। তাই এখন আলোচনা চলছে কারা হচ্ছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নগরপিতা।

এই আলোচনার মধ্যেই ১৮ ফেব্রুয়ারী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য চিঠি এসেছে। এই বিষয়টি কমিশনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। আগামী সপ্তাহে কমিশনের সভায় ঠিক হবে নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনাও।

আরও পড়ুন: ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে ইসিকে চিঠি

এই চিঠির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হতেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কারা করবেন; এনিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ কেউ তাদের নিজস্ব মতামত দিচ্ছেন, আবার কেউ জানাচ্ছেন তার নিজের পছন্দের প্রার্থীর নাম। কেউ আবার কার সঙ্গে কার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে ভালো হবে- তা নিয়েও ফেসবুকে পোস্ট করছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বিষয়ে চিঠি পেয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রস্তুতিও এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আমরা হয়তোবা আাগমী সপ্তাহের মধ্যে কমিশনে বৈঠক করে বিস্তারিত পরিকল্পনা নেবো।  

তিনি আরও বলেন, অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং দক্ষদেরই এই নির্বাচনে দায়িত্ব দেয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেমন আমরা প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করতে পেরেছি, ভবিষ্যতেও আরও নিরপেক্ষতার প্রমাণ আমরা রাখবো।

ইতোমধ্যেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বেশ কয়েকটি দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম নিয়ে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এছাড়া, স্বতন্ত্র হিসেবেও কেউ কেউ নির্বাচন করতে পারেন বলে আলোচনা চলছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. এম এ কাইয়ুম।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবদুস সালাম। তিনি ঢাকা-১৭ আসনের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন।

এই ব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গণমাধ্যমে বলেন, "নির্বাচন কমিশন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলীয় ফোরামে এই বিষয়ে আলোচনা করব। ফোরামে আলোচনা সাপেক্ষেই মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণ করবে বিএনপি।"

জামায়াতের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নাম এসেছে ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীনের। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. আবদুল মান্নানের নাম আলোচনায় রয়েছে।

তবে, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। অন্যদিকে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলামকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী করার বিষয়ে দলীয় বেশ কয়েকটি ফোরামে জোর আলোচনা চলছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন বলেন, মাত্রই জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সেই বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

এই দুই দলের বাইরে তিনটি পৃথক রাজনৈতিক ফ্রন্ট থেকে আরও কয়েকজন ঢাকা সিটির মেয়র নির্বাচনে অংশ নেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই তালিকায় ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম রয়েছে একদম শীর্ষে।

এছাড়া, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি নিজেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারী গণমাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, দেশের আলোচিত মডেল ও গণঅধিকার পরিষদের নেত্রী মেঘনা আলম আগামী ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে ঢাকার কোন সিটিতে তিনি প্রার্থী হবেন সেই বিষয়ে এখনও কিছু বলেননি।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এখন দুটি আসনের উপনির্বাচন এবং সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হবে। এক্ষেত্রে প্রথমেই ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুরু হবে।

উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকারের মেয়র, কাউন্সিল, চেয়ারম্যানদের পদত্যাগের ফলে অন্তবর্তী সরকার ১২ সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৩৯৭ উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের প্রতিনিধিদের অপসারণ করে। বর্তমানে প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।

পরবর্তীতে, ‎অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি তোলে জামায়াতসহ তাদের মিত্ররা। ‎তবে, বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন থেকে সরে আসে ড. ইউনূস সরকার।

আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যেই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর প্রথম সভা হয় ২০২০ সালের দোসরা জুন। সে হিসেবে দক্ষিণ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ১ জুন। আর ঢাকা উত্তর সিটির প্রথম সভা একই বছরের ৩ জুন অনুষ্ঠিত হওয়ায় এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ২ জুন। আর চট্টগ্রাম সিটির ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২২ ফেব্রুয়ারি।

বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সুরাইয়া আখতার জাহান। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন মো. মাহমুদুল হাসান।

এদিকে, কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সেবায় নেমে এসেছে ভোগান্তি। স্থবিরতা নেমে এসেছে নগর সেবায়। দেশের ৫৪টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তাই দ্রুত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের দাবি নগরবাসীর। তাদের মতে, জনগণের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হলে নগরবাসীর কাছে তার জবাবদিহিতা থাকবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে নিরঙ্কুশ জয়লাভের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠন করে বিএনপি। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠন হয় নতুন মন্ত্রিসভা। ওইদিন বিকেল ৪টায় নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর মধ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদায় ঘটে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে এখন জনপ্রতিনিধি নেই। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের ব্যবস্থা করব। একদিনে তো সম্ভব নয়, তবে আমরা দ্রুত সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথম কর্মদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা বাংলাদেশের মানুষের নানান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। আমাদের সবকিছুর মধ্যেই গণতন্ত্র থাকবে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষকে নিয়ে কাজ করে। আমি বিশ্বাস করি, এই মন্ত্রণালয়কে গতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

Unauthorized use or reproduction of The Finance Today content for commercial purposes is strictly prohibited.