দুবাই-ঢাকা স্বর্ণ সিন্ডিকেটের আড়ালে হাজার কোটি টাকার জুয়া ও হুন্ডি: গ্রেপ্তার ৫, নেপথ্যে মাফিয়া রাজত্ব
আব্দুর রহিম:
দুবাই-ভিত্তিক স্বর্ণ ব্যবসা ও লাইভ গোল্ড রেটের আড়ালে বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে হাজার কোটি টাকার আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া ও অবৈধ হুন্ডির এক বিশাল সিন্ডিকেট। প্রথাগত পন্থায় অফিস বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান না খুলে ফ্ল্যাট বাসাতেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কম্পিউটার ও ল্যাপটপ ব্যবহার করে চলছে এই অবৈধ ব্যবসা। আর এতে জড়িয়ে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে দেশের তরুন সমাজ।
দীর্ঘদিন ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় অনুসন্ধানী গনমাধ্যম `দ্য ফিন্যান্স টুডে` এবং `দৈনিক বর্তমান দিন`-র যৌথভাবে পরিচালিত অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের গোমর ফাঁস হয়ে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিএমপির অধীনস্থ সবুজবাগ থানা পুলিশ বুধবার (২৪ জুন) রাতে একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূল এজেন্টসহ ৫ জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ৪ জনই নারী, যারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনার্স এবং মাস্টার্সের শিক্ষার্থী।
সূত্রমতে, গতকাল রাত ১০:১০ মিনিটে পূর্ব বাসাবোর পাটোয়ারী গলি সংলগ্ন ১০৯/১/গ, গ্রীন বাংলা পারুল প্যালেসের ৮ম তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে প্রথমে উক্ত সিন্ডিকেটের ৪ নারী সদস্যকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী দক্ষিন বাসাবোর স্বপ্ন সুপার শপের সামনে থেকে এই চক্রের দেশীয় মূল এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটককৃতরা হচ্ছেন মুমু (২৪), রজনী আক্তার (২৬), ইপছিকুন নাহার বৃষ্টি (২৩) ও রাবেয়া বসরি (২৯) এবং একমাত্র পুরুষ সদস্য মুহাম্মদ আরিফুর রহমান (৩৩)।
নির্ভর্যোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে গুঞ্জন উঠেছিল যে ১ কোটি টাকায় অত্যন্ত ক্ষমতাধর এই সিন্ডিকেটের সাথে আপোষরফা করে আটককৃতদের ছেড়ে দেয়া হবে। কিন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে দ্য ফিন্যান্স টুডে, দৈনিক বর্তমান দিন, দ্য ইনভেস্টরের সিনিয়র সাাংবাদিকরা এই অভিযানের আদ্যোপান্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখায় ভেস্তে যায় সেই পরিকল্পনা। সারাদিনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে অভিযুক্তদের আদালতে নেয়ার মাধ্যমে দুশ্চিন্তার কাল মেঘ কেটে যায়।
এদিকে আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) গ্রেফতারকৃত আসামিদের ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সোপর্দ করা হয়। বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত মামলার নথি ও জব্দকৃত আলামত পর্যালোচনা করে, আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
স্বর্ণের লাইভ রেটের আড়ালে জুয়া ও হুন্ডির কারবার
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই চক্রটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের ডেরা দুবাই এলাকায় স্বর্ণ ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিল। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য তাদের ব্যবহৃত প্রধান নাম হলো— `নিউ বসুন্ধরা জুয়েলারি` (New Bashundhara Jewellery Trading CO. L.L.C), যার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ডোমেইন https://bashundharagold.net। এছাড়া আরও বেশ কিছু নামের হদিস পাওয়া গেছে, যা এই মুহূর্তে তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এই চক্র অনলাইন জুয়াড়িদের কাছ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেল ও ক্যাশের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে, সংগৃহীত টাকা সরাসরি অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে দুবাইয়ের মাফিয়াদের কাছে পাচার করে। দুবাইয়ে টাকা পৌঁছানোর পর তাদের অনলাইন জুয়া পোর্টালে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ `ডলার` ক্রেডিট দেওয়া হয়। জুয়াড়িদের জন্য এটি একটি শতভাগ ভুয়া জুয়া (Fake Betting), যেখানে জেতার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই। যার মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
দুবাই ও ঢাকার নেপথ্য মাফিয়াদের তালিকা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছে ফেনী ও ঢাকার কয়েকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী মাফিয়া, যারা দুবাই এবং ঢাকা থেকে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের মধ্যে প্রধান ও মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে জিয়াউল হক তুষার (জিয়া)-এর নাম। সে দুবাইয়ে বসে এই পুরো চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করে। এর পরেই রয়েছে কাওসার এলাহী, যে দুবাই-বাংলাদেশ হুন্ডি কারবারের অন্যতম মাফিয়া। এছাড়া আরও একজন মূল সহযোগীর নাম পাওয়া গেছে, তবে তদন্তের স্বার্থে তা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও বাংলাদেশে জুয়া ও হুন্ডির মূল সহযোগী মাফিয়া হিসেবে পরিচিত এই মামলার ৫ নম্বর আসামি হলো আরিফুর রহমান।
আরিফুর রহমান প্রথমে অভিযানে ধরা না পড়লেও, পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত ৪ জন নারী সদস্যকে ছাড়াতে থানায় যান। অভিযোগ উঠেছে, গণমাধ্যমকর্মীদের তৎপরতা ও অনুসন্ধানী তথ্যের উপস্থিতি থাকায় , পুলিশ তাকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখাতে বাধ্য হয়। গণমাধ্যমের তাৎক্ষণিক সম্পৃক্ততা না থাকলে রাতের মধ্যেই হয়তো এই গুরুতর অপরাধের ঘটনাটি আড়ালে দফারফা হয়ে যেত। পরবর্তীতে পুলিশ সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর ২০ ধারায় মামলা দায়ের করে, যা মূলত একটি জামিনযোগ্য ধারা।
জব্দকৃত আলামত ও মালামালের তালিকা
সবুজবাগ থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে চক্রটির ব্যবহৃত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের চাঞ্চল্যকর তথ্য, ল্যাপটপ কম্পিউটার, অপরাধে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) ওয়েব লগইনের কিউআর কোডসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রিনশট আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
আদালতে আসামিপক্ষের আইনি লড়াই
আজ আদালতে আসামিদের হাজির করা হলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের সপক্ষে জোর আইনি লড়াই চালান। শুনানিতে আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর ২০ ধারা মূলত একটি জামিনযোগ্য ধারা। তাছাড়া এটি কোনো অবৈধ জুয়া নয়, বরং একটি `আউটসোর্সিং` বা ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান। ৫ নম্বর আসামি আরিফুর রহমান দীর্ঘ দিন ধরে আউটসোর্সিং ব্যবসার সাথে জড়িত। উন্নত বিশ্বের মতো এখানেও বাংলাদেশের বেকার যুবকদের কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল।
আইনজীবীরা আরও দাবি করেন, গ্রেফতারকৃত ৪ জন নারী কেবল বেতনভুক্ত কর্মচারী, যারা সপ্তাহে ৫ দিন নির্ধারিত সময়ে ডিউটি করতেন মাত্র। অথচ গণমাধ্যমের হাতে আসা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ওই ৪ জন নারী সেখানে রাত্রিযাপনও করছিলেন, যা আইনজীবীদের দাবিকে অসত্য প্রমাণ করে।
অনুসন্ধান অব্যাহত
পুলিশ বর্তমানে তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় মামলাটির তদন্ত করছে। পাশাপাশি গণমাধ্যম হিসেবে আমরাও এই মাফিয়া চক্রের গভীরে গিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালাচ্ছি। খুব শীঘ্রই অকাট্য তথ্য-প্রমাণসহ সিন্ডিকেটের বাকি সদস্যদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে। তদন্তের স্বার্থে কিছু স্পর্শকাতর বিষয় এই মুহূর্তে প্রকাশ করা হচ্ছে না। আমরা আশা করছি, এই আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে দুবাই ও বাংলাদেশের মূল হুন্ডি মাফিয়াদের মুখোশ এবং এই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা সম্পূর্ণভাবে উন্মোচন করা সম্ভব হবে।
Ripon
